kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সালতামামি ২০১৮

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সালতামামি ২০১৮

আইসিসি ওমেন্স টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল

ক্রিকেটে আমাদের মেয়েরা

দেশের লাল-সবুজের প্রিয় পতাকাটিকে বিশ্বের বুকে চিনিয়ে দিতে সাহায্য করেছে আমাদের প্রিয় খেলা। ক্রিকেট খেলার মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে আমাদের দেশ করে নিয়েছে সম্মানজনক এক জায়গা। ক্রিকেট সাফল্যে এখন এগিয়ে আমাদের নারীরাও। আইসিসি ওমেন্স টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের ফাইনালে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল।

এই খেলার আগে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল পাপুয়া নিউগিনি, নেদারল্যান্ডস, আরব আমিরাত ও স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করে। ক্রিকেটে এগিয়ে  গেছে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নের হাতছানিতে এখন আমাদের নারী ক্রিকেটাররাও পথ চলছেন সফলতায়। 

দেশের প্রথম নারী মেজর জেনারেল ডা. সুসানে গীতি

বাংলাদেশে প্রথম নারী মেজর জেনারেল

বাংলাদেশের প্রথম নারী মেজর জেনারেল হলেন ডা. সুসানে গীতি। সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পেলেন তিনি। ৩০ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সামছুল হক সেনা সদর দপ্তরে তাঁকে মেজর জেনারেল পদবির র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন। মেজর জেনারেল সুসানে গীতি ১৯৮৫ সালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরবর্তী সময় ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারী ডাক্তার হিসেবে ক্যাপ্টেন পদবিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথম নারী হিসেবে হেমাটোলজিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক হাসপাতালে প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনেও কর্মরত ছিলেন।

 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও অরিত্রি

পরীক্ষার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসা মোবাইল। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন সেই মোবাইলে ছিল নকল। সেই অভিযোগে ছাত্রীকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঘটনাটি ঘটে ৬ ডিসেম্বর রাজধানীর ভিকারুননিসা স্কুলের বেইলি রোড শাখায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর সঙ্গে। অরিত্রির মা-বাবা অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করলে তাদের অপমানিত করা হয়। যাতে কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রি অধিকারী। শিক্ষায় বছরের অন্যতম দুঃখজনক ঘটনা এটি। অরিত্রি অধিকারীর মতো পরিণতি যেন আর কোনো শিক্ষার্থীর ভাগ্যে না ঘটে। আর কোনো অভিভাবককে যেন নিজের সবচেয়ে দামি সম্পদ হারাতে না হয়। এই দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের মানবিক বোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জরুরি।

৬ মার্চ মারা যান মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে হারানো

বটবৃক্ষ হয়ে যাঁরা ছিলেন তাঁরা চলে যাচ্ছেন প্রিয় মমতা ছেড়ে। যাঁদের কাছে জানতে পেরেছি দেশের কথা। দেশ সৃষ্টির কথা। দেশের প্রতি এক অমোঘ ভালোবাসার কথা। তেমনি এক মানুষ ছিলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। ২০১৮ সালের ৬ মার্চ আমরা এই বটবৃক্ষকে হারাই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হন। স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদানের জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দেয়। এর আগে ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক পান।

৩ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান  মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার রমা চৌধুরী

বিদায় রমা চৌধুরী

রমা চৌধুরী। একজন মুক্তিযোদ্ধা। একজন বীরাঙ্গনা নারী। ১৯৭১ সালের ১৩ মে ভোরে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিজ বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হন। সম্ভ্রম হারানোর পর পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেছিলেন। হানাদাররা গানপাউডার লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁর যাবতীয় সম্পদ। ৩ সেপ্টেম্বর ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ২০১৪ সালে একুশের বইমেলায় তাঁর আত্মজীবনী ‘নিন্দিত নন্দন’ প্রকাশিত হয়। ‘একাত্তরের জননী’সহ ১৮টি গ্রন্থের লেখক তিনি। শেষ জীবনে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে তিনি তাঁর বই বিক্রি করতেন। 

 

মিটু আন্দোলনের ঝড়

নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হন ঘরে। বাইরে। কর্মক্ষেত্রে। একটা সময় ছিল নিপীড়নের কথা কেউ মুখ ফুটে আর বলতেন না। এটাকে লুকিয়ে রাখার বিষয়ই মনে করতেন। কিন্তু এখন নতুন এক ঝড়ের আশ্রয় পেয়েছেন নারীরা। যে ঝড়ের কারণে তাঁরা তাঁদের কষ্টের কথাটুকু বলতে পারছেন। এই মিটু ঝড় বা আন্দোলনের শুরু মূলত চলচ্চিত্রের তীর্থস্থান হলিউড থেকে। এরপর শুরু হয় উপমহাদেশের বলিউডে। বাংলাদেশও আন্দোলিত হয়েছে এই ঝড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কয়েকজন নারী জানিয়েছেন তাঁদের ওপর হয়ে যাওয়া যৌন নিপীড়নের কথাটুকু। তা নিয়ে তোলপাড় যেমন শুরু হয়েছে। তেমনি আবার অনেকে আশঙ্কা জানিয়েছেন কোনোভাবেই যেন এই আন্দোলনটির অপব্যবহার না করা হয়।

 

আলোচনায় ছিল অভিবাসী নারী

বছরজুড়েই আমরা দেখতে পেয়েছি অভিবাসী নারীদের লাঞ্ছনার শিকার হওয়া। দলে দলে দেশে চলে আসা। নির্যাতিত নিপীড়িত নারীরা। যে নারীরা দেশে ফিরে এলেন তাঁদের ভাগ্য বিড়ম্বনার কথা, তাঁদের কষ্টের কথা গণমাধ্যম মারফত আমরা জানতে পারি। বিশ্ব শ্রমবাজারে অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিক সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা নিজের ভাগ্য বদলাতে চাকরি করতে বিদেশ যান। দেশের জন্য বয়ে আনেন বৈদেশিক মুদ্রা। আর অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে হয়েছেন নিঃস্ব। অনেকে যৌন, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মস্থলে এভাবেই নানা রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কাজ করতে হয়। এর পরও তাঁরা শ্রমের মূল্য অনুযায়ী মজুরি পান না। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে সম-অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সিডও সনদ একটি অগ্রগণ্য দলিল হিসেবে কাজ করতে পারে।

গত বছর রোকেয়া পদক পান পাঁচ নারী। তাঁদের হাতে পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

রোকেয়া পদক ২০১৮

রোকেয়া পদক নারীর জন্য একটি সম্মানজনক পদক। সমাজ সংস্কার ও নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখার জন্য প্রতিবছর এই পদক দেওয়া হয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল অবদান রাখার জন্য ‘রোকেয়া পদক-২০১৮’ পেয়েছেন পাঁচ নারী। তাঁরা হলেন—সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জিন্নাতুন নেসা তালুকদার, অধ্যাপক জোহরা আনিস, শীলা রায়, রমা চৌধুরী (মরণোত্তর) ও রোকেয়া বেগম। প্রতিবছরের মতো ২০১৮ সালেও বেগম রোকেয়া দিবসে এ পদক দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পদকপ্রাপ্ত ও মরহুমদের পরিবারের সদস্যদের হাতে স্বর্ণপদক ও সার্টিফিকেট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী জাগরণের আগ্রদূত বেগম রোকেয়ার অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার এই রাষ্ট্রীয় পদকটি প্রদান করে। নারী কল্যাণ সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে এই নামের একটি পদক প্রদান শুরু করে। সরকারিভাবে ১৯৯৬ সাল থেকে এই পদক প্রদান করা হয়।

 

কমেনি নারী নির্যাতন

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি জাতীয় পত্রিকার নারী নির্যাতনের সংবাদ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে এক হাজার ৯৯২টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। ১১ মাসে ৫২৩টি ধর্ষণ, ৪৪২টি হত্যা এবং ১৮৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শুধু রাজধানীতে নারী নির্যাতন ঘটনার বিচারে আসামিদের সাজা হচ্ছে ৩ শতাংশ, অব্যাহতি ৪১ শতাংশ, খালাস ৬২ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি ১ শতাংশ, যা বর্তমানে এগিয়ে যাওয়া দেশের জন্য একটা ভয়াবহ রূপ। এই হারটি কিন্তু দিন দিন বেড়েই চলছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যখন আমরা দেখি আমাদের দেশও এগিয়ে চলছে তখন এমন নারী নির্যাতনের চিত্র আমাদের কতটা বিষণ্ন করে?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা