kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

‘সফলতার জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা’

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সফলতার জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা’

নুসরাত জাহান। বর্তমানে নিউট্রিশন কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত আছেন একটি বেসরকারি হাসপাতালে। চাকরির পাশাপাশি সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁর একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন  জে এফ পিয়াসা

 

‘ছোটবেলা থেকেই আমার হস্তশিল্পের প্রতি দুর্বলতা। বাসার দেয়ালজুড়ে টাঙানো হস্তশিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম। সেই ভালো লাগা থেকেই ছোটবেলায় হাতের কাজ শিখি। তবে সেই শখের শিল্প একসময় নিজের জীবনে সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়ে ধরা দেবে কখনো ভাবিনি। যখন রাজধানীর সরকারি গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে অনার্সে ভর্তি হই এবং হোস্টেলে উঠি, তখন সারা দিন চলে গেলেও দুপুরে খুব একঘেয়ে লাগত। সময় কাটানোর জন্য করার মতো কিছুই পেতাম না। হঠাৎ মাথায় আসে, আমি তো হাতের কাজ জানি। সেটা নিয়ে কিছু করা যেতে পারে। পরিকল্পনা করলাম এবং পরিকল্পনা মোতাবেক কাজেও নেমে পড়লাম। ভাবলাম বেশ কিছু থ্রি-পিস তৈরি করতে হবে। সে ভাবনা থেকে প্রথমে ডিজাইন তৈরি করলাম। সে ডিজাইন অনুসারে নিউ মার্কেট থেকে কিছু কাপড়ে ব্লক করে আনলাম। প্রথমে আমার ডিজাইনে ১০টি থ্রি-পিস ব্লক করিয়ে আনি। সেগুলো বন্ধুবান্ধবদের দেখালাম। তারা বেশ পছন্দ করল। অল্পদিনের মধ্যেই বন্ধু, পরিচিতজনদের মধ্যে সেগুলো বিক্রি হয়ে গেল। তারপর অনেকের অনুরোধে ১২০টি থ্রি-পিসের অর্ডার দিলাম। সেগুলোও বিক্রি হয়ে গেল।’ নুসরাত জাহানের ব্যবসার শুরুর গল্পটা এমনই ছিল।

তিনি আরো বলেন, ‘একপর্যায়ে বন্ধুরাও আমার ব্যবসা সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। তারা আমার সঙ্গে কাজ করতে চায়। ভাবলাম মন্দ নয়। অনেকে মিলে কাজ করলে কাজের চাপটাও কম পড়বে। সেই ভাবনা থেকে আরো তিন বন্ধুকে আমার ব্যবসার সঙ্গে জড়ালাম। মোট চারজনে মিলে পাঁচ হাজার করে টাকা নিয়ে মোট ২০ হাজার টাকার থ্রি-পিস অর্ডার দিলাম। কিন্তু বাধা আসে অপ্রত্যাশিত অন্য একদিক থেকে। হলের সুপারিনটেনডেন্টের কাছে অভিযোগ যায়, আমরা হলে ব্যবসা শুরু করেছি। এই বাধাটা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা ঢাকাসহ ঢাকার বাইরে যেসব জেলায় আমাদের বন্ধুবান্ধব রয়েছে, তাদের কাছে অল্প করে প্রডাক্ট পাঠিয়ে দিই। যাতে তারা আশপাশের বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের কাছে সহজেই বিক্রি করতে পারে। সেই সঙ্গে বলে দিই তারা লাভের একটা অংশও পাবে। এভাবে ২০ হাজার টাকা খাটিয়ে একপর্যায়ে পুঁজি দাঁড়ায় লাখ টাকায়।

তবে এ ব্যবসা সম্পর্কে আমার পরিবার কিছু জানত না। সত্যি কথা বলতে কি, আমার ফ্যামিলি বিশেষ করে আমার মা-বাবা এখনো জানে না যে আমি ব্যবসা করি। মেয়েমানুষ হয়ে ব্যবসা করাটা আমাদের সমাজ এখনো ভালোভাবে দেখে না। সব জায়গা থেকে একটা কথা ওঠে যে মেয়ে হয়ে ব্যবসা করতে হবে কেন! যা হোক এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নিই এককভাবে ব্যবসা করার। তাই ২০১১ সালে নিউ মার্কেটে একটা দোকান নেব বলে সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু আমি মেয়ে হওয়ায় আমার কাছে দোকান ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায় নিউ মার্কেট দোকান মালিক কর্তৃপক্ষ; এমনকি মার্কেটের অন্য মালিক-কর্মচারীরাও এ সিদ্ধান্ত সমর্থন করে ভেটো জানায়। অবশেষে আমার স্বামী ও কিছু বন্ধুর সহায়তায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দোকান ভাড়া নিতে সমর্থ হই। এ ছাড়া দোকান নেওয়ার পরও আমাকে কম ভোগান্তির শিকার হতে হয়নি! অন্য দোকানিরা আমার দোকানকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করত। আমার ডিজাইন নকল করত। আমার চেয়ে কম দামে কাপড় বিক্রি করে দিত। তার পরও আমি টিকে গেছি আমার সততা, সৃজনশীলতা আর কঠোর পরিশ্রমের জন্য।

দু-তিন বছর এভাবেই শোরুম চালাই। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে ব্যবসা; আমার জন্য দুদিক সামলানো কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে ২০১২ সালে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ সংসার আর ব্যবসায় নিয়োগ করি। এখন আমার নিউ মার্কেটে ‘স্বপ্ন ডাঙ্গা বুটিক’ নামের একটি শোরুম রয়েছে। পণ্য উৎপাদনের জন্য রয়েছে একটি কারখানা। ধানমণ্ডির বাসায় হোলসেলে বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া ‘স্বপ্ন ডাঙ্গা বুটিক’ নামের একটি অনলাইন পোর্টালও রয়েছে। যেখান থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে। এখন আমার মাসিক আয় লাখ টাকার ওপরে। বেশ কিছু লোকের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে পেরেছি। আমার কর্মচারীর সংখ্যা এখন ১৫ জন। তাদের জীবিকা আমার এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ভালো লাগে কিছু মানুষের জন্য হলেও তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি বলে।’

আপনার পরিবার থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে নুসরাত বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে সর্বত্র সহযোগিতা করেছে। সে সব সময় আমার পাশে ছিল। আমি যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতাম, তখন সে আমাকে সাহস জুগিয়েছে। আমাকে কখনো কোনো কাজে বাধা দেয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যবসা আর সংসার গুছিয়ে ২০১৭ সালে আবার আমি চাকরিতে যোগদান করি। এখন আমি একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিউট্রিশন কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করছি।’

নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নতুনদের উদ্দেশে বলব, যদি ব্যবসায়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে চান, তাহলে দ্রুত শুরু করে দিন। তবে যে ব্যবসাই করুন না কেন, সে ব্যাপারে থাকতে হবে অভিজ্ঞতা। এ ক্ষেত্রে পছন্দের ব্যবসায়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। তবে যাই করুন না কেন, কাণ্ডজ্ঞান থাকতে হবে। নিজের ইচ্ছা, দক্ষতা, বাজারের চাহিদা, পণ্যের সহজলভ্যতাসহ নানা দিক বিবেচনা করে ব্যবসায়ে নামতে হবে। যতটা সম্ভব বিচার-বিবেচনা করে নামলে যাত্রাটা সহজ হয়। কারণ যেকোনো কাজের সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা মানে অর্ধেক কাজ হয়ে যাওয়া। তাই যেকোনো কাজের সফলতার জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা। আর কাজের ক্ষেত্রটা স্বপ্নের জায়গা হলে তো কোনো কথাই নেই। সেটা আপনার কাজই মনে হবে না। তাই ভালো লাগার বিষয় না হলে, সে বিষয় নিয়ে না এগোনোই ভালো। নিজের সৃজনশীলতা আর মেধাকে কাজে লাগান। সততা ও পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যান। সাফল্য আসবেই।’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই ব্যবসা নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। চাকরির বাইরে আমার দিন-রাত এই ব্যবসাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। ইচ্ছা রয়েছে ব্যবসার পরিধিটা আরো বাড়াব। যেখানে আরো অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাদের জীবনে সমৃদ্ধি আসবে।’

 

নিউ মার্কেটে ‘স্বপ্ন ডাঙ্গা বুটিক’ শোরুম


 

নুসরাতের কারখানায় পণ্য উৎপাদনে ব্যস্ত শ্রমিকরা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা