kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের ২২ হাজার অবৈধ গুদাম!

কবীর আলমগীর   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের ২২ হাজার অবৈধ গুদাম!

জ্বলছে পুরান ঢাকার নিমতলীর একটি বাড়ি। ২০১০ সালে এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এক শরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। ওই দুর্ঘটনার পর প্রাণঘাতী কেমিক্যাল কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও তা আজও কার্যকর হয়নি

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক পণ্যের গুদাম রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৫ হাজারই রয়েছে বাসাবাড়িতে। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ ধরনের রাসায়নিকের ব্যবসা চলে সেসব গুদামে।

পুরান ঢাকার এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোপাইলসহ ভয়ংকর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থ আগুনের সামান্যতম সংস্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।

২০১০ সালের ৩ জুন ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট আগুন কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের কারখানা, গুদাম আর দোকানে ছড়িয়ে পড়লে ১২৪ জনের প্রাণহানি হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর দাবি ওঠে, পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা থেকে প্রাণঘাতী কেমিক্যাল কারখানা আর গুদাম সরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু অবৈধ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসা বাড়িয়েই চলেছেন। স্থানীয় প্রভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, উপযুক্ত জায়গা পেলে তাঁদের ব্যবসা অন্য জায়গায় সরিয়ে নেবেন। এদিকে আবাসিক ভবনে এসব কারখানা গড়ে তোলায় ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।

জন দাবির মুখে একাধিকবার এসব অবৈধ কারখানা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবতা প্রতিকূল থাকায় তা আলোর মুখ দেখেনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউনের তালিকা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও জীবনঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে শিগগিরই এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জোরালো অভিযান চালানো হবে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাসাবাড়িতেই এখনো মজুদ রাখা হচ্ছে রাসায়নিক দাহ্যবস্তু। এতে যেকোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। পরিবেশবিদদের দাবি, এসব কারখানায় আগুন লাগলে তা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। তাই জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। নিমতলী থেকে লালবাগের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গুদাম, কারখানার সঙ্গেই মানুষের বসবাস। শ্রমিকরা কাজ করছেন ঝুঁকি নিয়ে। দুর্ঘটনার ঝুঁকির বিষয়টি জানেন ব্যবসায়ীরাও। লালবাগের বাসিন্দা কাজী সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘গণহারে এখানে কেমিক্যালের গোডাউন গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের খামখেয়ালির কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। এ ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেওয়া দরকার।’ তবে কারখানা মালিক ইদ্রিস ব্যাপারী বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা এই ব্যবসায় হাল ধরেছি। ব্যবসা ছাড়া আমরা আর কিছু পারি না। এই ব্যবসার ওপরই আমাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। সুতরাং বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান বা জায়গা না দিয়ে আমাদের ওপর খড়্গহস্ত চালালে তাতে জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, নিমতলীর আগুনের পরে ওই এলাকায় কোনো কারখানা বা গুদামের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। এখন যা চলছে তার সবই অবৈধ। আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সরে যাওয়ার কথা দিয়েও কথা রাখেননি ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসাবে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। আড়াই শতাধিক ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা রয়েছে এলাকায়।

জানা গেছে, রাজধানীর লালবাগ, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীর চর, শ্যামপুর, কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিতেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কারখানা। অবৈধ কারখানার মধ্যে রয়েছে—ব্যাটারি তৈরি, নকল ওষুধ, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, ঝালাই, খেলনা, জুতা-স্যান্ডেলসহ শতাধিক পণ্য তৈরির কারখানা। এসব পণ্য উৎপাদনে বেশির ভাগ কারখানায় ব্যবহার করা হয় দাহ্য কেমিক্যাল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা বাবুল আহমেদ জানান, পুরান ঢাকার বাসাবাড়িতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে জুতার কারখানা। এসব জুতার কারখানার সলিউশনে আগুন লাগলে তা খুব দ্রুত ছড়ায়। তাই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও বাড়িঘরে কারখানা গড়া ঠিক নয়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। কিছু বাড়িতে রাসায়নিক পণ্যের কারখানাও আছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘটনা। এ ঘটনার পরও পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডজনিত প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। সেখানকার কোনো না কোনো রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে কর্মরত শ্রমিকরা দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে আসেন। কেউবা মারাত্মক দগ্ধ হয়ে আসেন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনেকেই মারা যান।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, ‘আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি আমাদের দীর্ঘদিনের। আমরা চাই দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তার জোরালো ভূমিকা রাখুক। জননিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে এসব অবৈধ কারখানা দ্রুত অপসারণ করা এখন সময়ের দাবি।’ রাসায়নিক আমদানি ও গুদামজাত করতে হলে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. শামসুল আলম বলেন, ‘নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ওই এলাকার ঠিকানায় একটি লাইসেন্সও দেওয়া হয়নি। ওই এলাকায় বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স আছে এমন গুদামের সংখ্যা হাতে গোনা। বাকিগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাসায়নিকের গুদাম করার ক্ষেত্রে আমরা শুধু লাইসেন্স দিয়ে থাকি। প্লাস্টিক বা রাবারের কারখানা করার ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। এর পরও অবৈধ কারখানা ও গোডাউনের বিষয়টি আমরা তদারকি করছি। আশা করি আবারও জোরালো অভিযান শুরু করা হবে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চেষ্টা করছি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ নগর গড়ে তুলতে। জানমালের জীবন রক্ষায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা সামনে জোরালো অভিযানের মাধ্যমে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গুদাম ও কারখানার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসব।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিছু রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা বিপজ্জনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিপজ্জনক গুদাম ও কারখানা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। আশা করি আমরা বিষয়টি ব্যবসায়ীদের বোঝাতে পারব। এবার অভিযান শুরু হলে তা শক্তভাবেই করা হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা