kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

মাদাম তুসোর আদলে ঢাকায় প্রথম সেলিব্রিটি গ্যালারি

রাতিব রিয়ান   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাদাম তুসোর আদলে ঢাকায় প্রথম সেলিব্রিটি গ্যালারি

ভেতরে ঢুকতেই দেখবেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসে আছেন কাঠের একটি চেয়ারে। সামনে পাণ্ডুলিপির আয়োজন। সাদা টেবিলক্লথ বিছানো টেবিলটায় তিনি পড়ায় মগ্ন। কাগজ-কলমে তিনি সখ্য গড়ছেন সৃষ্টির সঙ্গে। সেখানে শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, আছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও। কারাগারে থাকা জাতীয় কবি ভাঙছেন ‘কারার ওই লৌহ কপাট।’

নজরুলের পাশেই জায়গা করে নিয়েছেন সাদা ধুতি পরিহিত ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। একটু দূরে তাকাতেই দেখা যায় জনতার উদ্দেশে হাত উঁচিয়ে রাখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তাঁর বাঁ পাশে ফরমাল পোশাকে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিংবদন্তিদের মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়েন আর্নেস্টো চে গুয়েভারা। এক হাতে পিস্তল, আরেক হাতে জ্বলতে থাকা চুরুট নিয়ে প্রসারিত দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন এই বিপ্লবী। এর ডান পাশেই করজোড়ে স্নিগ্ধ অভিব্যক্তিতে মানবতার দূত মাদার তেরেসা। উল্টো দিকেই ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম। সিঙ্গাপুর, ভারতসহ নানা দেশে এ ধরনের জাদুঘর আছে। যাঁরা অনেক অর্থ খরচ করে সেসব জাদুঘরে ঘুরতে যান, তাঁদের জন্য সুখবর আছে। রাজধানীর গুলশানে মনীষীদের নিয়ে এ রকম ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে। গুলশান ১-এর ৫ নম্বর বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে এই গ্যালারি।

সম্পূর্ণ জাদুঘর না হলেও বিশাল গ্যালারির আদলে ঢাকায় এমন উদ্যোগ এই প্রথম। ‘সেলিব্রিটি গ্যালারি’ শিরোনামের এই গ্যালারিতে পৃথিবীর নানা অঙ্গনের বিখ্যাত সব ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে। শুরুতেই ৩২ জন ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি ভাস্কর্য নিয়ে পথচলা শুরু করেছে সেলিব্রিটি গ্যালারি। খ্যাতিমান ভাস্কর্য শিল্পী মৃণাল হক এর উদ্যোক্তা। প্রায় ছয় মাস ধরে এই গ্যালারি নির্মাণে কাজ চলছিল। ৩৭টি ভাস্কর্য নিয়ে কাজ শুরু হলেও প্রথম দিকে প্রদর্শিত হবে ৩২ জন ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি।

ফাইবার গ্লাসের আশ্রয়ে বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক থেকে নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা কিংবা ফুটবলার থেকে চলচ্চিত্রের নানা চরিত্রের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছেন ভাস্কর মৃণাল হক। সেসব ভাস্কর্য নিয়ে লন্ডনের মাদাম তুসো মিউজিয়ামের আদলে এই ভাস্কর সাজিয়েছে সেলিব্রিটি গ্যালারি। শনিবার (৮ ডিসেম্বর) থেকে খুলে দেওয়া হয়েছে এই প্রদর্শনালয়টি। ১২ কাঠার ওপর নির্মিত দ্বিতল ভবনের নিচতলায় রয়েছে বলিউডের হার্টথ্রব শাহরুখ খান থেকে আর্জেন্টাইন ফুটবল সুপারস্টার লিওনেল মেসিসহ ৩০ সেলিব্রিটির প্রতিকৃতি। কয়েক দিনের মধ্যে আরো কিছু প্রতিকৃতি যোগ হবে বহরে। কিছুদিন পর বাড়ির দোতলায় ঠাঁই পাবে বিশ্ববিখ্যাতদের আরো ৪০টি ভাস্কর্য। সেটির সংখ্যা দাঁড়াবে অন্তত অর্ধশত।

এ ব্যাপারে মৃণাল হক বলেন, ‘লন্ডন, প্যারিস কিংবা আমেরিকায় এ রকম জাদুঘর-গ্যালারি আছে। আমাদের দেশ থেকে অনেকে ওইসব জাদুঘরে যান। তাঁরা বাংলাদেশে এসে সেসবের প্রশংসাও করেন। আমার মনে হলো, আমরা চাইলে বাংলাদেশেও তো এ রকম কিছু করতে পারি, যাতে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে বলবে এ রকম কিছু দেখে এলাম।’ তিনি আরো বলেন, ‘সেলিব্রিটি গ্যালারিটি মূলত লন্ডনের মাদাম তুসো মিউজিমের আদলে সাজানো হয়েছে। এ দেশে এমন প্রদর্শনালয় এটাই প্রথম। আমাদের দেশের মানুষ বাইরে তারকাদের ভাস্কর্য জাদুঘরে ছবি তুলে সময় কাটায়। আমি সে রকম একটা কাজ দেশে করতে চেয়েছি। তবে এটাকে জাদুঘর নয়, গ্যালারি হিসেবে নাম দিতে চেয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি ঢাকার সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য করেছি। মোজাইক, পেইন্টিং, টাইলস ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে এসব ভাস্কর্য করেছি। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরেছি।’ নবনির্মিত গ্যালারির ব্যয়ভার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ ব্যয়ভার আমার ব্যক্তিগত খাত থেকে করেছি। আশা করি দর্শনার্থীরা এগিয়ে এসে এই গ্যালারির সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে উদ্যোগী হবেন।’

সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকবে সেলিব্রিটি গ্যালারি। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা সময় কাটাতে পারবেন এই প্রদর্শনালয়ে। প্রথম দিন প্রদর্শনী দেখতে আসা বাড্ডার সাতারকুলের বাসিন্দা ওয়াহিদ সুজন বলেন, ‘এই উদ্যোগটি একটি অভিনব উদ্যোগ। এখানে এসে মনে হয়েছে একেকজন জীবন্ত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই গ্যালারিটি আরো এগিয়ে যাবে।’

গুলশান-২ নম্বরের বাসিন্দা চিত্রশিল্পী ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘শিল্পী মৃণাল হক তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন এই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য। চমৎকার এই উদ্যোগকে অভিবাদন জানাই। ঢাকার এই মাদাম তুসো গ্যালারি আশা করি জনপ্রিয়তা পাবে।’

সর্বসাধারণের প্রবেশে কোনো টিকিট সংগ্রহ করতে হবে কি না জানতে চাইলে মৃণাল হক বলেন, ‘এখনো এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে চার লাখ টাকায় ভাড়া করা এই গ্যালারিটি দর্শনার্থীদের সাহায্য ছাড়া অব্যাহত রাখা কষ্টকর। আমি আশা করি, গ্যালারিটি দেখার পর আরো অনেকেই এর ব্যাপ্তি ছড়িয়ে দিতে সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা