kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মৃত্যুর মুখে নড়াই নদী!

মো. মনির হোসেন   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মৃত্যুর মুখে নড়াই নদী!

দখলে-দূষণে মৃতপ্রায় নড়াই নদী (রামপুরা খাল)। বিভিন্ন স্থানে বর্জ্যের স্তূপে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে নদীটি

ঢাকার চতুর্দিকে চারটি বড় নদী এবং অভ্যন্তরীণ ৪৫টি খাল পারস্পরিক আন্তসংযোগের মাধ্যমে উজানের অববাহিকার পানি নিষ্কাশন সম্পন্ন করত। যাতায়াতে নৌ-পরিবহন, নৌ-বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাসে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকা শহরের পরিবেশ-প্রতিবেশ নাগরিকবান্ধব রাখত এ জলাধারগুলো; কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নগর সম্প্রসারণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ঢাকার চতুর্দিকের নদী ও খাল হারিয়ে যাচ্ছে। দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনার অভাবে অভ্যন্তরীণ খালগুলোও বহুমুখী নগর সুবিধায় অবহেলিত থাকে। ফলে ঢাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ যাতায়াতে জলঝট, যানজট ও সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

রাজধানীর ‘রামপুরা খাল’ কে না চেনে? চোখ জুড়ানো হাতিরঝিল পার হলেই রামপুরা সেতুর ওপাশে রামপুরা খাল। দুই পাশে গড়ে উঠেছে বনশ্রী ও আফতাবনগর আবাসিক প্রকল্প। যদি ‘নড়াই নদী’ নিয়ে জানতে চাই, কতজন চিনবেন? ২০০৮ সালে উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর আগে ‘বেগুনবাড়ি খাল ও হাতিরঝিল’ কেমন ছিল সবাই জানেন। আশির দশকে শুধু কারওয়ান বাজারেই এর সীমানা শেষ হতো না, ধানমণ্ডি লেকের সঙ্গেও সংযুক্ত ছিল। স্বাধীনতার আগে ধানমণ্ডি পেরিয়ে এর একটি ধারা পিলখানা হয়ে হাজারীবাগের কাছে বুড়িগঙ্গায় মিশত। অপর ধারা মোহাম্মদপুর এলাকা পার হয়ে রায়ের বাজারের কাছে তুরাগে মিশত। এই পুরো জলাভূমি একসময় ছিল স্বচ্ছতোয়া প্রবাহ, নাম নড়াই নদী। খাল, লেক বা ঝিল নয়; নৈসর্গিক এক নদী। মজার ব্যাপার, রামপুরা পার হয়ে ভাটিতে এখনো এর নাম ‘নড়াই নদী’। বালু নদের সঙ্গে নড়াইয়ের মিলনস্থলের ত্রিধারা থেকেই ‘ত্রিমোহনী’ নামের উৎপত্তি।

মহানগরী ঢাকার পরিবেশ রক্ষা ও নাগরিক প্রয়োজনে নড়াই নদীটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মগবাজার, মধুবাগ, উলন, দাসপাড়া, রামপুরা, খিলগাঁও, মেরুল-বাড্ডা, বেগুনবাড়িসহ বিশাল এলাকার বৃষ্টির পানি ধারণের অন্যতম প্রধান আধার এই নদীটি। পরিতাপের বিষয় হলো—সিটি করপোরেশনের বর্জ্যসহ বিভিন্নভাবে ক্রমাগত ভরাট আর দূষণের খপ্পরে পড়েছে এই নদীটি। এলাকাবাসী জানায়, আশির দশকের শুরুর দিকেও নড়াই নদীর পশ্চিমাংশে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত এর নৌপথ চালু ছিল। তখন এ পথে হাতিরঝিল দিয়ে সবজি ও অন্য জিনিসপত্র কারওয়ান বাজারে যেত। বিজিএমইএ ভবনের কাছে এখন যে মাছের পাইকারি বাজারটি রয়েছে, সেটি একসময় ছিল বালু, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ নদে ধরা মাছের ল্যান্ডিং পোর্ট।

রাজধানীর এক-তৃতীয়াংশ এলাকার গৃহস্থালি ও পয়ঃবর্জ্য এবং দূষিত পানি এখন হাতিরঝিলের পরিবর্তে প্রবাহিত হচ্ছে এই নদী দিয়ে। বনশ্রীর কিছু অংশ, দক্ষিণ বনশ্রী, মেরাদিয়া, ভূঁইয়াপাড়া, মাদারটেক এবং এর আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ময়লা রামপুরা খালের এ অংশে ফেলা হয়। নৌকায় আশপাশের এলাকা থেকে মেরাদিয়া হাটে ফলমূল ও শাকসবজি নিয়ে পাইকারি বিক্রেতারা আসেন। তাঁরাও অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া তরিতরকারি নড়াই নদীতে ফেলেন। ফলে দুর্গন্ধের কারণে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই বিষাক্ত পানির প্রবাহ রামপুরা, বনশ্রী ও আফতাবনগরের প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পরে মিশছে বালু ও বুড়িগঙ্গা নদীতে। রামপুরা ব্রিজের নিচে দুটি ড্রেন দিয়ে প্রতিনিয়ত দূষিত পানি এসে পড়েছে এ নড়াই নদীতে। গৃহস্থালি ও স্যুয়ারেজ দুই ধরনের পানিই আসছে এ ড্রেন দিয়ে। এর মধ্যে একটি ড্রেন গুলশান-বাড্ডা-তেজগাঁও এলাকার; অন্যটি রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজার এলাকার। বর্জ্য থেকে উৎপন্ন গ্যাস বুদ্বুদের মতো উঠে পানিতে ফেনা তুলছে। আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পেতে শীত-গরম সব সময়ই বাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, ততই দুর্গন্ধ বাড়ছে। ভুক্তভোগী মানুষ এর প্রতিকার চাচ্ছে। আর পরিবেশবাদীদের দাবি—নদীটির সীমানা নির্ধারণ, দখলদার উচ্ছেদ ও খনন করে নদীর তীরে সবুজায়নের মাধ্যমে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। তাহলে এটি হবে ঢাকা শহরের মানুষের জন্য পর্যটনের শ্রেষ্ঠ বিনোদন স্থান।

নড়াই নদীর বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, ‘নড়াইয়ের নাম বদল শুরু হয়েছিল উজান থেকে। পঞ্চাশের দশকে মোহাম্মদপুর-ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা-সাতমসজিদ সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে নড়াই প্রথম বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। বাকি অংশে গড়ে ওঠে ধানমণ্ডি লেক। আশির দশকে ‘পান্থপথ’ নির্মাণ করতে গিয়ে নড়াই নদীর ওই অংশ বক্স কালভার্টে ঢেকে দেওয়া হয়। আদতে এখনো পান্থপথের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে নড়াই নদীর মৃতদেহ। বাকি অংশ হারিয়ে যায় হাতিরঝিলে। তার পরের অংশ নাম পেয়েছে ‘রামপুরা খাল’। আমার আশঙ্কা, নড়াই নদীর বাকি অংশও অচিরেই ‘খাল’ আখ্যা পাবে। রামপুরা খাল উদ্ধারের দাবি পুরনো। আমরা চাই, দুর্গন্ধ দূর হয়ে ফিরে আসুক প্রমিত প্রবাহ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা