kalerkantho

ইশতেহার প্রসঙ্গে নীরবতা!

আলোচিত হতে পারে কিভাবে?

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আলোচিত হতে পারে কিভাবে?

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের বড় দুই দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে কী কী করবে, থাকে সেসব প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দলগুলো সেসবের কতটুকু পালন করে? পালন না করলে কী হয়? পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আদৌ কিছু আছে কি? এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন আবুল হাসান রুবেল

নির্বাচনের আগে সব দলই ইশতেহার ঘোষণা করে। সেসব ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতি থাকে, অঙ্গীকার থাকে, ঘোষণা থাকে। কিন্তু সেসবের কতটুকু দলগুলো পালন করে? পালন না করলে কী হয়? পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আদৌ কিছু আছে কি? ইশতেহারগুলো করে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের উদ্দেশে। অন্য কথায়, ভোটপ্রার্থীরা ভোটারদের উদ্দেশে। আমাদের দেশে নির্বাচনী ইশতেহারকে দুই পক্ষের কেউ-ই খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখে বলে মনে হয় না। কিন্তু কেন এ রকম ঘটে, সেটাই আমাদের অনুসন্ধানের একটা দিক।

এবারের পরিস্থিতি নিয়েই এই অনুসন্ধান শুরু করা যাক। নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে, প্রার্থী যাচাই-বাছাই শেষ, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমাও শেষ। চলছে নির্বাচনী প্রচারণার সময়। তা-ও প্রায় শেষ। কিন্তু এখনো অনেক প্রার্থীর প্রার্থিতা ঝুলে আছে। নির্বাচন কমিশন আরপিওর সর্বশেষ সংশোধনীতে কারো প্রার্থিতা বিষয়ে আপত্তি করার যে বিধান করেছে, তার বলে আটকে গেছে অনেকে। অনেক প্রার্থী কারাগারে। সরকারবিরোধীদের প্রচার-প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে আছেন। এ অবস্থায় সবার অংশগ্রহণের সমান সুযোগ আছে—এমন নির্বাচনের পরিবেশই তৈরি হয়নি। এরপর রয়েছে ভয়মুক্তভাবে ভোটারদের ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তা ও ভোট সঠিকভাবে গণনা করে ফলাফল প্রকাশের নিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। সেসব হলেই শুধু একজন ভোটার নিশ্চিত হতে পারেন যে তাঁর ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ও তাঁর সামনে বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। তখন ইশতেহার নিয়ে চিন্তা করার সুযোগও তাঁর তৈরি হয়।

কিন্তু সেটিও আসলে যথেষ্ট নয়। ইশতেহারে যা-ই থাক, সরকারে গিয়ে যদি যাচ্ছেতাই করার সুযোগ থাকে, ইশতেহার পালন না করলেও যদি তাতে কিছুই আসে না যায়, তাহলে ভোটাররা কী কারণে ইশতেহার নিয়ে ভাববে? আমাদের নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের আবেদনের যে ফরম তৈরি করেছে, তার একটা অংশ হচ্ছে আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটুকু আপনি পালন করেছেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি পালন না করা কারো সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—এ রকম কথা কখনো কেউ শোনেনি। সংসদ সদস্য যদি জনগণের কাছে করা ওয়াদার বরখেলাপ করেন, তাহলে তাঁকে সদস্যপদ থেকে প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ জনগণের হাতে নেই। তার চেয়েও বড় কথা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের কোনো অধিকারই আসলে নেই। দলের বিরুদ্ধে মতামত প্রদান করলে তাঁর সংসদ সদস্য পদই বাতিল হয়ে যাবে। এ রকম অবস্থায় প্রতিশ্রুতি পূরণ করা না করা ‘বেচারা’ সংসদ সদস্যদের হাতেও আসলে থাকে না। ফলে জবাবদিহিতার কোনো কার্যকর পথই এখানে নেই। 

এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার বাইরে ইশতেহারকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারতেন বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ বা গণমাধ্যম। কিন্তু সেখানেও একই শূন্যতা। দুনিয়ার দেশে দেশে যখন ক্ষমতাসীনদের কঠিন জবাবদিহিতার আওতায় আনাকে সাহসী সাংবাদিকতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, আমাদের এখানে সরকারের গুণগান করা আর বিরোধীদের হেনস্তা করাকেই বড় সাংবাদিকের লক্ষণ মানা হয়। নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে প্রশ্নের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। যেমন ক্ষমতাসীন দলের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুতে যানচলাচল শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এই সময়সীমার তিন বছর পার হলেও এখনো কেন তার অর্ধাংশমাত্র শেষ হলো? সেই প্রশ্ন না করে আমাদের বড় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করবেন, আপনি চলে গেলে এই উন্নয়নের কী হবে? পদ্মা সেতু কি আপনি না থাকলে হবে? অথবা দুর্নীতি দমনকে ইশতেহারে সর্বাধিক গুরুত্ব দিলেও শেয়ারবাজার কেলেংকারির মতো বড় দুর্নীতির বিচারের প্রতিশ্রুতি না দেওয়া কি দ্বিচারিতা নয়? অথবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে তাদের ইশতেহারে; কিন্তু প্রধান বিচারপতিকে স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে গিয়ে দেশছাড়া হতে হলো, সে বিষয়ে কি প্রশ্ন করার সাহস রাখেন আমাদের সাংবাদিকরা? অথবা গত ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনের জন্য চাকরির নিশ্চয়তা তৈরির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এবারও তা-ই দেওয়া হয়েছে। মাঝে বেকারের সংখ্যা আরো বেড়ে গেছে, এটা কিভাবে সম্ভব হলো? এসবের কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করার সাহস আমাদের এখানে গণমাধ্যমের ভেতর দেখা যায়নি। এমনকি তারা বিরোধী জোটের ইশতেহার বিষয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন তোলেননি। যেমন চাকরির বয়সসীমা তুলে দেওয়া বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বাস্তবায়নযোগ্য কি না, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তাঁরা কিভাবে আনবেন ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা তেমন কোনো প্রশ্ন করেননি; বরং সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী জামায়াত বিষয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করাই তাঁদের প্রগতিশীল ও সাহসী ভূমিকার স্বাক্ষর বলে মনে করেছেন। বিপরীতে তাঁরা সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দল কেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করল না—সেই প্রশ্ন তোলেননি। আর বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের স্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে এসবের ফলে। সুবিধা পেয়ে ও নিয়ে কিংবা ভয়ে তারা চুপ করে গেছেন।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

এরপর আসে ভোটারদের ভূমিকার প্রশ্ন। বহু দেশে ইশতেহার নিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রচার চালায়, প্রার্থী-দলগুলোর মধ্যে বিতর্কের আয়োজন হয়, যাতে জনগণ ইশতেহারের খুঁটিনাটি নিয়ে জানতে পারে। বাংলাদেশে এই পুরো ব্যবস্থাই অনুপস্থিত। অথচ অনেক বিজ্ঞজনকেই দেখা যায় ইশতেহার নিয়ে আলোচনা না হওয়ার জন্য ভোটারদের অজ্ঞতাকেই দায়ী করতে। এটা আসলে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধির দৈন্যকেই প্রকাশ করে। ওপরের বিষয়গুলো যদি ঠিকঠাক থাকত, তার পরও যদি জনগণ ইশতেহার নিয়ে ভাবতে নিরুৎসাহী হতো, তাহলে তাদের নিশ্চয়ই শাপশাপান্ত করা যেত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা একেবারেই অবান্তর ও মূর্খতারই নামান্তর।

তাহলে ইশতেহার আলোচিত হতে পারে, ভোটের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হতে পারে কিভাবে? বর্তমান সাংবিধানিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কাঠামো ভেঙে একটা গণতান্ত্রিক কাঠামো বদলে একটা গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, সর্বস্তরে জনগণের প্রতিনিধি ও জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। নাগরিকদের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের কাজকর্মের জবাবদিহিতার কাঠামো তৈরি করে। স্বাধীন সাংবাদিকতার সব বাধা অপসারণ করে। দুর্ভাগ্যবশত এর কোনোটিরই সামান্যতম উল্লেখও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ইশতেহারে নেই। বিরোধী ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে এর বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ থাকলেও সেগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। বাম গণতান্ত্রিক জোটের ইশতেহারে এর কিছু উল্লেখ থাকলেও সেখানেও অনেক বিষয়ই আলোচিত হয়নি। যত ইশতেহার আমার দেখার সুযোগ হয়েছে, তার মধ্যে শুধু গণসংহতি আন্দোলনের ইশতেহারেই এই বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু তাদের প্রার্থী মাত্র তিনজন এবং তাদের পক্ষে ক্ষমতায় গিয়ে এই ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অবশ্য সেটি তারা ইশতেহারে উল্লেখও করেছে এবং এসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে। সেই জাতীয় ঐকমত্য এখনো পর্যন্ত সুদূরপরাহত বলেই মনে হচ্ছে। কারণ একটা বিরাট অংশ এসব নিয়ে একেবারেই ভাবছে না। তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে বা ক্ষমতাসীন হতে আগ্রহী। ইশতেহারকেন্দ্রিক রাজনীতি গড়ে ওঠার পূর্বশর্ত একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তখন বিভিন্ন ইস্যু, জনগণের বিভিন্ন অংশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি একটা সত্যিকার মনোযোগের কেন্দ্রে আসতে পারে।

রাজধানীর পল্টনে মুক্তি ভবনে বাম গণতান্ত্রিক জোট নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে

এর আগ পর্যন্ত বিষয়টা থাকে জোরের। কার কত টাকা-পয়সা আছে, কার কত পেশিশক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে, পুলিশ-প্রশাসন কার পক্ষে, বিদেশি নানা শক্তি কার পক্ষে ভূমিকা নিচ্ছে ইত্যাদিই তখন ভোটের নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকে, সেখানে ইশতেহারের আলোচনা কখনো প্রধান হতে পারে না। কিন্তু ইশতেহার নিয়ে চিন্তা করতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা শুধু কতিপয় বিশেষজ্ঞ বা বুদ্ধিজীবীর আলোচনা হতে পারে না, ঘরে ঘরে ভোটারদের মধ্যে ইশতেহার নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। যেকোনো বিষয়ই দুই দিক থেকেই শুরু হতে পারে। ওপরে যে আলোচনা করা হলো, সেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা কিভাবে জনগণকে ইশতেহার নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে পারে তার আলোচনা। কিন্তু সেটি যখন অনুপস্থিত, তখন আলোচনাটা জনগণের তরফ থেকেই শুরু হতে পারে। আর এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রত্যেকেরই হাতে হাতিয়ার আছে তা প্রকাশের। কাজেই আলোচনাটা শুরু হোক তলা থেকেই।

যেমন রাষ্ট্র মেরামতের দাবি উঠেছে সমাজের সবচেয়ে নিষ্পাপ অংশ কিশোর-তরুণদের পক্ষ থেকে। আর একমাত্র ক্ষমতাসীন দল বাদে বাকি সবাই কোনো না কোনোভাবে তাকে তাদের ইশতেহারে যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। একই কথা খাটে কোটা সংস্কার আন্দোলন বা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন বিষয়েও। কাজেই সমাজের ভেতর থেকেই চাপ তৈরি করতে হবে রাষ্ট্রকে বদলানোর। এমন রাষ্ট্র তৈরি করার চাপ, যেখানে ইশতেহার দেখেই মানুষ ভোট দেবে, মার্কা দেখে নয়। সেই স্বাধীন, ভয়হীন সবার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হোক। আসুন আজ থেকেই তার কাজ শুরু করি, ইশতেহার কাটাছেঁড়া শুরু করি। শুরুটা আমাকে, আপনাকে দিয়েই হোক।

মন্তব্য