kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘চাকরি নয়, চেয়েছি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে’

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘চাকরি নয়, চেয়েছি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে’

সাদিয়া তাজমিন দোলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়েও চাকরির পেছনে না ছুটে শুরু করেন ব্যবসা। খোলেন বিউটি পার্লার ‘এলেন বিউটি সেলুন’ এবং বিউটিশিনিয়ান তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘একাডেমি অব এলেন’। প্রথমে নানা ঘাত-প্রতিঘাত এলেও দমে যাননি, শক্ত হাতে হাল ধরেছেন। একে একে খুলেছেন পার্লারের আরো দুটি শাখা। করেছেন অনেকের কর্মসংস্থান। তাঁর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন ফরহাদ হোসেন

দোলার ‘ড্রিমটাচ বিউটি পার্লারে’র শুরু ২০০৮ সালে। তখন সবেমাত্র মাস্টার্স শেষ করেছেন। কিন্তু মনের ভেতরে স্বপ্নটা বোনা ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। অন্যকে সাজাতে এবং নিজে সাজতে তিনি বরাবরই পছন্দ করতেন। সেই ভালোলাগার বিষয়কে পাথেয় করে নামেন ব্যবসায়। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ। সুযোগ এলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়ার। অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। সংসার সামলানো আর লেখাপড়া নিয়েই সময় কাটত। অনার্স শেষ হলে মাস্টার্সে ভর্তির আগের সময়টা হেলায় না কাটিয়ে ওম্যান্স ওয়ার্ল্ড থেকে বিউটিফিকেশনে নিলেন তিন মাসের প্রশিক্ষণ। বোনা সুপ্ত বীজের যেন একটা কুঁড়ি গজাল! এরই মধ্যে কোল আলোকিত করে আসে প্রথম সন্তান। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সাজানোর সামান্য উপকরণ কিনেছিলেন। সেগুলো দিয়ে বাড়িতে বসেই ব্যবসার প্রাথমিক পাঠের চর্চা শুরু করেন। সঙ্গে দু-চার পয়সা আয়ও হতো। এভাবেই মাস্টার্স শেষ হলো। বাকিটা শোনা যাক দোলার কাছেই, ‘শিক্ষাজীবন শেষ করার পর পরিবারের সবাই চাইল চাকরি করি। আমি বললাম, না। কারণ চাকরি নয়, চেয়েছি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে। চাকরি করলে নিজস্ব স্বাধীনতা থাকত না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বিউটিশিয়ান হবো। উদ্যোক্তা হবো। কিন্তু প্রথম বাধাটা এলো পরিবার থেকেই। সবাই বলল না। অন্য যা-ই কিছু করো কিন্তু পার্লার নয়। তাদের ভাষ্য ছিল এটাকে সমাজের অনেকে ভালো চোখে দেখে না। সুতরাং অন্য কিছুতে যেন মন দিই। বিশেষ করে চাকরির দিকে। নানাভাবে বোঝালাম। সম্ভাবনার সব দিক নিয়ে আলোকপাত করলাম সবার কাছে। স্বামী, মা-বাবা, এমনকি কাছের আত্মীয়-স্বজনও বাদ গেল না। একটা সময় বোঝাতে সক্ষম হলাম। আমার মা চাকরি করতেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। স্বামী থাকত ইতালিতে। তার পরও অর্থ জোগানে একটু বেগ পেতে হলো। কারণ ছিল যদি লোকসান হয়। বুঝিয়েসুজিয়ে টাকাটাও জোগাড় করলাম। বাসায় কাজ করে পাওয়া আয়ের টাকায়ও হাত দিলাম। সেই টাকা দিয়ে ধানমণ্ডির জিগাতলায় ৫০০ স্কয়ার ফিটের একটা রুম আর দুজন কর্মী নিয়ে শুরু করলাম ‘ড্রিমটাচ্ বিউটি পার্লারে’র যাত্রা, যা ছিল আমার সাহসী উদ্যোগের প্রথম পদক্ষেপ।

নিজ বিউটিপার্লারে কর্মব্যস্ত দোলা

তিনি আরো বলেন, ‘একটা উদ্যোগের প্রথম ধাপটায় যদি আমাদের দেশে বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের এত কাঠখড় পোড়াতে না হতো তাহলে আরো অনেকে সাহস নিয়ে এগিয়ে আসত। নারীদের যেকোনো উদ্যোগেই পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। নতুন উদ্যোক্তার খুব বেশি অর্থকড়ি থাকে না—এটাই স্বাভাবিক। আর অর্থের জোগাড় করাটাও খুব কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার ব্যাংক লোন নিতে গেলেও নানা হয়রানি। এরপর যখন স্পেস ভাড়া নিতে যেতাম বাড়ির মালিকরা যখন শুনত পার্লার দেব, শুনেই মুখের ওপর না করে দিত। আবার যেখানে পাওয়া যেত সেটা ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক নয়। এরপর আবার দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীর সন্ধান করাটাও একটা দুরূহ কাজ। স্পেস ভাড়া নেওয়া, ডেকোরেশন করা, কর্মী খোঁজা, সব কিছুতেই ঝক্কিঝামেলা কম পোহাতে হয় না। তার ওপর আবার মেয়ে মানুষ। নতুনদের সবাই ঠকানোর চিন্তায় থাকে। অন্য অনেকের মতো নানা বাধা ডিঙিয়ে আমাকেও শুরু করতে হয়েছিল। সন্তান, সংসারের পাশাপাশি ব্যবসা—এ দুই নিয়ে মাস, মাস থেকে বছর যেতে লাগল। পার্লার ও নিজের পরিচিতির পাশাপাশি একটা সেবা গ্রহীতাদের কাছে আস্থা ও বিশ্বাসের স্থান তৈরি হলো। আর এতেই এলাকায় একই নামে আরো কিছু পার্লার গজিয়ে উঠল। তখন ড্রিমটাচ নামে আমার প্রতিষ্ঠানের কোনো ট্রেডমার্ক করা ছিল না। তাই কিছু করার বা বলারও ছিল না। এরপর ২০১৫ সালের জুন মাসে মেরুল বাড্ডায় ড্রিমটাচ নাম পরিবর্তন করে ২০০০ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে ‘এলেন বিউটি সেলুন’ নামে খুলি দ্বিতীয় শাখা। একই সঙ্গে শুরু করি ‘একাডেমি অব এলেন’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠানের কাজ। এখানে বিউটিফিকেশনের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মূলত এখানে শর্ট কোর্সগুলো করানো হয়।’

প্রশিক্ষণ একাডেমির বিষয়ে দোলা বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক মেয়ে এখন বিউটিশিয়ান হচ্ছে। পার্লার খুলছে। কিন্তু অনেকে আছে, যারা সামান্য কিছু কাজ শিখেই এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কাজে নামছে। প্রত্যেকটি কাজের যেমন সঠিক পদ্ধতি আছে, তেমনি পার্লারের ক্ষেত্রেও আছে। সঠিকভাবে সব শিখেই যেন এমন কাজে নামে মূলত তাদের লক্ষ্য করেই আমার একাডেমি খোলা। প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করলে সেবাদাতা ও গ্রহীতা দুই পক্ষেরই ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। নতুন যারা আসতে চায় তারা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। তা ছাড়া সরকারের ‘সেইপ’ প্রকল্পের আওতায় আমার একাডেমি থেকে নারীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগের বিউটিশিয়ান কোর্সটিও করানো হয় আমার একাডেমিতে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ পেশায় নিজেকেও আপডেট রাখতে হয়। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমি বাংলাদেশের এবং ভারতের নামকরা বিউটি এক্সপার্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে পার্লারের বেশ কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। পার্লারের কাজে শুধু যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাই তা নয়, কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে ও সঠিক পদ্ধতিতে সেবাটা দেওয়া হচ্ছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

নিজ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন দোলা

শেখার সঙ্গে শিখানোর কাজটাও সমানতালে করে যাচ্ছেন দোলা। নিজের একাডেমি অব এলেন ছাড়াও প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত আছেন এসএমই ফাউন্ডেশন, বিডাব্লিউসিসিআই, সেইপ প্রকল্পের বিউটিফিকেশন অ্যান্ড এন্ট্রিপেনারসশিপ ডেভেলপমেন্ট এবং তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সোসাইটিতে। এ ছাড়া বিইয়ার মেন্টরের দায়িত্বও পালন করছেন।

এ বছরের নভেম্বরে ধানমণ্ডির ২ নম্বর রোডে চালু করেন তৃতীয় শাখা। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ একাডেমি এবং তিন শাখা মিলে আমার এখানে কাজের সুযোগ হয়েছে ২৪ জনের। যাদের সবাই নারী। আমার এখানে অনেকের কাজের সুযোগ হয়েছে এটা একটা বড় পাওয়া। আমি যদি অন্য কারো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম তবে এটা সম্ভব হতো না। এখন পর্যন্ত আমার একাডেমি থেকে প্রায় ৮০০ নারী বিউটিফিকেশনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। অনেকে পার্লার গড়েছে, সাবলম্বী হয়েছে, যা আমার জন্য গর্বের বিষয়।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে দোলা বলেন, ‘একাডেমিটাকে বিশ্বমানের বিউটিশিয়ান তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আরো অনেকের কাজের সুযোগ তৈরি করতে চাই। এ ছাড়া আমার একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যেন হাজারো নারী তাদের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারে সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাব।’ নতুনদের বিষয়ে বলেন, ‘যে কাজটাই করি না কেন, জেনে বুঝে করাটাই উত্তম। কাজ শুরুর আগে প্রত্যেকটি বিষয়ে জানা থাকা খুবই জরুরি। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। শিখতে হবে। প্রত্যেকটি কাজেই এখন প্রতিযোগিতা থাকে। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে। নতুনকে জানতে হবে।’ 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা