kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

সাম্প্রতিক

এভাবে চলতে থাকলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে

আনু মুহাম্মদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এভাবে চলতে থাকলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে

ঐক্যফ্রন্টের কোনো দাবিদাওয়া পূরণ না করেই তাদের শেষ পর্যন্ত ভোটে রাখতে পেরেছে—এটি ক্ষমতাসীনদের সফলতা

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সরকারি দলের অধীনে যত নির্বাচন হয়েছে তার সবই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বর্তমান সরকার দাবি করছে, তারা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পেরেছে; কিন্তু আমরা ক্ষমতাসীনদের যে ভূমিকা দেখেছি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে ভূমিকা দেখেছি, আমলাতন্ত্রের যে ভূমিকা দেখেছি, আদালতের যে ভূমিকা দেখেছি সেগুলোর সবই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিপরীতে ছিল। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের সমানাধিকার দরকার। ভোটারদের মধ্যে নির্ভয় অবস্থা বিরাজ করা দরকার। আমরা দেখেছি ক্রমাগত হুমকি-হামলা, বিভিন্ন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী প্রচারে যেসব বিতর্ক আলোচনায় আসা দরকার, সেসব বিতর্ক উন্নয়নের প্রচারে ভেসে গেছে। একদিকে বিজ্ঞাপনী প্রচার, অন্যদিকে হামলা-মামলার ফলে সম্পূর্ণ একতরফা একটা নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। জনগণের মধ্যে এই ভয় তৈরি হয়েছিল যে তারা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে কি না?

আমরা তো আশা করেছিলাম, সরকার জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে; কিন্তু সেই আশা সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন পূরণ করেনি। প্রথম থেকেই বোঝা গেছে, নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।  ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন হয়েছে সেখানে ক্ষমতাসীনদের পূর্ব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়েছে। তাদের এই পূর্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে নানা ধাপে। নির্বাচনের বছরখানেক আগে থেকেই সরকার তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বিজ্ঞাপনী প্রচার হিসেবে ব্যবহার করেছে। জনসভা করেছে, লিফলেট-প্রচারপত্র বিলি করেছে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলোও ব্যবহার করেছে।

দ্বিতীয়টি হলো এবারের নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। আপাতবিচারে দেখলে এটি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন; কিন্তু নির্বাচন সত্যিকার অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ক্ষমতাসীনরা নির্বাচীন প্রচার-প্রচারণার অবারিত সুযোগ পেয়েছে। এর বিপরীতে বিরোধী প্রার্থীদের ভোটের মাঠে নামতে দেওয়া হয়নি। রাজনীতির মাঠ থেকে তাদের কৌশলে দূরে রাখা হয়েছে, তাদের ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া হামলা-মামলা, নির্যাতন করে তাদের দমন করার চেষ্টা ছিল।

তৃতীয়টি হলো, আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে বিরোধী প্রার্থীদের নানাভাবে নাজেহাল করা হয়েছে। ফলে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রার্থীদের। এ ছাড়া বিরোধী প্রার্থীরা নানা অনিয়ম-অভিযোগ করে থাকলেও প্রশাসনিকভাবে সেগুলোর সমাধান ত্বরিৎ গতিতে হয়নি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলোর সমাধানও হয়নি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান; কিন্তু অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের যে এখতিয়ার সেই এখতিয়ার প্রয়োগ করেনি। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে।

সরকারের চতুর্থ প্রকল্প হলো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ কোনো দেশের প্রকৃত বাস্তবতা কী সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র একমাত্র গণমাধ্যমই তুলে ধরতে পারে। অন্যান্য নির্বাচনে দেশের গণমাধ্যমগুলো যেভাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে এবার সেটা পারেনি। গণমাধ্যমের ওপর দৃশ্যমান চাপ বহাল রাখা হয়েছে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে অর্ধশতাধিক অনলাইন পোর্টালে ভিজিট করার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল বিটিআরসি। এ ছাড়া নির্বাচনের আগের দিন কেবল টিভি অপারেটরদের মাধ্যমে বেসরকারি একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ইন্টারনেটের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। থ্রিজি, ফোরজি ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ছিল একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। এবারের নির্বাচনে গণমাধ্যম কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।

এই পরিকল্পনার বাইরে সরকারের আরেকটি সফলতা হলো সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসা। ড. কামালের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একাধিকবার সংলাপ করেছে। তারা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছে; কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তাদের একটি দাবিও পূরণ করেনি। আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা বোঝাতে চেয়েছে, তারা সমস্যা-সংকট সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক; কিন্তু তাদের কোনো দাবিদাওয়া পূরণ না করেই তাদের বিরোধী জোটকে শেষ পর্যন্ত ভোটে রাখতে পেরেছে এটি ক্ষমতাসীনদের সফলতা।

সরকারের পরিকল্পিত নির্বাচনের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে ভোটের দিন। যেভাবে অনিয়ম হয়েছে তা ন্যক্কারজনক। কোনোভাবেই এটিকে সুষ্ঠু ভোট বলা যায় না। ভোটের আগের রাতে ভোট দেওয়ার অভিযোগ এসেছে, অনেক ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেননি। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে গোপন কক্ষে পাহারা বসানো হয়েছে, ভোটারদের কাছ থেকে জোর করে ভোট নেওয়া হয়েছে, ভোটাররা কোন প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন তা দেখা হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ভোটকেন্দ্রগুলোয়। বলা হচ্ছে, এটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন; কিন্তু যে বাস্তবতায় নির্বাচন হয়েছে, তা কোনোভাবেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নয়। এটি একচেটিয়া আধিপত্যমূলক নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যে অসংগতিগুলো হয়েছে, তা দেশের সাধারণ মানুষের অজানা নয়। এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কলঙ্কের জন্ম দিয়েছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। ক্ষমতার মালিক হিসেবে জনগণের যে অধিকার সেই অধিকারটুকু অবশিষ্ট রাখা হয়নি।

আওয়ামী লীগ ও মহাজোট থেকে বলা হচ্ছে, এই নির্বাচনে জনগণ তাদের উন্নয়নের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই কারণে তাদের নিরঙ্কুশ জয় হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো একচেটিয়া আধিপত্য ও দখলদারি এবং অনিয়মের মাধ্যমে এই জয় এসেছে।

আওয়ামী লীগের এই বিজয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে। ভোট সুষ্ঠু হয়েছে কি না, ভোটে অনিয়ম হয়েছে কি না—এগুলো দেখা তাদের বিষয় না কিংবা এটি নিয়ে তাদের মাথাব্যথাও নেই। তারা শুভেচ্ছা জানাচ্ছে—এর মধ্যে তাদের স্বার্থ নিহিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের স্বার্থ, চুক্তির স্বার্থ, বাণিজ্যিক স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ। কে ক্ষমতায় এলো, কিভাবে ক্ষমতায় এলো—এগুলো তাদের মাথাব্যথার বিষয় নয়। সরকারকে অভিনন্দন জানালেই তো তাদের স্বার্থ উদ্ধার হয়। আমরা অতীতেও দেখেছি, বিশ্বের কাছে সামরিক সরকারও বৈধতা পায়। এই সরকারও সেভাবে বৈধতা পাচ্ছে; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যেভাবে সরকার প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, তাতে দেশ একদলীয় শাসনের দিকে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের পথ সুগম হবে, একচেটিয়া শাসনের দরজা খুলবে।

এ ছাড়া সরকার উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগী। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জনগণের কাছে সরকারের স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহির বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত না থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে আর্থিক লোপাট, দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। আগের প্রকল্পগুলোতে বিভিন্ন সময় যে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো নিয়ে ক্ষমতাসীনদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এবারও দুর্নীতির বিষয়টি মোকাবেলা করা ক্ষমতাসীনদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে; কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তাদের আগের অবস্থান থেকে সরবে বলে মনে হয় না। ফলে অবাধ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের মতো সরকারের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। ক্ষমতাসীনরা এসব আত্মবিধ্বংসী প্রকল্প থেকে সরে আসবে সেটাও মনে হয় না। সব মিলিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহির বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকবে বলে মনে হয়।

এভাবে চলতে থাকলে দেশ একটি গভীর সংকটের মুখে পড়বে এবং এই সংকট হবে দীর্ঘমেয়াদি। এই সংকট মোকাবেলায়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দায়িত্ব রয়েছে, বিশেষ করে সুধীসমাজের দায়িত্ব বেশি। সত্যকে সত্য বলার চর্চা ও সাহস আমাদের সুশীলদের থাকতে হবে। জনমত প্রতিষ্ঠা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুশীলদের ভূমিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া দায়িত্ব রয়েছে গণমাধ্যমের। গণমাধ্যম যাতে তার দায়িত্ব সুষ্ঠু ও স্বাভাবিকভাবে পালন করতে পারে, সে নিশ্চয়তা আদায়ের জন্য গণমাধ্যমকে কাজ করে যেতে হবে। সর্বোপরি ভূমিকা রয়েছে জনগণের। জনগণকে একাত্ম হতে হবে। জনগণ ক্ষমতার মালিক, এই দেশ কোনো শাসকের নয়, এই দেশ জনগণের—সেই বোধটুকু জনগণের মনে সক্রিয় হতে হবে।

শ্রুতিলিখন : কবীর আলমগীর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা