kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

স্মৃতির শহর

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই

সঞ্জীব দ্রং, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই

আমি গ্রাম থেকে ঢাকায় আসি ১৯৮৬ সালে। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য আসা। আমার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের সংড়া। ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজে। যখন প্রথম ঢাকায় আসি, তখন এরশাদের আমল। তখন ঢাকায় এত ঘিঞ্জি আর বড় বড় ভবন ছিল না। আজকের মতো এত বড় বড় মার্কেট, শপিং মলও ছিল না। জনসংখ্যাও ছিল তুলনামূলক অনেক কম। রাস্তায় এত গাড়ি ছিল না। এককথায় ঢাকা শহর এখনকার তুলনায় বেশ ফাঁকা ছিল। আমি মনে করি, তখন ঢাকার মানুষ এত ধনী ছিল না। সড়কে সোডিয়াম লাইট ছিল না, টিউবলাইট ছিল। ভিআইপি রোড হয়েছে অনেক পরে। ঢাকার সব সড়কেই রিকশা চলত। কখনো কখনো মহাখালী থেকে রিকশায় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতাম, বেশি সময় লাগত না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অল্প সময়ে ফার্মগেট যাওয়া যেত। তখনো পান্থপথ হয়নি। ছোট আকারে কয়েকটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছিল। চলন্ত সিঁড়িসহ ইস্টার্ন প্লাজা সম্ভবত প্রথম বড় শপিং মল।

সেই সময় আমার মতে, ঢাকা শহর বেশ শান্ত ছিল। শহরজুড়ে বেশ গাছপালা ছিল। এক ধরনের স্নিগ্ধতা ছিল শহরে। তখন মানুষ এত ছোটাছুটি করত না। চলার গতি কম ছিল। এত প্রতিযোগিতা ছিল না। এখন ঢাকায় ব্যাপক যানজট হয়, এমনকি রাত ১২টায়ও যানজট কমে না। আশির দশকে গার্মেন্ট শুরু হলে মানুষ শহরমুখী হতে শুরু করে। তার আগে এত মানুষ ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা গুলিস্তানে, নিউ মার্কেটে স্বচ্ছন্দে হেঁটে যেতাম। সেখানে পুরনো কাপড়চোপড় পাওয়া যেত। মোটকথা, আজ থেকে ৩৩ বছর আগে নিরিবিলি, শান্ত, সুন্দর শহর ছিল ঢাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে আমার ক্লাস শুরু হয়। আমি জগন্নাথ হলে থাকতাম। আগে হলে প্রবেশের সব গেট খোলা থাকত। এখন প্রায় সব গেট বন্ধ থাকে। আর যেটা খোলা থাকে সেখানে দারোয়ান থাকে। জিজ্ঞেস করে প্রবেশ করতে হয়। তখন মহসীন হলের কোনো দেয়াল ছিল না। মাঠে সবাই খেলতে পারত। এফ রহমান হল ছিল টিনের ঘরের। পাশে একটা বস্তি ছিল। আমরা নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতাম। একটু ভালো কাপড়চোপড় কিনতে হলে এলিফ্যান্ট রোডে যেতে হতো। সেখানে টি-শার্ট, জিনসের প্যান্টের বড় বড় দোকান ছিল। আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, সবাই এলিফ্যান্ট রোডে যেতাম কাপড়চোপড় কিনতে। আমাদের সময় মান্না দে, কিশোর কুমার, হেমন্ত, লতা, আশার গান শোনা হতো বেশি। এলিফ্যান্ট রোড থেকে ফিতার ক্যাসেট কিনতাম। একটা ক্যাসেটে ১২টির মতো গান ধরত। ‘গানের ডালি’র খাতা দেখে কাগজের পাতায় পছন্দের গানের তালিকা লিখে আসতাম। রেকর্ড হয়ে গেলে এক সপ্তাহ পরে আনতে যেতাম। নিউ মার্কেটের ভেতরেও একই ব্যবস্থা ছিল। এখন তো ক্যাসেটের দিনগুলো হারিয়ে গেছে।

ঢাকা শহরে সেই সময়ে এত চায়নিজ রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড শপ ছিল না। মগবাজারের দিকে চাংপাই নামের একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ছিল। ধানমণ্ডিতে ম্যাকডোনাল্ডস ছিল, এখন মনে হয় নেই। আমরা আশির দশকের শুরুর দিকে মঞ্চনাটক দেখতাম বেশি। তখন ঢাকা থিয়েটারের অনেক সুন্দর সুন্দর মঞ্চনাটক হতো। কেরামত মঙ্গল, কীর্তনখোলা দেখেছি। হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা, আফজাল—এঁরা অভিনয় করতেন। ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হল ছিল। সেখানে সিনেমা দেখেছি। আমার খুব সুন্দর সুন্দর স্মৃতি আছে ঢাকা শহরকে ঘিরে। তখন মানুষের মধ্যে এত প্রতিযোগিতা ছিল না। ধনী হতেই হবে, টাকা-পয়সা কামাই করব—এমন চিন্তাভাবনা ছিল না।

সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিকেন্দ্রিক প্রচুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। তখন এরশাদের আমল। সামরিক শাসনের প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। রাজপথে মিছিল হতো। আলোচনাসভা, নাটক, পথনাটকসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান হতো। এই সময় তরুণ ছাত্র নেতারা সামরিক সরকারের সমালোচনা করতেন। বক্তৃতায় সমালোচনার ঝড় তুলতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের খাবারের মান ছিল বেশ খারাপ। জগন্নাথ হলের খাবার তুলনামূলক ভালো ছিল। তরুণ ছাত্র নেতারা হলের খাবার নিয়ে প্রতিবাদী বক্তব্য দিতেন। চারদিকে প্রতিবাদী আলোচনা হতো। তখন সন্ধ্যায় টিএসসি ও বিভিন্ন হলের সামনে ব্যাপক আড্ডা জমত। আমি দুটি ডাকসু নির্বাচন দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। জগন্নাথ হলেই ছিল কয়েকটি দল। আমি তিনটি সাংস্কৃতিক দল ও নাট্যদলের সদস্য ছিলাম। একবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন জগন্নাথ হলে। গান গেয়েছিলেন, ‘এই কথাটি মনে রেখ’। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পুরান ঢাকা, সদরঘাটে কখনো কখনো ঘুরতে যেতাম। সেই সময় সে এলাকায় আজকের মতো এত ভিড় ছিল না। বুড়িগঙ্গার পানি এত দূষিত ছিল না। যানজট, ট্রাফিক জ্যাম এই শব্দগুলো আশির দশকেও ছিল না। রাস্তাঘাট সব ফাঁকা ছিল। পান্থপথে ছিল খাল-বিল। এখন সেটা কল্পনাও করা যায় না। আমরা শাহবাগ হয়ে কারওয়ান বাজার দিয়ে মহাখালী যেতাম। গুলিস্তান যেতাম রিকশা করে। তখনকার সময়ে ঢাকায় টেলিফোন আসে। ল্যান্ডলাইন পেতে অনেকে নানা কিছু করত। কারো বাসায় একটা ল্যান্ডফোন থাকলে বিশাল কিছু মনে করত। এর প্রতি অনেকের দুর্বলতা ছিল।

বর্তমান ঢাকার হাজারো নাগরিক সমস্যা। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে প্রথম রাজধানী, দ্বিতীয় রাজধানী, কমার্শিয়াল রাজধানী—এ রকম আছে। আমরা কেন পারছি না? সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকায়, এটা না হয় থাকল। নৌবাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকায় হবে কেন? এটা চট্টগ্রামে সমুদ্রের কাছে থাকাই তো উচিত। সব মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় ঢাকায়, এটি নিয়েও ভাবা যায়। নৌ মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম বা বরিশাল চলে যেতে পারে। অন্যান্য মন্ত্রণালয় যেতে পারে ময়মনসিংহ, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে; এমনকি ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে অনেক মন্ত্রণালয়, অফিস-আদালত স্থানান্তর করা যায়। সব কিছুর কেন্দ্র ঢাকা, এটা কেন? আমার মনে হয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রায় সবার পরিবার-পরিজন ঢাকায় থাকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ঢাকায় নামিদামি স্কুলে পড়াতে হয়। কেন ঢাকার বাইরে ভালোমানের স্কুল নেই? ঢাকায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো বাইরে বড় জায়গা নিয়ে করা যায়। তখন ছাত্র-ছাত্রীদের থাকা-খাওয়ার খরচও কমে। ঢাকাকেন্দ্রিক সব কিছু না করে বিভাগীয় ও জেলা শহরে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি—সব ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। সুযোগ-সুবিধা থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। কলকারখানাগুলো ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। বিদেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ঢাকার প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি। দিনে দিনে এটি একটি বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের এ নিয়ে ভাবতে হবে।

গ্রন্থনা : আরাফাত শাহরিয়ার

 

তখন এরশাদের আমল। সামরিক শাসনের প্রতিবাদে রাজপথে মিছিল হতো


 

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের খাবারের মান ছিল বেশ খারাপ। জগন্নাথ হলের খাবার তুলনামূলক ভালো ছিল। তরুণ ছাত্র নেতারা হলের খাবার নিয়ে প্রতিবাদী বক্তব্য দিতেন


 

সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিকেন্দ্রিক প্রচুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা