kalerkantho

অভিমত

নির্বাচন কমিশন সংবিধানের কাছে নয়, সরকারের কাছে অধিক দায়বদ্ধ!

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নির্বাচন কমিশন সংবিধানের কাছে নয়, সরকারের কাছে অধিক দায়বদ্ধ!

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেশের সর্বময় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা চলে আসে নির্বাচন কমিশনের হাতে; কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে আইন আনুযায়ী যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, বিভিন্ন প্রার্থীকে মারধর করা, গাড়িবহরে হামলা করা—এসব দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত তার যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ বলছি এই কারণে, যখনই নির্বাচনের বিভিন্ন বিধি-বিধান ভঙ্গের প্রশ্ন আসে, তখনই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের কথা আসে। নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচনী আচরণ ও বিধিমালা প্রণয়ন করেছে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময় সব কিছু বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায়।

কোথাও কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে, শুধু নিন্দা জ্ঞাপন করা বা প্রেস ব্রিফিং করার মধ্যেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন সীমাবদ্ধ থাকছে। কিন্তু আইনে প্রশাসন পুরোই নির্বাচন কমিশনের অধীনে। স্পষ্ট বলা আছে, নির্বাচন কমিশন যে রকম নির্দেশ দেবে, প্রশাসন তা মানতে বাধ্য। তাহলে প্রশাসনকে কে এই নির্দেশ দেবে। আইনানুগ উত্তর হলো, নির্বাচন কমিশন।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা, ভোটের জন্য সমান পরিবেশ তৈরি, সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি, এককথায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দায়িত্ব হলো নির্বাচন কমিশনের। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন চিন্তাভাবনার কথা বলেছিল। তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কমিশনের এখতিয়ারবহির্ভূত। নির্বাচন কমিশন এ বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেনি, এটা দুঃখের বিষয়। কারণ নির্বাচন সুষ্ঠু করা কমিশনের দায়িত্ব। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে যা যা করা দরকার, কমিশন তা-ই করবে—এটা আমরা আশা করি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হলো নির্বাচন, যে নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানের নির্বাচনগুলো এ মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। এ জন্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সোচ্চার হতে হবে।

নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে নিরাপত্তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকতে হয়। বর্তমানে মানুষ নির্বাচন নিয়ে বেশ সংশয়ে রয়েছে। কারণ তারা মনে করে, ভোট দিলেও যা, না দিলেও তা। তা ছাড়া মানুষ নিশ্চিত নয় যে সে তার ভোট দিতে পারবে কি না। বর্তমানে নির্বাচনের ব্যাপারে গণ-উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, বর্তমানে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে না। এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিতর্ক’ একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ কয়েক দিন আগে একজন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘আমি মনে করি না নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে।’ এর পরদিনই এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘মাহবুব তালুকদার সত্য বলেননি। নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।’ এখানে একটি বিষয় হলো, মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য একেবাইে তাঁর ব্যক্তিগত। কিন্তু একজন কমিশনার যখন এ রকম মন্তব্য করেন, তখন এটি স্পষ্ট যে আসলেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা, ভোটের জন্য সমান পরিবেশ তৈরি, সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি, এককথায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দায়িত্ব হলো নির্বাচন কমিশনের

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অর্থ হলো, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়া সব দল ও সব প্রার্থী সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। অনেক প্রার্থী এখনো মামলার কারণে মাঠে নামতে পারেননি। প্রতিনিয়ত বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার চলছে। নাগরিক মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করা হচ্ছে। জনগণের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আড়ি পাতা হয়েছে। আবার প্রোপাগান্ডার ঢংয়ে সেই আলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। বলা চলে, প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এক ভয়ের শাসন। সরকার যা-ই বলুক না কেন, জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে একটি বিশ্বাস খুঁটি গেড়ে বসেছে যে এবারের নির্বাচন সরকারের আঁকানো ছকে হবে। তারা এটিও আশঙ্কা করছে, তাদের ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে দেবে। ভোটকেন্দ্র দখলসহ জনমনে আরো নানা আশঙ্কা রয়েছে।

এখন যেটি হচ্ছে, সরকারি দল ও জোটের বাইরে বিভিন্ন প্রার্থীর প্রচারকাজে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বাধা, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা ও ফেস্টুনে আগুন দেওয়া। নির্বাচনী প্রচার শুরুর মুখেই সংঘটিত সহিংসতায় প্রাণহানির খবরে নাগরিক সমাজ শঙ্কিত ও মর্মাহত। এই সব কিছু দেখে-শুনে মানুষের মনে এ ধারণাই পাকাপোক্ত হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের কাছে নয়, সরকারের কাছে অধিক দায়বদ্ধ! নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ না করে, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের আজ্ঞাবহরূপে কাজ করছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্ট যে ইশতেহার দিয়েছে, তা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনায় এসেছে, ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার। তারা ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধের বিচার চলমান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কেউ কেউ বলছে, যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতকে সঙ্গে রেখে কিভাবে এই বিচার চলমান রাখা সম্ভব। এটি সম্ভব। কারণ দল হিসেবে জামায়াত এখনো যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি রায়ে জামায়াতকে নিয়ে দেওয়া মতামতে বলা হয়েছে, দলটি যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত হতে পারে। এটি হলো মতামত। আর যুদ্ধাপরাধী শুধু জামায়াতেই নেই, অন্যান্য দলেও রয়েছে। ফলে ঐক্যফ্রন্টের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব।

আরেকটি বিষয় বলা হচ্ছে, ড. কামালের মতো ব্যক্তি কিভাবে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করল। আসলে জামায়াত ঐক্যফ্রন্টের কোনো অংশ নয়। তারা বিএনপির ঐক্যজোটে রয়েছে। এ ছাড়া ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। জামায়াতের সঙ্গে শুধু বিএনপিই জোটবদ্ধ হয়নি; আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগও জোট বেঁধেছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৮৬ ও ১৯৯৫-৯৬ সালে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধেনি? ১৯৮৬ সালে দলটি তার নিজের স্বার্থেই নির্বাচন করেছিল; যেমনটি করেছিল আওয়ামী লীগ। আর ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে, সেই আন্দোলনে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিও যোগ দিয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পেতে। এরশাদ আমলে তিন জোটের পাশাপাশি জামায়াত যুগপৎ আন্দোলন করেছিল।

এখন বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করত, তাহলে কারো কিছু বলার থাকত না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিএনপির নেতৃত্ব শুধু জামায়াতকেই আন্দোলনের সহযাত্রী করেনি, ১৮-দলীয় জোটে এমন কিছু ধর্মান্ধ দলকে যুক্ত করা হয়েছে, যারা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফায়। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকরা যত কমজোরই হোক না কেন, তারা চিন্তাচেতনায় বামপন্থার অনুসারী। দুই জোটের মৌলিক পার্থক্যটাও এখানে। তবে আমরা একইভাবে সাবেক স্বৈরাচারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাঁধাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আবার যেই হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে এত কথা, তাদের সঙ্গে এখন আওয়ামী লীগের সখ্য আলোচনা-সমালোচনারও দাবি রাখে।

এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের জন্য তেমন কিছু রাখা হয়নি। এবারের নির্বাচনে ভোটার প্রায় ১০ কোটি ৪৪ লাখ। এর মধ্যে তরুণ ভোটারের সংখ্যা চার কোটি ২০ লাখ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা নির্বাচনী ‘ট্রাম্প কার্ডের’ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি ইশতেহারগুলোতে।

এই দেশকে ভালো ও সুন্দর করতে হলে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে সংবিধান রচিত হয়েছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন থাকতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যে যখন ক্ষমতায় আসে, সংবিধানের কথা ভুলে যায়। কেউ সংবিধান মেনে চলে না। নিজেদের স্বার্থের জন্য যেটুকু দরকার ওইটুকু পালনে প্রয়োজনে বারবার সংশোধনও চলে। কিন্তু দেশের নাগরিকদের জন্য যে বিধানগুলো রয়েছে, তার ধারে-কাছে যাওয়া হয় না। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সংবিধান মেনে চলতে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি থাকা উচিত ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কেউ কিছু বলেনি; এমনকি আমাদের কোনো সুধী বা বুদ্ধিজীবী এ নিয়ে কোনো সমালোচনাও করছেন না।

শ্রুত লিখন : রেজাউল করিম

মন্তব্য