kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

অরিত্রীদের মনের খোঁজ

মারুফা মিতু   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অরিত্রীদের মনের খোঁজ

শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীকে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ দিয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করার প্রতিবাদে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেয়েরা ছবি : মঞ্জুরুল করিম

অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। অরিত্রী অধিকারী ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। মোবাইলের মাধ্যমে নকল করার অভিযোগে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরের দিন তার মা-বাবাকে প্রতিষ্ঠানে ডেকে পাঠানো হয়। মা-বাবাকে অপমান করা হয় অরিত্রীর সামনেই। এরপর অরিত্রী সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে যায়। বাইরে জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে ছিল অরিত্রী। ভেতরে সে দেখতে পায় তার বাবা শিক্ষকের ‘পা জড়িয়ে ধরেছেন’। এরপর কান্না করতে করতে বাড়ি চলে যায় সে। রাজধানীর শান্তিনগরের নিজ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় অরিত্রী। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল (ঢামেক) কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অরিত্রীর পরিবারের দাবি, রবিবার সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা চলার সময় তার কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এ জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ তার মা-বাবাকে ডেকে পাঠায়। তাঁরা সোমবার স্কুলে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁদের জানায়, অরিত্রী মোবাইল ফোনে নকল করছিল, তাই তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের (টিসি) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ মেয়ের সামনে মা-বাবাকে অনেক অপমান করে। অপমান সইতে না পেরে মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

আত্মহত্যায় প্ররোচনা, শিক্ষার্থীর অভিভাবককে অপমান করায় এবং বন্ধুকে হারানোর প্রতিবাদে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর দেওয়ার হুমকির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ভেঙে দেওয়াসহ প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপালের অপসারণ দাবি করেছিল অন্য শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন দাবিদাওয়া-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করেছে তারা। ‘বিচার চাইলেই টিসি কেন’, ‘আর কোনো অরিত্রী চাই না’, ‘এ কেমন শিক্ষা, যার জন্য শিক্ষার্থীকে জীবন দিতে হয়’, ‘প্রচলিত আইনে বিচার চাই’, ‘এ কী শুধু আত্মহত্যা?’ ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বিক্ষোভে এমন প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা।

অরিত্রীর সহপাঠী এক শিক্ষার্থীর মা আঞ্জুমান আরা বলেন, ‘নবম শ্রেণির ছাত্রী কী কারণে আত্মহত্যা করতে পারে। আত্মহত্যা করলেই প্রেম-ভালোবাসাজনিত কারণ ঠিক নয়। আর এবার অরিত্রীর ঘটনাটি তো স্পষ্ট। এর পরও কী আমরা শুধু আত্মহত্যা বলব এই ঘটনাকে? দীর্ঘদিনের বিচারহীনতাই আজ আমাদের এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে।’

অরিত্রীর আত্মহত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী ভয়াবহ অরাজকতা, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির শিকার! ভালো লেকচার দেওয়ার বাইরেও একজন শিক্ষকের আরো বেশ কিছু গুণ থাকা দরকার

আহারে জীবন। কত ঠুনকো এই জীবন। একটুখানি ভুলের মাসুল কতভাবেই না দিতে হলো তাকে। মা-বাবা হারালেন প্রিয় তাঁদের এই সন্তানকে। মায়ের খালি হওয়া বুক কী আর ফিরে পাবে তার প্রিয় এই সন্তানকে। শুধু অরিত্রীর এই আত্মহত্যা নয়, আন্দোলনে নেমে আসা প্রতিটি কিশোরী জানিয়েছে শিক্ষকদের তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের কথা।

একজন শিক্ষার্থী যখন ভুল করে, তখন শিক্ষকদের দায়িত্ব তাকে ইতিবাচকভাবে বোঝানো। স্কুল কী শুধু পুঁথিগত বিদ্যার? আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তাই তো দেখছি এখন প্রতিদিন। অরিত্রীর অভিভাবককে স্কুল কর্তৃপক্ষ অপমান করে। মা-বাবাকে শিশু-কিশোরদের সামনে হেনস্থা করলে কচিমনে কষ্টই বাড়ে। সেই দিকে আমাদের সুনজর কী আছে কারো?

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ স্কুলে আলাদা করে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। স্কুলের শিক্ষকরাই কাউন্সেলিং দেন, কিন্তু কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এত দামি একটা স্কুলের কাউন্সেলিংয়ের অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে বাকিদের কী অবস্থা তা বোঝাই যায়। স্কুল আর কলেজের শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্যে ব্যস্ত। শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিং দিতে গেলে তাঁদের মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান হয়ে যাবে। তথাকথিত এই স্কুলটির কোচিং বাণিজ্য বেশ রমরমা। কোচিং না করলে নাকি পরীক্ষায় ভালো নম্বরও দেওয়া হয় না। সন্তানদের দেওয়ার মতো সময় আমাদের ব্যস্ত মা-বাবার নেই। ভালো স্কুলে সন্তানকে ভর্তির ক্ষেত্রে ডোনেশন দেওয়ার জন্য মা-বাবা যত যত্নের সঙ্গে লিঙ্ক খুঁজে বের করেন, লবিং করেন ততটা যত্নশীল যদি তাঁরা সন্তানদের লেখাপড়ায় এবং তাদের অন্য বিষয়ে হতেন, তাহলে অরিত্রীরা আত্মহত্যা করত না।’

অরিত্রীর আত্মহত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী ভয়াবহ অরাজকতা, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির শিকার! টিচিং ইজ নট এভরি ওয়ানস কাপ অব ট্রি। ভালো লেকচার দেওয়ার বাইরেও একজন শিক্ষকের আরো বেশ কিছু গুণ থাকা দরকার; মানবিকতা, পরিমিতিবোধ, সেন্স অব প্রপোরশন এবং ডেডিকেশনের মধ্যে অন্যতম।

আমাদের শিক্ষকরা স্কুলে সন্তানদের বন্ধু হবেন। ক্লাসে পড়ার বাইরে তাঁরা শিক্ষার্থীদের নানা কথা শুনবেন। তাদের সমস্যার কথা। তাদের মনের কথা। ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে তারা যেসব প্রতিবন্ধকতার দেখা পায় শিক্ষক অভিভাবক হয়ে সন্তানের মতোই তাদের সব কিছু দেখবেন। মনোযোগ দিয়ে তাদের সমস্যার সমাধান করবেন। বিষয়টি যখন এমন হওয়ার কথা ছিল, তখন আমাদের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাশে বন্ধুর মতো না হয়ে তাদের ওপর নানা রকম মানসিক অত্যাচার করেন। সেই অত্যাচারের বহিঃপ্রকাশ একজন অরিত্রীর মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই। অরিত্রীদের বাঁচাতে, তাদের মনের বন্ধু হয়ে তাদের পাশে থাকতে মা-বাবাকেও যেমন মনের খোঁজ রাখতে হবে তাঁদের সন্তানদের;  তেমনি শিক্ষকদের চোখ গরম করা পাঠদানের মানুষটিই শুধু নন, বন্ধু হয়ে পাশে থাকতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা