kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

যত্রতত্র পোস্টার : ঢেকে যায় দেয়ালের মুখ

রাতিব রিয়ান   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যত্রতত্র পোস্টার : ঢেকে যায় দেয়ালের মুখ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগানোর জন্য ডিএনসিসির ২০টি নির্ধারিত জায়গা থাকলেও সেসব জায়গায় কেউ পোস্টার লাগায় না

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো থেকে বিরত রাখার জন্য জন্য বোর্ড স্থাপন করে সংস্থাটি বর্জ্য বিভাগ। মূলত নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সিটি করপোরেশন ঢাকার অন্তত ২০টি স্থানে এ রকম বোর্ড স্থাপন করে। গত বছর যত্রতত্র পোস্টার লাগানোর অপরাধে জরিমানা করে সেবা প্রদানকারী এই সংস্থা। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে পোস্টার লাগানোর নিয়মটি বেশির ভাগ সময়ই অনুসরণ করা হচ্ছে না।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, নাগরিকদের বিভিন্ন প্রচারণার নানা প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। তবে প্রচারণার বেলায় শহরের সৌন্দর্য যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বাছাই করা হয়েছে। ডিএনসিসি এলাকায় ৫২টি স্থানে পোস্টার লাগানোর জন্য বোর্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে ২০টি স্থানে বোর্ড নির্মাণ সম্পন্ন হয় গত বছরের ২১ জানুয়ারি।

গুলশান শুটিং ক্লাব, খামারবাড়ি, উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর এলাকায় বিলবোর্ডগুলো লাগানো হয়। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট এক আদেশে অননুমোদিত পোস্টার-ব্যানার ও তোরণ অপসারণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সব পোস্টার, ব্যানার ও তোরণ সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্ট এই আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি রুলও জারি করেন। হাইকোর্টের এই নির্দেশ পালনের জন্য ডিএনসিসি ঘোষণা দেয় বোর্ডের বাইরে কেউ পোস্টার লাগালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক কমোডর আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘পোস্টার লাগানোর জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন এলাকায় ২০টি নির্ধারিত জায়গা রয়েছে। তার পরও মানুষ ইচ্ছামতো যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগায়। এত কিছুর পরও মানুষকে খুব বেশি সচেতন করা যায়নি।’ এদিকে সিটি করপোরেশনের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগটি নিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর এ বিষয়টি যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে না।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে ফুটপাতের ওপরে ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জিনিসপত্র রাখার একটি কক্ষের দেয়ালে স্টিলের কাঠামো দিয়ে পোস্টার লাগানোর জায়গা করা হয়েছে। কাঠামোর ওপরে পোস্টার লাগানোর জন্য ডিএনসিসি আহ্বান করেছে, পাশাপাশি আইন না মেনে পোস্টার লাগানোর শাস্তি সম্পর্কেও অবহিত করা হয়েছে। তার পরও নির্ধারিত স্থানে পোস্টার লাগানোর বিষয়ে সচেতনতা নেই। অথচ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বিনা মূল্যে এই পোস্টার লাগানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে পোস্টার লাগানোর জন্য কোনো ভাড়া কিংবা অর্থ খরচ করতে হবে না।

আসাদগেট ছাড়াও মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সেন্টার, মানিক মিয়া এভিনিউয়ে টিঅ্যান্ডটি মাঠের পাশে, ফার্মগেট, মিরপুর টোলারবাগ আবাসিক এলাকা, মিরপুর-১ রাইনখোলা মোড়, প্রগতি সরণির কোকাকোলা মোড় ও নিকেতন এলাকায় ডিএনসিসির পোস্টার লাগানোর স্ট্যান্ডগুলো খালি পড়ে আছে।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণ আইন গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোনো দেয়ালে বা স্থানে পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ। আইনভঙ্গ করে কেউ যত্রতত্র দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগালে এর সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে অন্যূন ১০ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা হবে, অনাদায়ে অনধিক ৩০ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। এ ছাড়া ওই সুবিধাভোগীকে তার নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেয়াল লিখন, পোস্টার মুছে ফেলার বা অপসারণের জন্য আদেশ দিতে পারবেন আদালত।

আইন অমান্য করে যততত্র পোস্টার সাঁটানোর যেন প্রতিযোগিতা চলছে

এ বিষয়ে কমোডর আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা অতীতে এ নিয়ে কাজ করেছি। তবে নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়েছিল; কিন্তু নাগরিকদের নিজেদের সিটি নিজেদেরই পরিষ্কার রাখতে হবে। আমরা নগরবাসীকে আহ্বান জানাব নির্ধারিত স্থানে পোস্টার লাগানোর।’

রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, গুলিস্তান, মিরপুর, মহাখালী, ফার্মগেট, গ্রিনরোড, মগবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশের দেয়াল ও খুঁটিতে পোস্টার সাঁটানোর যেন প্রতিযোগিতা চলছে। মূলত যেসব এলাকায় পথচারী চলাচল বেশি সেসব এলাকা টার্গেট করে পোস্টার লাগানো হয়।

রাজধানীর আরজতপাড়ার বাড়িওয়ালা চৌধুরী জিসান আহমেদ বলেন, ‘আমার বাসার বেশির ভাগ প্রাচীরে পোস্টার লাগানো হয়েছে। কোনোভাবেই দেয়ালকে পোস্টারের হাত থেকে বাঁচানো যায় না। প্রাচীরে নোটিশ দিয়েছি পোস্টার লাগানো নিষেধ বলে। তার পরও পোস্টার লাগানো হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুরনো পোস্টার তুলে প্রাচীর আবার রং লাগিয়ে নতুন করা হয়। এর পরও অবস্থা আগের মতো হয়ে যায়। রং করা নতুন প্রাচীর আবার পুরনো হয়ে যায়।’

মিরপুর টোলারবাগ আবাসিক এলাকায় থাকা রফিকুল ইসলাম নামে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় পোস্টার লাগানোর জন্য সিটি করপোরেশন একটি জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু যেভাবে পোস্টার লাগানোর স্থানটি করা হয়েছিল সেটি সেভাবেই পড়ে আছে। কেউ সেখানে পোস্টার লাগায় না।’ ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মী আরো বলেন, ‘যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগালে দেয়ালের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। এ বিষয়টি ভালোভাবে চিন্তা করা দরকার।’

নির্ধারিত জায়গা থাকার পরও যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো হচ্ছে—এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব বলেন, ‘শুধু নিয়ম দিয়ে কিংবা আইন দিয়ে মনমানসিকতার পরিবর্তন করা যাবে না। মানসিকতা পরিবর্তন হয় চর্চার মাধ্যমে। এ ছাড়া এই শহর আমার শহর, এই শহর সুন্দর রাখার দায়িত্ব আমাদের। এই বোধটুকু থাকলেই অনেক কিছুর পরিবর্তন অবশ্যই হবে।

কী করছি, কেন করছি—এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন থাকতে হবে সবার আগে। তা না হলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা