kalerkantho

রাজধানীতে থামছে না লেভেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর মিছিল

জাহিদ সাদেক   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজধানীতে থামছে না লেভেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর মিছিল

একটু পরই আসবে ট্রেন। এর পরও পথচারীরা প্রতিবন্ধকের নিচ দিয়ে পার হচ্ছে। এতে যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। ছবিটি মহাখালী লেভেলক্রসিং থেকে তোলা

রাজধানী ঢাকার যে কয়েকটি লেভেলক্রসিং আছে তাতে থামানো যাচ্ছে না দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর মিছিল। প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণ দিচ্ছে সাধারণ পথচারী। এতে যাতায়াতের জন্য নিরাপদ হলেও সাধারণ পথচারীর কাছে রেলপথ যেন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। নানা ব্যবস্থা নিয়েও কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না রেললাইনে অপমৃত্যু, বিশেষ করে রাজধানীতে রেলকেন্দ্রিক মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। এসব দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়; কিন্তু কোনো তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। ফলে রাজধানীর রেললাইন তথা লেভেলক্রসিংগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর লেভেলক্রসিংগুলোতে নেই গেটম্যান, কোথাও নেই সিগন্যাল বাতি, আবার কোথাও সিগন্যাল বাতি থাকলেও তা কাজ করছে না। লেভেলক্রসিং গেটের আশপাশে অবৈধ স্থাপনা থাকায় রেলের সঠিক অবস্থান বুঝতে পারছে না পথচারীরা। অন্যদিকে ক্রসিং সংকেত মানছে না অনেক পথচারী। আবার কোথাও নেই প্রয়োজন অনুসারে ট্রাফিক সার্জেন্ট।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর বেশ কয়েকটি লেভেলক্রসিংয়ে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে খিলক্ষেত, খিলগাঁও, মহাখালী, কারওয়ান বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, জুরাইন ইত্যাদি। এ বছরের ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড ও গাজীপুরের টঙ্গীতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই সঙ্গে তিন ব্যক্তি নিহত হয়। চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও এবং বনানী এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে ও ধাক্কায় এক কন্যাশিশুসহ দুজন মারা যায়। চলতি বছর কমলাপুর রেলস্টেশনে প্ল্যাটফর্ম বদলের সময় ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারান রুবিনা আক্তার নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এ বছরের ৯ জুলাই রাজধানীর খিলগাঁও ও খিলক্ষেতে ট্রেনে কাটা পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত বছর রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে জীবন হারান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন মোল্লা। গত বছর রাজধানীর খিলক্ষেতে জহিরুল ইসলাম, বনানী এলাকায় বুয়েটের শিক্ষার্থী তানভীর তপু ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারান। এভাবে প্রতি মুহূর্তে ট্রেনে কাটা পড়ছে সাধারণ পথচারীরা। 

বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ও ট্রেন দুর্ঘটনায় পাঁচ শতাধিক মৃত্যু হয়েছে। তবে চলতি বছর সারা দেশে প্রথম ছয় মাসেই ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৪৬৬ জন, যার মধ্যে রাজধানীতে মারা গেছে ৭৩ জন। ২০১৭ সালে সারা দেশে ট্রেনে কাটা পড়ে এক হাজার ১০০ লোকের মৃত্যু হয়েছে। জানা যায়, ট্রেনে কাটা পড়ার জন্য কমলাপুর স্টেশন থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা অংশকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে কানে হেডফোন লাগিয়ে এবং অসতর্ক অবস্থায় দ্রুত ক্রসিং পার হতে গিয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার গেণ্ডারিয়া এলাকা থেকে টঙ্গী রেলস্টেশন পর্যন্ত মোট ৩১টি বৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে। প্রতিদিন আন্তনগরের বিভিন্ন রুটের ৫১টি ট্রেন ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে আসে। ট্রেন চলাচলের কারণে সারা দিন ১০২ বার প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ের প্রতিবন্ধকগুলো ফেলা হয়। প্রতিবার গড়ে তিন মিনিট করে লেভেলক্রসিং বন্ধ রাখা হয়। সেই হিসাবে একটি লেভেলক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে প্রতিদিন ৩০৬ মিনিট বা পাঁচ ঘণ্টা ছয় মিনিট যান চলাচল বন্ধ থাকে। কোনো কোনো দিন সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ের বার ফেলে রাখা হয়। এতে একদিকে বাড়ছে তীব্র যানজট, অন্যদিকে পথচারীরা ক্রসিং না মেনেই চলছে পথ। ফলে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে পথচারীরা।

রেলওয়ে আইন থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলের এ আইনটি ১৮৬১ সালের পুরনো। এ আইনের ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী রেললাইনের দুই পাশে ২০ ফুটের মধ্যে নির্দিষ্ট লোক ছাড়া কেউ, এমনকি গবাদি পশুরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। লাইনের দুই পাশের ২০ ফুট এলাকায় সব সময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে। ওই সীমানার ভেতর কাউকে পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার করা যায়।

সরেজমিনে ঢাকার কারওয়ান বাজার লেভেলক্রসিংয়ের দুই পাশে কয়েক শ মানুষকে রেললাইন ধরে হাঁটতে দেখা যায়; কিন্তু ট্রেন আসার ঘণ্টা বাজলেও কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। ট্রেন কয়েক সেকেন্ডের দূরত্বে আসার পর একে একে সবাই পাশে দাঁড়াতে শুরু করে।

এদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, শীতকালে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে। শীতকালে কান ঢাকা থাকায় ট্রেনের হর্ন শুনতে না পারা এবং কুয়াশার জন্য ট্রেনের লাইট দেখতে না পারায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। কানে হেডফোন লাগানো অবস্থায় গত তিন বছরে ৪৩০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আবার এক শ্রেণির মানুষ কখনো জেনে এবং কখনো চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে ‘বাহাদুরি’ ও ‘সেলফি’ তুলতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে তরুণ-তরুণীরা হাঁটতে গিয়েও অহরহ প্রাণ হারাচ্ছে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার কয়েকটি কারণের মধ্যে রয়েছে—রেললাইন ধরে অসতর্কভাবে হাঁটা, কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনের পাশ দিয়ে যাতায়াত করা, তাড়াহুড়া করে লেভেলক্রসিং পার হওয়া এবং চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলা। এ ছাড়া চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা তো আছেই।’ তিনি আরো বলেন, অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, অপরিকল্পিত সংযোগ সড়ক এবং সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি রেলে দুর্ঘটনার পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অব্যবস্থাপনাও দায়ী।

রেল দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনাবিদ মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “রেলওয়ের লেভেলক্রসিং উন্নয়নের জন্য এ মুহূর্তে দুটি প্রজেক্টের কাজ চলছে। এরই মধ্যে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব) লেভেলক্রসিং গেট আধুনিকায়ন’ ও ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে (পশ্চিম) লেভেলক্রসিং গেট আধুনিকায়ন’ নামের দুই বছর মেয়াদের প্রজেক্ট শুরু হয়েছে এবং চলবে আরো এক বছর। এ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ২০০ উন্নতমানের লেভেলক্রসিং নির্মাণ করা হবে। এতে রেল দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে।” রেলওয়ে মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনে হাঁটা ও সেলফি তোলা। এ জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহে সচেতনতার অংশ হিসেবে ট্রেনে ও স্টেশনগুলোতে লিফলেট বিতরণ করা হয়। আরেকটি বিষয় হলো রেললাইনগুলো অবৈধভাবে প্রতিনিয়ত দখল করা হচ্ছে। যদিও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা