kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঢাকা হোক সবুজ, শিল্প-সংস্কৃতিবান্ধব নগর

মঞ্চ ও টেলিভিশন জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি ফেরদৌসী মজুমদার। বরিশালে জন্ম হলেও বেড়ে ওঠা এই ঢাকায়ই। যাপিত জীবনের স্মৃতি-বিস্মৃতির নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঢাকা হোক সবুজ, শিল্প-সংস্কৃতিবান্ধব নগর

বনেদি মুসলিম পরিবারে জন্ম ফেরদৌসী মজুমদারের। জন্মস্থান বরিশালে হলেও পৈতৃক নিবাস নোয়াখালীতে। শৈশব কেটেছে ঢাকার সেন্ট্রাল রোডে। তাঁর বাবা খান বাহাদুর আব্দুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ডিস্ট্রিকট ম্যাজিস্ট্রেট। ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ১১ নম্বর। যাঁদের মধ্যে আটজন ভাই ও ছয়জন বোন। বেশ কড়া শাসন আর আধুনিকতার মিশ্রণে ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। কবীর চৌধুরী, শহীদ মুনীর চৌধুরীর বোন তিনি, বাকি ভাই-বোনরাও সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত। রত্নগর্ভা মায়ের সন্তান তাঁরা।

শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘আমরা ঢাকায় থাকলেও আমাদের ছোটবেলা কেটেছে মুসলিম রক্ষণশীল পরিবারে। মেয়েদের মাথায় কাপড় দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। সন্ধ্যার মধ্যে ছেলেদের বাড়ি ফিরতে হতো। পড়াশোনা নিয়ে মারধর, অশান্তি তো ছিলই। হয়তো তখন ঢাকার ঘরে ঘরে এ রকমই গল্প ছিল। বাড়িতে সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল নিষিদ্ধ। আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় নারী শিক্ষা মন্দির স্কুল থেকে। এই স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ার পর ভর্তি হই মুসলিম গার্লস স্কুলে। যেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করি। তারপর ইডেন কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’ শৈশবের দেখা সেই ঢাকার পরিবেশ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজকের ঢাকা আর তখনকার ঢাকার রাত-দিন ফারাক। এত এত ভবন ছিল না, এত জনসংখ্যার চাপ ছিল না। গ্রামের দু-একটি সচ্ছল পরিবারের দু-একজন ঢাকায় থাকে। প্রায়ই দেখা যেত গ্রাম থেকে কেউ না কেউ প্রয়োজনে কিংবা কখনো স্রেফ শহর দেখার জন্য ঢাকা চলে আসত এবং যারা ঢাকায় থাকে তাদের বাসায় উঠত। মনে আছে আমাদের বাড়িতে বাবার দিকের লোকজন এলেই আম্মা সচেতনভাবে ওদের একটু সেবা-যত্ন করতেন। ওরা এলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের থাকা-খাওয়ার একটু অসুবিধা হতো। বাড়িতে এলে বিছানায় উঠে যেত ওরা, মাটিতে নেমে যেতাম আমরা। সেসব স্মৃতি আসলে ভোলার নয়।’

সত্তরের শুরুতে রামেন্দু-ফেরদৌসীর বিয়ে হয়। সে সময় দুজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ পারিবারিক সম্মতি নিয়ে সংসার পাতছেন, সে বিরল এক ঘটনা। তাঁর ভাষায়, ‘মুসলমান ছেলে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছে কদাচিৎ শোনা যেত। কিন্তু মুসলমান মেয়ে হিন্দু ছেলে বিয়ে করেছে শোনা যেত না। সে সময় ঢাকার কিন্তু এটা একটা আলোচিত ঘটনা ছিল।’ ১৯৭১ সালে রামেন্দু মজুমদার ও তিনি করাচিতে থাকতেন। ১ মার্চ থেকে অনেক চেষ্টা করে বাংলাদেশে আসার টিকিট পেলেন। ১০ মার্চ ঢাকায় এলেন। সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, ‘বাবার বাড়িতে উঠলাম। ২৫ মার্চ রাতে যখন গোলাগুলি শুরু হলো, আমরা ভেবেছিলাম কোনো উৎসব উদ্যাপনের জন্যই হয়তো আতশবাজি ফোটানো হচ্ছে। পরে যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে মানুষের চিৎকার ভেসে আসছিল, তখন আমরা নিচে নেমে আসি। এমন সময় কেউ একজন এসে জানাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাখির মতো গুলি করে মারছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের একজন ধোপা ছিলেন। সেই পরিবারের সবাইকে ওই ভয়াল রাতে হত্যা করা হয়। এ খবর পেয়ে সারারাত আমরা সবাই মিলে একঘরে না ঘুমিয়ে কাটালাম। পরদিন ভোরের দিকে রামেন্দু মজুমদার গিয়ে দেখে এসে যা বর্ণনা করল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সেদিন থেকে আমরা সবাই ঘরের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিলাম। তারপর যখন যুদ্ধ শুরু হলো তখন আমরা দিনের চেয়ে রাতের বেলায় বেশি ভয়ে থাকতাম। আর ভাবতাম এই বুঝি পাকিস্তানি সেনারা এসে দরজায় লাথি মারবে!’

এখনকার ঢাকা কেমন দেখছেন? ‘মূলত ঢাকা পরিবর্তন হতে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে। তখনকার ঢাকা ছিল খোলামেলা। এখন তো জ্যামের আর ভিড়ের শহর হয়ে গেছে। যেসব সমস্যা আছে, সেসব যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। নয়তো সমস্যা আরো জেঁকে বসবে। ঢাকা হোক সবুজ, শিল্প-সংস্কৃতিবান্ধব নগর—এটাই আমার প্রত্যাশা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা