kalerkantho

সাক্ষাৎকার

গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্স খাতের শ্রমিক প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা নেই

শান্তনু মজুমদার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্স খাতের শ্রমিক প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা নেই

বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরাজমান পরিস্থিতি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

২০১৪ সালের চেয়ে অনেক ভালো। তবে ২০০৮ সালের চেয়ে ভালো কি না তা বলা যাচ্ছে না। দেশজুড়েই প্রচার-প্রচারণা বেশ ম্রিয়মাণ। সাধারণ লোকজনের মধ্যেও যে খুব একটা সাড়া আছে, তেমন নয়। লোকের কি আগ্রহ হারিয়ে গেল? নাকি ‘রাজা আসে রাজা যায়’ ধরে নিয়ে সাধারণ মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকাটাই কাজের কাজ মনে করছে? নাকি লোকে দেয়ালের লিখন পড়ে ফেলেছে? সাধারণ লোকের পেছনে টাকা ঢালার প্রবণতাও এবার কম মনে হচ্ছে। এটা একদিক থেকে ভালো। তবে লোকের সাড়া কমে যাওয়াটা খারাপ।

 

বাড়ছে নির্বাচনী সহিংসতা। প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না। আপনি কিভাবে দেখছেন?

সব কিছুকে ‘দ্য বেস্ট’ হিসেবে পাওয়ার আবদার বাদ দিতে হবে। এগুলো এক ধরনের ক্লিশে। ‘বেটার’ নিয়ে ভাবা যাক। তাই আমরা ভাবব, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সহিংসতার মাত্রাটা কেমন? ২০০৮ বা ২০০১ সালের তুলনায় কেমন? এভাবে দেখটাই সংগত। গাছের পাতা নড়লেই ঝাঁপিয়ে পড়ে দুয়ো দেওয়ার অভ্যাসটা বন্ধ হওয়া দরকার। এ ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে রাজনৈতিক ইস্যুকে বিরাজনৈতিকভাবে দেখা বা বিরাজনৈতিক করে ফেলার একটা প্রবণতা। আরে, অনেক প্রার্থীর কাছে নির্বাচন হচ্ছে লগ্নি। লগ্নি সফল করার জন্য তাঁরা যা ইচ্ছা তা-ই করে থাকেন। আবার ক্ষমতাসীনদের অনেকের রক্ত গরম থাকে কিংবা আত্মবিশ্বাসে ঘাটতিজনিত কারণে তাঁরা হিংস্র হয়ে উঠতে পারেন। বিরোধীরা কতটা সহিংসতা করতে পারে, তা-ও আমরা দেখেছি ২০১৪ সালে। এবারও দু-এক জায়গায় যে দেখা যায়নি, তা নয়। আসল কথা হচ্ছে, এগুলো ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আমরা গড়তে পেরেছি কি না? উত্তর হচ্ছে, না। আর সাধারণ জনগণের মধ্যেও এসব ব্যাপারে যে খুব একটা শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, তা একেবারেই বলা যাবে না। অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না? উত্তরে বলব, কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, তা আমি নিশ্চিত নই। এটা শুধু এই সরকার-সেই সরকারের ব্যাপার না। এটা সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। এটা সামরিক শাসন অবসানের পরে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানাদি গড়ে তোলার কষ্টকর কাজটা করার পরিবর্তে অনির্বাচিত লোকজন দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করার দুর্বুদ্ধির পরিণাম।

 

একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসি, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কী ধরনের ভূমিকা কাম্য?

আসল দরকার হচ্ছে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শিবিরে মর্মার্থসহ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ মান্য করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। সুষ্ঠু-সুষ্ঠু বলে দলীয় বা মতাদর্শিক বিরোধিতার জায়গা থেকে চেঁচালে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। এর জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠা দরকার। এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের অস্তিত্ববিরোধী ও মানবতাবিরোধী শক্তি বাদে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে।

 

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার দিয়েছে। এই ইশতেহার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

নির্বাচনী ইশতেহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আমাদের দেশে সাধারণ জনগণের কাছে ইশতেহার এখনো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে হয় না। আর রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে ব্যর্থ বা দুর্বল প্রমাণের জন্য প্রতিপক্ষের ইশতেহারকে ব্যবহার করে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বলে একটি অংশ আছে, এটা পছন্দ হয়েছে। গ্রাম এখনো বাংলাদেশের প্রাণ। গ্রামগুলোকে সত্যিকার অর্থে পাল্টাতে চাইলে ইশতেহারে উল্লিখিত নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করলেই হবে না। এর জন্য লাগবে ভূমি ব্যবহারসংক্রান্ত বিশদ পরিকল্পনা। স্থানীয় সরকারে জনগণের ক্ষমতায়নসংক্রান্ত অংশে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু কিভাবে ব্যাপারটা ঘটবে তা লেখা নেই। বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে ইতিবাচকভাবে পাল্টাতে চাইলে অধুনা অনালোচিত ভূমি সংস্কার প্রসঙ্গটি নিয়ে ভাবতে হবে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে এর কোনো উল্লেখ নেই। সম্ভবত আওয়ামী লীগ এখন আর এটা নিয়ে ভাবে না।

শ্রমিকদের নিয়ে কথাবার্তা আছে ইশতেহারে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই স্তম্ভ গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্স খাতের শ্রমিক প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা নেই। অন্যান্যের সঙ্গে গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্যও রেশনিং চালুর কথা বলা হয়েছে। এটা কেমন হলো? গার্মেন্ট শ্রমিকদের দাবিদাওয়াগুলো কি শুধু রেশনে সুরাহা হবে? প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে আনুমানিক অর্ধকোটি শ্রমিক যে খাতে জড়িত, সে খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এলে ভালো হতো। আর প্রবাসী শ্রমিকদের কোনো উল্লেখ দেখা গেল না ইশতেহারে। অর্থনৈতিক অবদানের কথা বিবেচনা করে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রসঙ্গেও সুনির্দিষ্ট বার্তা থাকলে ভালো হতো। দুর্নীতি প্রসঙ্গে অনেক কথাবার্তাই আছে এই ইশতেহারে। তবে এগুলো কতখানি কার্যকর হবে, তা জানি না। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে চাই, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার মতো সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী কোনো তৎপরতা তেমন একটা সাফল্যের মুখ দেখতে পাবে না।

বিএনপির ইশতেহারের শুরুর দিকেই সংবিধান সংশোধন করে নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে বলে জানানো হয়েছে। কথাটা আরো কেউ কেউ বলেন। কেন বলেন? আমরা কি সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছি? তাহলে জাতীয় পর্যায়ে কথাবার্তা হোক। প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রধান কি নির্বাচিত হবেন? নাকি নির্বাচিত না হয়েই প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করবেন? এটা তো একটা সংসদীয় ব্যবস্থা! নাকি? প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রধান ক্ষমতা মজুত থাকাটাই সংসদীয় রীতি। প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা ঠেকানোর জন্য প্রথাগত রাস্তা মাপাটাই ঠিক হবে। ব্যক্তির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে ওঠার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অর্জনের পথটা দীর্ঘ। আমাদের মতো সামরিক শাসন-আক্রান্ত দেশের ক্ষেত্রে এ কথা আরো বেশি করে সত্য। এখানে কোনো একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপারে অস্থিরতা বা ক্ষোভ-আক্রোশের কোনো সুযোগ নেই। অনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিণতি কতটা হতে পারে, তা পাকিস্তান থেকে জানা যায়। জেনারেল জিয়াউল হক সম্পূর্ণ নিজ স্বার্থে কাজটা শুরু করেছিলেন। জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ১৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে এটাকে সংবিধানের অংশ বানিয়েছিলেন। এতে খুব সুবিধা হয় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীদের পটাপট হটিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে।

বিএনপি ইশতেহারে অজস্র বিষয়ে কথা বললেও যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। কোনো একটি পক্ষের বিরাগভাজন হতে চায় না বলেই কি এমন অবস্থা? সব মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেছে তারা। ভালো কথা। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে মুখ না খুলে মুক্তিযোদ্ধাদের কি সম্মান দেখিয়েছে বিএনপি? বিএনপিসহ কতগুলো ছোট দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে অবশ্য যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ফ্রন্টে বিএনপি হচ্ছে মেইন প্লেয়ার। বিএনপির ইচ্ছার বাইরে কিছু হবে না। যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট থেকে তফাতে থেকে, বিএনপি মতাদর্শিক জায়গাটিতে নয়া মিত্রদের চেয়ে পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর খুশি-অখুশিকেই বিবেচনায় রেখেছে। 

সাক্ষাৎকার গ্রহণে : কবীর আলমগীর

মন্তব্য