kalerkantho

হামলা-মামলায় পর্যুদস্ত বিএনপি

শফিক সাফি   

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হামলা-মামলায় পর্যুদস্ত বিএনপি

নির্বাচনী প্রচারণায় ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুস সালাম

ভোটারদের আশা ছিল তাঁরা রাজধানী ঢাকায় জমজমাট একটি নির্বাচন দেখবেন; কিন্তু ভোটের সাত দিন আগেও তাঁরা দেখছেন তার ঠিক উল্টো চিত্র। ক্ষমতাসীনরা একচেটিয়া প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে গেলেও দেখা নেই বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের। গ্রেপ্তার আতঙ্ক, প্রচারণায় বাধা আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা প্রতিনিয়ত হয়রানি হচ্ছেন তাঁরা এমন অভিযোগ তাঁদের। ঢাকায় ২০টি আসন। এর মধ্যে ১৫টি আসনই রাজধানীতে। এই আসনগুলোর মধ্যে ঢাকা-৪, ঢাকা-৮, ৯, ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থীদের কিছুটা প্রচার-প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে। তবে বেশির ভাগ প্রার্থীই গোপনে প্রচারণার চেষ্টা করছেন। যেমন—প্রচারপত্র তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজার নিচে দিয়ে আসছেন।

কেন নামতে পারছেন না—এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভোটাররা বলছেন, রাজধানীতে বিএনপিতে হেভিওয়েট প্রার্থীর সংখ্যা কম। যাঁরা আছেন তাঁরাও তুলনামূলক দুর্বল। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা মির্জা আব্বাসের কথা বলেন। হেভিওয়েট এই প্রার্থী কিছুটা প্রচারণা চালাতে পারছেন। ১০ ডিসেম্বর থেকে মূলত প্রচার-প্রচারণা শুরু হলেও গত ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে একচেটিয়া ক্ষমতাসীনদের প্রচারণায় আধিক্য দেখা গেছে। প্রচারণা শুরুর পর থেকে বিরোধী পক্ষের ওপর বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনায় ছেদ পড়েছে তাদের কর্মকাণ্ডে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের কেউ কেউ চেষ্টা চালিয়েও মাঠে নামতে পারছেন না। কেউ কেউ বলছেন, কৌশলগত কারণে বড় শোডাউন করা যাচ্ছে না। রাজধানীতে বিএনপির কোনো প্রার্থীর পোস্টার দেখা যায়নি। মির্জা আব্বাসের বাড়ির সামনে কিছু পোস্টার দেখা গেলেও অন্যরা তা-ও লাগাতে পারেননি।

অন্যদিকে ঢাকা-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আবু আশফাকের প্রার্থিতা বাতিল করেছেন উচ্চ আদালত। তাই তিনি এখন মাঠে নেই। ভোটের প্রচারণায় প্রথম দিন ঢাকায় বিএনপির কোনো নেতাকে মাঠে দেখা যায়নি। দ্বিতীয় দিনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও তাঁর সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাসকে লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেলেও আফরোজা আব্বাসসহ কয়েকজন মহিলা কর্মী-সমর্থককে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হাতে নাজেহাল হতে হয়। ঢাকা-২ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানের ছেলে ইরফান ইবনে আমান অমিকে দেখা যায় বিশাল শোডাউন করতে। এরপর আর তাঁকে মাঠে খুব একটা দেখা যায়নি।

ঢাকা-৩ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিশাল শোডাউন দিয়েছেন। এর পর থেকে তিনি কৌশলতা বজায় রেখে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ঢাকা-৪ আসনে সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রচারণায় আব্বাসের পরই এগিয়ে আছেন। প্রতিদিনই তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যাচ্ছেন। তাঁর বাড়িতে ককটেল হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, কর্মীদের গ্রেপ্তারের মধ্যেও প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করার পর তাঁর ওপর হামলা ও নজরদারি যেন আরো বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘যত বাধাই আসুক প্রচারণা অব্যাহত থাকবে।’

ঢাকা-৫ আসনে নবীউল্লাহ নবীকেও দৃশ্যমান প্রচারণায় দেখা যায়নি। ঢাকা-১৮ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপনকে চেনেন না তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষই। ঢাকা-১৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেওয়া হয়েছে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মো. শফিকুর রহমানের হাতে। সিলেটের এই নেতা সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হয়ে বিএনপির কাছে হেরেছেন। ওই এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই বললেই চলে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পুলিশ মাঠে নামতেই দিচ্ছে না। ঢাকা-১১ আসনে লড়ছেন উত্তর শাখা বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুমের সহধর্মিণী শামীম আরা বেগম। কাইয়ুম মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। এই প্রার্থী প্রথম দিকে শোডাউন দেওয়ার চেষ্টা করলে মামলা হয় চারটি। পরে পুলিশ তাঁর মিছিলের ছবি তুলে ধরে ধরে গ্রেপ্তার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে প্রচারণার কৌশল পরিবর্তন করে তিনি লিফলেট বিতরণ শুরু করেন। ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুস সালাম রাজধানী ফকিরাপুল এলাকার বাসিন্দা। তিনি মোহাম্মদপুর এলাকায় নির্বাচন করছেন। তাই তাঁর প্রচারণায় নেই তোড়জোড়। গত বুধবার তিনি প্রচারণা চালাতে না পারার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেন। ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। তিনি বিএনপি নেতা এস এ খালেকের ছেলে। নির্বাচনী এলাকায় পিতার প্রভাব থাকলেও এখনো বড় ধরনের কোনো শোডাউন করতে দেখা যায়নি তাঁকে। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের বাধার কারণে তিনি নামতে পারছেন না। ঢাকা-১৭ আসনে এবার ধানের শীষের প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি ভোলা থেকে ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছেন। এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রচারণায় তাঁকে দেখা যায়নি।

ঢাকা-৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। এই আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার সমর্থকই বেশি। সুব্রত চৌধুরীকে মাঝেমধ্যে লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের সেই অর্থে এখনো তাঁর পাশে দেখা যায়নি। একই অবস্থা ঢাকা-৭ আসনেও। সেখানেও ধানের শীষের প্রতীক পেয়েছেন গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু। এ এলাকায় বিএনপির মরহুম সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর সমর্থকই বেশি। তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা মনোনয়ন চেয়েও পাননি। তাই এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীরা এখনো মন্টুর পাশে এসে দাঁড়াননি। ঢাকা-২০ আসনে ধানের শীষের প্রতীক পেয়েছেন তমিজউদ্দিন। আদালতের দ্বারে দ্বারেই ঘুরে তাঁর প্রার্থিতা হয়েছে।

ঢাকা-১০ আসনে এবারের প্রার্থী আব্দুল মান্নান। প্রচারণা চালাতে না পেরে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, এর মধ্যেও শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠে থাকবেন। ঢাকা-১২ আসনে প্রার্থী যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আসনে এখনো মাঠেই দেখা যায়নি নীরবকে।

বিএনপি কেন মাঠে নামছে না—এমন প্রশ্ন ছিল দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর কাছে। জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলার সংখ্যা ২৫৮টি। এজাহারে জ্ঞাত আসামির সংখ্যা ৪২ হাজার ৬৬৩, অজ্ঞাত পরিচয় আসামির সংখ্যা ৩৬ হাজার ৮৮৩, গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছয় হাজার ৬৭৫ এবং হত্যার সংখ্যা চার। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে পুলিশ এক সপ্তাহ ধরে বেছে বেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করতে ক্রাক ডাউনে নেমেছে। এ অবস্থায় কিভাবে মাঠে থাকবে নেতাকর্মীরা। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে লড়াই করে প্রচারণা চালাতে হচ্ছে। তবে তিনি আশা করেন সেনাবাহিনী মাঠে নামলে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারবেন নেতাকর্মীরা।

মন্তব্য