kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পুরান ঢাকায় বিল্ডিং কোড না মেনে চলছে অবাধে ভবন নির্মাণ

জাহিদ সাদেক   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পুরান ঢাকায় বিল্ডিং কোড না মেনে চলছে অবাধে ভবন নির্মাণ

পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া এলাকায় বেশ কিছু বহুতল ভবন তৈরি হয়েছে, যার কোনোটিই অনুসরণ করেনি বিল্ডিং কোড। ধূপখোলা মাঠের আশপাশে গত কয়েক বছরে নির্মিত এসব ভবনের বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে নিজস্ব প্ল্যানিং কিংবা চারতলার অনুমতিতে ছয়তলা বা এর চেয়েও বেশি। এলাকার বেশির ভাগ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাসিন্দারা প্রকৌশলী, স্থপতি ছাড়াই রাজমিস্ত্রির সাহায্যে বহুতল ভবন গড়ে তুলছেন। অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাজউক কখনো বাসিন্দাদের এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখে না। এলাকার বেশির ভাগ মানুষ কোথায় রাজউকের অফিস এবং তাদের যে এসব ব্যাপারে নিয়ম মেনে চলতে হবে, তা-ও জানেন না!

সরেজমিন পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। তবে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত ইউনিয়নগুলোর ক্ষেত্রে। এসব ইউনিয়নের মধ্যে রয়েছে শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়া, ডেমরা, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও ও নাসিরাবাদ। ডেমরা এলাকার মহাসড়কসংলগ্ন অর্ধশত ভবন গড়ে উঠেছে বিল্ডিং কোড না মেনেই। এলাকার স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ভবনের মালিকরা স্বল্প খরচে নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকৌশলী ও স্থপতিদের এড়িয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় রাজমিস্ত্রিদের দিয়ে কলাম ছাড়াই ইটের গাঁথুনির ওপর দোতলা, তিনতলা ভবন গড়ে তুলছেন। তিন বা চারতলা বা আরো বেশি তলার ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিল্ডিং কোডের মান অনুসরণ করা হচ্ছে না। আবার এসব এলাকা সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু রাজউক এখনো না আসায় অনুমোদন নেওয়ারও প্রয়োজন হচ্ছে না। ফলে অনুমোদন ছাড়া নির্মিত শত শত বহুতল ভবন কয়েক বছরের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) মেনে চলার নির্দেশনা থাকলেও বেশির ভাগ ভবন মালিকই তা মানছেন না। তা ছাড়া অন্তর্ভুক্ত এসব ইউনিয়ন যখন ড্যাপের আওতাভুক্ত ছিল, তখনো ড্যাপের নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি; বরং পুরনো নিয়মে ‘ব্যাক ডেটে’ ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদন নিয়ে বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদনহীন এসব ভবন নিয়ে রাজউক ভবনে অভিযোগের অন্ত না থাকলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না রাজউক। রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে রাজউক এসব বিষয়ে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে না পারলেও ‘নিয়ম না মেনে করা’ সব ভবনকেই একদিন নিয়মের আওতায় আনা হবে।

গেণ্ডারিয়া ধূপখোলা মাঠের কাছে খালপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেহের উদ্দিন বলেন, ‘এ এলাকায় কেউ বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করে না। জায়গাও ছাড়ে না। রাজউক বা সরকারি কোনো সংস্থা এসব এলাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও মাথা ঘামায় না। সেহেতু এলাকার বাসিন্দারা যে যেভাবে পারছেন, ভবন তৈরি করছেন।’ দীননাথ সেন রোডের স্থানীয় বাসিন্দা নির্মল সেন বলেন, ‘অনুমোদনবিহীন এসব ভবন একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি বিরোধপূর্ণ। নিয়ম না মানার কারণে ভবনের মালিকরা তাঁদের খেয়াল-খুশিমতো রাস্তার জন্য জায়গা না ছেড়েই ভবন নির্মাণ করছেন। কেউবা রাস্তার জায়গা বা অপরের জায়গার ওপর ভবন নির্মাণ করছেন। এসব কারণে মহল্লায় কয়েকবার ঝামেলাও হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কমিশনারের কাছে গিয়েও তেমন সমাধান হয়নি।’ এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, কদমতলী, ডিস্ট্রিলারি রোড, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, জুরাইন, নারিন্দা, ইসলামপুর, শাঁখারীবাজার, কোতোয়ালি, বংশাল, ওয়ারী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুরসহ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বেশির ভাগ এলাকায়ই এমন বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ করতে দেখা গেছে। পুরান ঢাকার ইসলামপুর, ৬০ পাটুয়াটুলী এসআর ঘড়ি ভবন মার্কেটের ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রসারিত ভবনের ছয়-সাততলার নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে নানা সময়ই মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মার্কেটের দোকান মালিক, ব্যবসায়ী এবং মালিক সমিতি; কিন্তু কোনো কিছুই তোয়াক্কা না করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে মালিক। সরেজমিন দেখতে গেলে ব্যবসায়ীরা জানান, পুরান ঢাকার ইসলামপুর, ৬০ পাটুয়াটুলী এস আর ঘড়ি ভবন মার্কেটের বর্তমান বয়স ২০ বছর। নির্মাণকালে ভবনটি চারতলাবিশিষ্ট প্ল্যানিং ছিল; কিন্তু প্রতিষ্ঠার সময়ই ভবনটির ওপরে অতিরিক্ত এক তলা নির্মাণ করা হয়। পরে ভবনটির মালিক পরিবর্তন হওয়ার পর নতুন মালিক ভবনের প্ল্যানিং না মেনে পাঁচতলা থেকে সাততলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইদানীং রাজধানীতেই কয়েকটি ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দেখা গেছে একের পর এক ভবন নির্মাণ হলেও এক ভবনের সঙ্গে অন্য ভবনের দূরত্ব এক ফুট জায়গাও নেই। মানিকনগর মহাসড়কসংলগ্ন একটি ভবনসংলগ্ন আরো একটি ভবন গড়ে উঠেছে কলাম ছাড়াই। ভবন দুটি ঘুরে দেখা গেছে, দুটি ভবনের মাঝে ফাঁকা জায়গা চার আঙুল পরিমাণ বা এর চেয়েও কম।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর বুয়েট রাজধানীর ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি টেকনিক্যাল সার্ভে চালিয়েছে। সার্ভেতে দেখা যায়, ধানমণ্ডি এলাকার ৬৭ শতাংশ ভবনই সাত মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল নয়, আর মোহাম্মদপুর এলাকায় তা ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন যদি পুরান ঢাকা ও বাসাবো, খিলগাঁও, শাজাহানপুর এলাকায় এই সার্ভে করা যায়, তাহলে আমাদের আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ ভবনই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজধানীতে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা উচিত।’

বাংলাদেশের বিল্ডিং কোড সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল বারী বলেন, ‘আমাদের দেশের সর্বপ্রথম বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। পরে ২০০৬ সালে এটি পার্লামেন্ট থেকে গেজেট আকারে প্রকাশ পায়, পরিণত হয় আইনে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিল্ডিং কোডে সব ধরনের ভবনের জন্যই আলো-বাতাস চলাচল করার ব্যবস্থা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, ভার বহন ক্ষমতা, নির্মাণপ্রক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে ভবন তৈরি করার ক্ষেত্রে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিল্ডিং কোডে। নিরাপদ ভবন তৈরি করার ক্ষেত্রে ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ জরুরি বিষয়। বাড়ি তৈরির পর একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর অনুমোদিত অকুপেন্সি সার্টিফিকেট অবশ্যই নিতে হবে। ভবন তৈরির চুক্তি করার সময়ই চুক্তিতে অকুপেন্সি সার্টিফিকেটসহ ভবনের গুণগত মান নিশ্চিতে শর্ত যোগ করে দেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আকতার হোসেন সরকার বলেন, ‘বিল্ডিং কোড না মানায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তৈরি হচ্ছে—এটার সত্যতা রয়েছে। এটি টেকনিক্যাল বিষয় হওয়ায় এটা সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে সব ধরনের নির্মাণের জন্য সরকারিভাবে ইটের বিকল্প হিসেবে দেশীয় ও জ্বালানিবিহীন সামগ্রী ব্যবহারের নির্দেশ আছে। এসব নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ভবন নির্মিত হলে আমরা ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারব।

এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ‘বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে রাজউক নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবাই এগিয়ে এলে টেকসই ও নিরাপদ আবাসন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা