kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নিয়ম মানে না হোটেল ওয়েস্টিন, দুর্ভোগ পথচারীর

রাতিব রিয়ান   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিয়ম মানে না হোটেল ওয়েস্টিন, দুর্ভোগ পথচারীর

নিজেদের সুবিদার্থে দখলে রেখেছে ফুটপাত। ভোগান্তিতে পথচারী

দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতের একটি অংশ দখলে রেখে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করেছে হোটেল ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষ। এর ফলে পথচারী চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। গাড়ি ওঠা-নামার জন্য ফুটপাত দখল করে বানানো হয়েছে র‌্যাম্পাস। ঢাকার গুলশানের এই পাঁচ তারকা হোটেলে আসা অতিথিদের গাড়ি হোটেলের পার্কিং এলাকা থেকে ওই র‌্যাম্প হয়ে প্রধান ফটকে যাচ্ছে। ফুটপাতে এভাবে যানবাহন চলাচল করায় ব্যাহত হচ্ছে পথচারীদের চলাচল। ফলে ওই সড়কের ফুটপাত অংশটি এখন হোটেলটির দখলে চলে গেছে। ফলে পথচারীদের চলাচল সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। স্থানীয় পথচারীরা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করলেও এটির কোনো সমাধান যেন নেই। হোটেলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে নারাজ। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন যেন দেখেও না দেখার বাস্তবতায় রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ব্যারিকেড দেওয়ায় বন্ধ রয়েছে ওয়েস্টিনের সামনের ফুটপাতে পথচারী চলাচল। তবে মাঝেমধ্যে ব্যারিকেড খোলা হচ্ছে। এ অবস্থায় পথচারীরা সড়কের ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে হোটেলটির সামনের অংশ পার হচ্ছেন। হেলাল উদ্দীন নামে একজন পথচারী বলেন, ‘বহু দিন ধরে এ অবস্থায় আছে। এটির কোনো সমাধান নেই, এটি নিয়ে কথা বলারও কেউ নেই।’ বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও ওয়েস্টিন হোটেলের ফুটপাত দখলের বিষয়টি আলোচনা করা হয়। ওই বৈঠকে ফুটপাত দখল করে হোটেল ওয়েস্টিনের ২০তলা মাল্টিস্টোরেজ ভবন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটি। একাধিক সদস্য এ হোটেলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেন। এ ছাড়া ওয়েস্টিন হোটেলের সামনের ফুটপাত থেকে কংক্রিট প্লান্টার সরিয়ে দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু এখন আবার সেগুলো বসানো হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা যায়, পাশের প্লটে হোটেলের পার্কিং এরিয়া থেকে কিছুক্ষণ পর পর গাড়ি যাচ্ছে প্রধান ফটকে। এসব গাড়ি যাওয়ার সময় প্রায় পুরো ফুটপাত গাড়ির দখলে চলে যাচ্ছে। ফলে পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে হয় সড়কে নেমে যেতে হয় অথবা গাড়ি যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

গুলশানের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মির্জা আজিজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষ হোটেলের তিন দিকের সড়কেই এভাবে পথচারীদের ঝামেলায় ফেলছে। গন্তব্যে যেতে গেলে বাধা পেতে হয়। ৩৬ বা ৪৮ নম্বর সড়ক ধরে গুলশান এভিনিউ পর্যন্ত রিকশায় আসা যায় না। কস্তুরি হোটেলের সামনে তাদের নিরাপত্তাকর্মীরা রিকশা আটকে দেয়। শুকনো সময় সমস্যা না হলেও বৃষ্টির দিনে এ রাস্তাটুকু আসতে বেশ ঝামেলা হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারা তাদের অতিথিদের নিরাপত্তা দিক, ঠিক আছে। কিন্তু পথচারীদের পথ আটকে কেন? যেখানে গুলশান-বারিধারা এলাকার সব দূতাবাস তাদের সামনের ফুটপাত ছেড়ে দিয়েছে, সেখানে ওয়েস্টিন হোটেল ফুটপাতের ওপর দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে!’

এ সড়কে হাঁটার সময় প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানান গুলশানের ১০০ নম্বর সড়কের বাসিন্দা মারজিয়া আক্তার। অভিযোগ করে তিনি জানান, ‘সারাটা পথ আসার পর এখানে এসে আর হাঁটার সুযোগ থাকে না। ফুটপাত দিয়ে গাড়ি চলায় বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে হয়। কিন্তু রাস্তায়ও গাড়ি থাকে, ফলে ঝামেলায় পড়তে হয়। ফুটপাত তো হাঁটার জন্য। তারা ফুটপাত দিয়ে গাড়ি চালাবে কেন? তারা কি জনগণের ফুটপাত কিনে নিয়েছে?’

গুলশান সোসাইটির মহাসচিব ওমর সাদাত এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হস্তক্ষেপ চেয়ে বলেন, ‘গুলশান এলাকার ফুটপাত চলাচলের উপযোগী রাখতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আদালতের ওই আদেশের পর ওয়েস্টিন হোটেলের সামনের ফুটপাত খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা আবার তা দখল করেছে। তারা আমাদের নগরজীবনে বিভ্রাটের সৃষ্টি করছে। এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে।’ ফুটপাত দখল করে কেন গাড়ি চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে জানতে চাইলে ওয়েস্টিন হোটেলের পরিচালক (ডিরেক্টর, অপারেশন্স) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কেন এ রকম করা হয়েছে সে ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারব না। আপনি আমাদের ওনিং কম্পানি ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের সঙ্গে কথা বলেন। আমি জানি সব কিছুর প্রপার পারমিশন আছে। এর বেশি কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মেজবাহুল ইসলামও দাবি করছেন, ফুটপাতে র‌্যাম্প বানানোর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, ‘তারা তাদের সামনের ফুটপাত অনেক দিন বন্ধ করে রেখেছিল। তাদের আমরা সময় দিয়ে দিয়ে শেষে পথচারী চলাচলের জন্য ওপেন করে দিয়েছি। এখন তারা আবার যদি ফুটপাত দখল করে র‌্যাম্প বানায়, তাহলে আমরা দেখব।’

জানা গেছে, ফুটপাতের জায়গাটি হোটেলের নয়, ঢাকা সিটি করপোরেশনের। মেয়র আনিসুল হক ওয়েস্টিন হোটেল কর্তৃপক্ষকে ফুটপাত ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর অনেক দিন ধরে ফুটপাত উদ্ধারে সিটি করপোরেশনের কোনো তৎপরতা নেই। কিন্তু সিটি করপোরেশন অফিস থেকে হোটেলটির দূরত্ব মাত্র ৪০০ গজ। ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়—জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আমরা মাঝেমধ্যেই অভিযান চালাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার দখল হয়ে যায়। শিগগিরই আমরা আবার অভিযান পরিচালনা করব।’

ওয়েস্টিন হোটেলের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফুটপাত দিয়ে যারা চলাচল করবে, তাদের নজরে রাখার নির্দেশ দিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। কেউ ফুটপাত দিয়ে যেতে চাইলে দ্রুত হেঁটে যাওয়ার পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে এবং সেখানে কেউ দাঁঁড়াতে পারবে না!’

ফুটপাত দখল বন্ধ করার বিষয়ে জানতে হোটেল মালিক নূর আলীর মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। হোটেলের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমরা দেখছি না, এটা আমাদের নলেজে নেই।’ এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মশিউর রহমান বলেন, ‘এখন অফিসের ঊর্ধ্বতন কেউ নেই। এ বিষয়ে কেউ তথ্য দিতে পারবে না। পরে তিনি যোগাযোগ করতে বলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা