ঢাকা-১৯ আসনটি ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার শিমুলিয়া, ধামসোনা, পাথালিয়া, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, বনগাঁও, সাভার সদর ইউনিয়ন ও সাভার পৌরসভা নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশের সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে এই আসনটিতেই ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সাভার উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, ঢাকা-১৯ আসনে ভোটার সংখ্যা সাত লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৬। বর্তমানে ঢাকা-১৯ এর এই আসটিতে সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. মো. এনামুর রহমান এনাম। এবারও তিনি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীও একজন ডাক্তার। তিনি হলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরীক দল বিএনপির প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। তিনি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন। তাই এ আসনটিতে মূলত লড়াই হবে দুই ডাক্তারের মধ্যে। আওয়ামী লীগ চায় আসনটি ধরে রাখতে আর বিএনপি চায় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে। আর নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় এ দুটি দলই এখন সভা-সমাবেশ, পথসভা, উঠোন বৈঠক ও মতবিনিময়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। এবারের নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যেও রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। আগামী নির্বাচনে কোন দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসবে, আওয়ামী লীগ, নাকি বিএনপি তথা ঐক্যজোট। এ নিয়েই চায়ের আড্ডা বা যেকোনো বৈঠকে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চলছে ভোটার ও রাজনৈতিক মহলে নানা হিসাব-নিকাশ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মো. এনামুর রহমান এনাম। বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বাবুকে পরাজিত করে বিএনপির এই দুর্গে আঘাত হানেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ। বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. মো. এনামুর রহমান ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি মনোনয়ন পেয়ে প্রতিদিনই জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ আসনটিতে অন্য যেসব প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাঁরা হলেন—ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ (পাখা)—মো. ফারুক খান, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল)—মো. নূরুল ইসলাম, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা)—আবু ইউসূফ খান, পিডিপি (বাঘ)—মো. সরোয়ার হোসেন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা)—মো. আইনুল হক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন)—ইদ্রিস আলী, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই)—সৌমিত্র কুমার দাস, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল)—আবুল কালাম আজাদ। স্বাধীনতার পর এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদের বাবা তালুকদার মো. আনোয়ার জং। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের বাবা দেওয়ান মো. ইদ্রিস। এরপর ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগ নেতা শামসুদ্দোহা খান মজলিশ জাতীয় পার্টির প্রার্থী অনামী প্রসাদ রায়কে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এর পর থেকে দীর্ঘদিন এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে পারেনি। বিএনপি প্রার্থীর বারবার জয়ী হওয়ার আরেক কারণ হচ্ছে জামায়াতের ভোটব্যাংক রয়েছে এখানে। ফলে এ আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে দীর্ঘদিন পর ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ বিএনপির দুর্গে আঘাত হানেন। তিনি বিএনপি প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বাবুকে পরাজিত করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদকে বাদ দিয়ে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় ধসে পড়া রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে ব্যাপক সুনাম অর্জনকারী এনাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মো. এনামুর রহমান এনামকে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন ডা. এনাম। এবারও দলের একটি বড় অংশ তার সমর্থনে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালে ডা. মো. এনামুর রহমান এলাকার রাস্তাঘাটের সংস্কার করেছেন এবং স্কুল-কলেজ, মাদরাসাসহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বিরুলিয়া ব্রিজ ও সাভার-ধামরাইয়ের মেলবন্ধন বংশী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করেছেন। এতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে ব্যাপক। সাভারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া দুই প্রার্থী এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. এনামুর রহমানের এবং বিএনপির প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর ব্যানার ও পোস্টারে সয়লাব গোটা এলাকা। দুজনই ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচারণা। পোস্টার, লিফলেট, জনসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন তাঁরা। সাভার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সভার পৌরসভার মেয়র হাজি আব্দুল গণি কালের কণ্ঠের ৩৬০ ডিগ্রিকে বলেন, ‘ডা. এনামের টাকা কামানোর ধান্ধা নেই। নেই ক্যাডার বাহিনী। তিনি জিম্মিও করেন না কাউকে। মিথ্যা মামলাও দেন না। নেতাকর্মীদের সমীহ ও সন্মান করেন। কাউকে ছোট করে কথা বলেন না; এমনকি বিগত দিনে একবারও কোনো উসকানিতে পা দেননি। কোনো নেতার সমালোচনা করে দলকে ছোট করেননি। এলাকার অনেক উন্নয়নও করেছেন। এসব কারণে তিনি অবশ্যই জয়লাভ করবেন।’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরীক দল বিএনপির প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুও এখন প্রতিদিন গণসংযোগ করে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘লোকজনের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া লক্ষ করছি। ৩০টি রাজনৈতিক মামলার কারণে হাজতবাস এবং দীর্ঘদিন এলাকা থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। তাই অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। যথেষ্ট জনসংযোগ সম্ভব হয়নি। তবু ভোটাররা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে আমি বিপুল ভোটে জয়ী হব।’ প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর নির্বাচনী পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমি কোনো গাড়ি পোড়াইনি। আমি বিএনপির রাজনীতি করি। তাই আমাকে গাড়ি পোড়ানোর মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। দলীয় নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন।’ প্রশাসনের কাছে তিনি নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করার আহ্বান জানান।