kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

অবৈধ দখলে ফুটপাত

টাকা তুলছেন বাজার সমিতির নেতারা

জহিরুল ইসলাম   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টাকা তুলছেন বাজার সমিতির নেতারা

রাতের অন্ধকার নয়, দিনের আলোতেই রাজধানীর বেশির ভাগ ফুটপাত উধাও হয়ে যায় অবৈধ দোকানের অন্তরালে। বিভিন্ন এলাকায় এর মাত্রা কমবেশি হলেও রাজধানীবাসীর এই যন্ত্রণা নিত্যসঙ্গী। এলাকার

ক্ষমতাসীন দলের নেতা, স্থানীয় কাউন্সিলরের ছত্রচ্ছায়া, পুলিশের দেখেও না দেখা, ফুটপাত থেকে বাজার কমিটির আলাদা টাকা উত্তোলনসহ নানা কারণে ফুটপাতের অবৈধ দোকান এখন ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল রাস্তায়। যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দখলে ফুটপাত উধাও হওয়ার এমন চিত্র মিলল রাজধানীর শাহবাগ থানার আওতাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের হাতিরপুল কাঁচাবাজার

এলাকায়।

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাতিরপুল কাঁচাবাজারসংলগ্ন বীর-উত্তম সি আর দত্ত রোডের পূর্বপাশে কোনো ফুটপাত নেই! হারিয়ে গেছে অবৈধ দখলে। সোনারগাঁও রোড কাঁটাবন হয়ে হাতিরপুল পর্যন্ত রয়েছে চা দোকান, বাইক সারাইয়ের গ্যারেজ, খাওয়ার হোটেল, মুদি দোকান, সবজি ও মাছ-মাংসের বেশ কিছু দোকান, যার সবই বৈধ। কিন্তু এর সঙ্গে গজিয়ে উঠেছে অর্ধশত অবৈধ দোকান। যার মধ্যে রয়েছে শাকসবজি, মাছ, ফল ও চায়ের দোকান। অস্থায়ী দোকানগুলো ফুটপাত দখল করায় এই সড়কে ফুটপাত আছে সেটা বোঝায় যায় না। নিজের নেওয়া ভাড়া দোকানের সামনে এমন গজিয়ে ওঠা দোকান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন দোকানি। রহমত নামের এক দোকানি বলেন, ‘আমরা অনেক টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে বসেছি। আর কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থে কয়েক হাজার টাকার জন্য দোকানের সামনে এমন দোকান বসাচ্ছে। যার কারণে আমাদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে।’ প্রায় সব দোকানের মালামালই (দোকান নম্বর ১৮৮, ১৮৯, ১৯০) রাখা হয়েছে ফুটপাত ছাড়িয়ে রাস্তায়। কিছু জায়গায় ফুটপাত খুঁজে পেলেও কোথাও দোকানের সাজসজ্জার কারণে ব্যবহার উপযোগী নেই। অভিযোগ আছে, রাস্তা ভাড়া দিয়ে টাকা উত্তোলন করছেন হাতিরপুল কাঁচাবাজার সমিতির কিছু অসাধু সদস্য। নিয়াজ মোর্শেদ নামে হাতিরপুল এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘বাসার সামনে বাজার থাকায় সুবিধা হয়। তবে বাজারের ভেতরে ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে এখন আর যেতে ইচ্ছা করে না। আর ফুটপাতের দোকানের কারণে তো মূল সড়ক দিয়েই হাঁটতে হয়। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।’

বাজারের হাতিরপুল মোড় অংশে দেখা যায় ছয়টি অস্থায়ী ফলের দোকান, যা গড়ে উঠেছে ফুটপাতের ওপরই। আর পরিবাগের দিকের সড়কে রয়েছে আরো প্রায় ৪০টি অস্থায়ী ফল ও সবজির দোকান। যার কারণে ফুটপাতে হাঁটার কথা ভাবাই যায় না। সব মিলিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই এলাকায় গেলে মনে হবে ফুটপাতে দোকান বসা কোনো অপরাধ বা সাধারণের সমস্যার কোনো কারণই নয়। অভিযোগ আছে, ফুটপাতে বসা অস্থায়ী দোকান থেকে দুই হাজার আর রাস্তায় বসা দোকানি থেকে এক হাজার টাকা করে নেয় সমিতির লোকজন। আর টাকা না দিলে দোকান উঠিয়ে ফেলতে হয়। এই টাকা আদায় করা হয় মাসিকভাবে। তবে পুলিশও মাঝে মাঝে ‘চা খাওয়ার’ টাকা নিয়ে যায় বলে জানান কয়েকজন অস্থায়ী দোকানি।

সড়কে দোকান চালাচ্ছেন কোনো অনুমতি নিয়েছেন কি না? এমন প্রশ্ন করলে এক দোকানি বলেন, ‘অনুমতি না নিলে কি আর এখানে বসতে দেয়। আবার প্রতি মাসে টাকাও দিতে হয়।’ কী পরিমাণ টাকা দেন? আর কারাই বা এই টাকা তুলতে আসে—এমন প্রশ্নের উত্তরে এই দোকানি বলেন, ‘ফুটপাতের জন্য মাসে দুই হাজার দিতে হয় আর রাস্তায় বসলে এক হাজার টাকা। এই টাকা সমিতির লোক নেয়, পুলিশও আবার টুকটাক (মাঝেমধ্যে) টাকা নিয়ে যায়।’ জানা যায়, বাজারটিতে দুটি কমিটি রয়েছে। কমিটির নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে রয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যে সময় যার ক্ষমতা বেশি, সে-ই ফুটপাতের রাজা, তারাই টাকা ওঠানোর জন্য লোক পাঠায়। গ্রুপ দুটি হলো হারুণ গ্রুপ ও মোতালেব গ্রুপ নামে পরিচিত।

জানা যায়, বর্তমানে হারুণ গ্রুপের চেয়ে মোতালেব গ্রুপের প্রভাব বেশি হওয়ায় তারাই টাকা নিয়ে থাকে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোতালেব গ্রুপের একজন বলেন, ‘ভাইয়ের এখন তেমন লোকজন নেই। টাকা তোলে হারুণ গ্রুপের শাহ আলম, আলমগীর, লিটনসহ কয়েকজন। আমরা কোনো টাকা তুলতে যাই না।’

অভিযোগের বিষয়ে হাতিরপুল কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির একাংশের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘আমার কোনো লোক ফুটপাতের দোকান থেকে টাকা তোলে না। তারা শুধু মাসের ১০ তারিখে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আসে। বাজারের ২৪৭টি দোকানের যে কমিটি আছে, আমি তার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছি। আমার সীমানা মাংসের দোকান পর্যন্ত। আর কিছু জানি না। তবে কয়েকজন তাদের সীমানায় ফুটপাতে দোকান বসিয়ে টাকা তোলে জানি। আমার কোনো লোক এই কাজে যায় না।’ আপনার সীমানায় কারা দোকান বসালো—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। হতে পারে অন্য কেউ দোকান বসিয়ে টাকা তুলছে।’

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ হামিদ খান বলেন, ‘একবার না, কয়েকবার দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফল পাই না। উচ্ছেদ করার পরও সমিতির লোকেরা আবার দোকান বসায়, বিশেষ করে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোতালেবের লোকেরা এই সমস্যাটা বেশি করছে। তার লোকজন দিয়ে দোকান থেকে টাকা ওঠায়। আর দোকান বসায়। কয়েক দিনের মধ্যে আবারও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা