kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

ভোটের অপেক্ষায় ঢাকা

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ভোটের অপেক্ষায় ঢাকা

অঙ্কন : মাসুম

মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে—এ রকম প্রতিটি নির্বাচনেই দেখা যাবে ঢাকায় যে দল জিতেছে, সেই দলই সরকার গঠন করেছে। মূলত ভোটের হাওয়া বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু ঢাকায় এখনো জমে ওঠেনি। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে রয়েছে বহুমুখী প্রশ্ন। আদৌ ভোট হবে কি? প্রার্থীর পক্ষে নামলে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে না তো? মাঠটি সমতল? একটি সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিষয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা আছে? আসন্ন একাদশ নির্বাচনকে ঘিরে নানা প্রশ্নের উত্তর-প্রত্যুত্তর নিয়ে লিখেছেন আবুল হাসান রুবেল

 

ঢাকার বাইরে যেখানেই আপনি যান—গ্রামগঞ্জে, মফস্বলে, লোকে আপনার কাছে জানতে চাইবে, ঢাকার হাওয়া কেমন? এই হাওয়া শীত, গ্রীষ্ম, পরিষ্কার না নোংরা সে বিষয়ে নয়; এটা হলো রাজনৈতিক হাওয়া। ভোটের আগে আগে এই জানতে চাওয়া আরো প্রবল হয়। সবাই ঢাকার ভোটের পরিস্থিতি জানতে চায়। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে—এ রকম প্রতিটি নির্বাচনেই দেখা যাবে ঢাকায় যে দল জিতেছে, সেই দলই সরকার গঠন করেছে। কেন এমন হয় সেটা অনুসন্ধানে সিরিয়াস গবেষণা হতে পারে। তবে দৃশ্যত দুটি কারণ এখানে দেখা যায়, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মতামত তৈরি করেন এমন লোকের বসবাস। যাঁরা শুধু ঢাকা নয়, পুরো দেশকেই প্রভাবিত করেন। আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, ঢাকার নগরায়ণ। ঢাকার বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরা কোনো বিশেষ মোড়ল ও মুরব্বিদের সঙ্গে যুক্ত নন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তাঁদের বিশ্বস্ততাও খানিকটা আলগা। ফলে এখানে পরিবর্তনশীল ভোটারের সংখ্যা বেশি। সাধারণভাবে ঢাকার মধ্যবিত্ত নাগরিকদের এলাকার প্রভাবশালীদের খুব পরোয়া না করলেও চলে। তবে এর ব্যতিক্রম ঘটে বস্তিবাসীর ক্ষেত্রে। তাদের নানা ভয়ভীতির মধ্যে রাখা হয় সরকারি দলের পক্ষ থেকে। কিন্তু তারাও সম্ভবত আসন্ন ক্ষমতার একটা আঁচ পায় যে কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, কারা তাদের রক্ষা করতে পারবে অথবা যে দলের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি দেখানো হয় তাকে একটা জবাব দেওয়ার জন্য ভোটকক্ষকে বেছে নেয়।

ঢাকার যেকোনো ভোটার যদি আপনার সঙ্গে মন খুলে কথা বলেন, তাঁর ভোট দেওয়ার হিসাব-নিকাশের নানা তরফের খোঁজখবর আপনি পাবেন। একবারে পাড়া তো হিসাব-নিকাশ, গ্রামের বাড়ি কোথায় তার হিসাব-নিকাশ, দলীয় বা মার্কার হিসাব থেকে একেবারে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ক্ষমতা বিন্যাসের একটা ধারণা তাঁরা রাখেন। আদার ব্যাপারী হলেও জাহাজের খবর তাঁরা রাখেন। কারণ আজকাল আদা যে জাহাজে আমদানি হয়, সেটা তাঁদের অজানা নয়। নির্বাচন নিয়ে ঢাকায় কূটনৈতিকপাড়া যেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে তার প্রতি সজাগ নজর রাখেন তাঁরা। গত কয়েক দিনে মানুষজনের সঙ্গে আলাপ করে এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীকরণ বিষয়ে যেসব জ্ঞান আমি লাভ করেছি, তার সারসংক্ষেপ হলো, ‘ভারত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই খুশি হবে, তবে কারো জন্য সরাসরি কিছু করবে না। আমেরিকা সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, মানে বিএনপি-ঐক্যজোটের পক্ষে, চীন আওয়ামী লীগকেই আবার চায়, ইউরোপিয়ানরা ঐক্যফ্রন্টের দিকে একটু ঝুঁকে আছে ইত্যাদি। এসব সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে পত্রপত্রিকার খবর, বিভিন্ন টেলিভিশনের খবর, টক শো দেখে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বা তার কাছে জ্ঞানী মনে হয় এমন কারো কাছে শুনে। ভেবে দেখলাম, এসব সাধারণ মানুষের বোঝাপড়া একটু সরল হলেও একেবারে ভিত্তিহীন নয়।

তবে ভোটের হাওয়া বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু ঢাকায় এখনো জমে ওঠেনি। মানুষের মধ্যে এখনো ভয় জেঁকে বসে আছে। নানামুখী ভয়। আদৌ ভোট হবে কি না, সব মেরে-কেটে নিয়ে যাবে, সরকারি দল ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর পক্ষে নামলে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে না তো? আর এই ভয়ের যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও আছে। সরকারি দল তাদের ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে এরই মধ্যে বহু জায়গায় প্রচারণা শুরু করেছে, দলীয় মাস্তান বাহিনী মোড়ে মোড়ে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা সাধারণের ভেতর ভীতির সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে বিরোধী প্রার্থীরা তাঁদের মামলা সামলাতেই ব্যস্ত, মনোয়ন বাছাইয়ে বাদ পড়া, সেটা ঠেকাতে দৌড়াদৌড়ি এগুলোতো আছেই। তাঁরা কোথাও প্রচারণা শুরু করলে নির্বাচনী আচরণবিধির ফাঁদে পড়বেন। অর্থাৎ মাঠটা ভীষণই অসমতল। কিন্তু সেই অসমতল মাঠেও খেলোয়াড়রা খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না, রেফারি ঠিকমতো বাঁশি বাজাবেন কি না, নাকি কোনো দলকে একের পর এক পেনাল্টি দিয়ে জিতিয়ে দেবেন—এসব শঙ্কা নির্বাচনী মাঠের দর্শকদের আছে।

হ্যাঁ, দর্শকই বটে! যাদের নির্বাচনে প্রধান খেলোয়াড় হওয়ার কথা ছিল তারা এখন প্রধানত দর্শক। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী হবে, প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী কী করবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে ইত্যাদি আলাপে ভোটারদের ভূমিকা কী হবে—সেটা যেন এখনো আলোচনায় আসার যোগ্যতা লাভ করতে পারেনি। নির্বাচনে জামানত, প্রচার-প্রচারণার ধরন আর টাকার খেলা আগে থেকেই দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে প্রার্থিতার অযোগ্য ঘোষণা করে রেখেছে। বাংলাদেশের সংসদে বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী। কৃষক, শ্রমিকসহ স্বল্প আয়ের প্রতিনিধি কেউই যে সংসদ সদস্য হিসেবে ছিলেন না স্মরণকালের মধ্যে সেটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এ রকমভাবে বেশির ভাগ জনগণকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে যে নির্বাচনী ব্যবস্থা সেটা স্বল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। এই স্বল্পসংখ্যকের ভেতরে যে প্রতিযোগিতা সেটা আস্তে আস্তে একচেটিয়ার রূপ নিয়ে পুরো অর্থনীতি, রাজনীতি সব কিছুকেই গ্রাস করে নিয়েছে। শুধু বাস্তব প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নয়, আইনিভাবেও এ রকম একচেটিয়া যাতে অব্যাহত থাকে তারই ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে ফেলে, তার পরও ঠুনকো অজুহাতে নিবন্ধন না দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে রাখা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। কোনো প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়াতে হলে তাঁকে ১ শতাংশ সমর্থন আগেভাগেই দেখানোর অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এটা যে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য খুব কঠিন কাজ, সেটা এবার বেশির ভাগ স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের মধ্যেই দেখা গেছে। আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটা শুধু প্রার্থীর জন্য কঠিন নয়, তাঁর সমর্থনকারীকেও তা নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। যার সরলার্থ দাঁড়ায় আইনগতভাবেই নতুন চিন্তা, নতুন দল গঠনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জমিদারি বহাল থাকবে আর প্রজারা শুধু রাজাদের ভেতরে কাকে বেছে নেবে তা ঠিক করবে, রাজারাই তাঁদের জমিদার পছন্দ করবেন। এ রকম অবস্থায় রাজারা নিজেদের অধীশ্বর ভাবা শুরু করেন আর জমিদাররা নিজেদের জমিদারিকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রূপান্তর করতে সচেষ্ট হন। বড় দলগুলোতে তাই দেখা যায় পুরনো মুখগুলোকেই ঘুরেফিরে আসতে। এবারের নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা দেখলেও সেটাই দেখা যাবে।

এ রকম পরিস্থিতিতে ভোট শুধু একটা রাজনৈতিক তৎপরতা নয়, বরং বিরাট একটা অর্থনৈতিক তৎপরতাও হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্র মানুষের একটা অংশকে এ সময় কাজে লাগানো হয় দৈনিক ভিত্তিতে পারিশ্রমিকের মাধ্যমে। এতে তাদের একটা খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান ঘটে। এখানেও আছে মধ্যস্বত্বভোগী, যাদের মাধ্যমে এই দরিদ্রদের নিয়োগ দেওয়া হয়। নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্জিত সম্পদের একটা অংশ এভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে আসে। তবে অভিজ্ঞজনদের মতামত ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে বা সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের এ ক্ষেত্রে নিজেদের অর্জিত অর্থ কমই ব্যয় করতে হয়। অর্থটা বরং আসে তাঁদের কাছে অতীতে সুবিধা পেয়েছেন বা ভবিষ্যতে পাবেন এমন লোকদের কাছ থেকে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণের বা তাদের স্বার্থের সত্যিকার প্রতিনিধিদের নির্বাচিত হয়ে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং তা নির্বাচনের আইনি শর্তের ফলে ক্ষীণতর হচ্ছে, তার পরও মানুষ নির্বাচন এলেই উৎসাহী হয়ে ওঠে, কেন নির্বাচন একটা উৎসব হয়ে ওঠে? প্রথমত বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা সংসদ সদস্য হওয়া শুধু আইন প্রণয়নের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটা হাতিয়ার। ফলে প্রত্যেকের জীবনেই তার প্রভাব পড়ে, অনেকের শারীরিক অস্তিত্ব পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের আগ্রহী হতে হয় নির্বাচন বিষয়ে। কিন্তু উৎসব ভাবটা নিশ্চয়ই সেখান থেকে আসে না। আসলে এই একটা দিনেই তারা সত্যিকার নাগরিকত্বের অনুভূতিটা পায়। অনুভব করে তারও কোনো না কোনো ভূমিকা আছে এই রাষ্ট্র-সমাজে।

গত দশম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একতরফা নির্বাচনে জনগণ সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এবার তারা মুখিয়ে আছে সেই অনুভূতি ফিরে পেতে। এই নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন করার মতো দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি। পুলিশ, আমলাতন্ত্র, সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের আজ্ঞাবহ। এ অবস্থায় একটা সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিষয়ে না জনমনে, না রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো আস্থা আছে। আদতে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো ইতিহাস নাই। মাঝে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য কয়েকটি নির্বাচন হলেও বর্তমানে এই ব্যবস্থা সংবিধান সংস্কার করে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তার বদলে তাকে আরো কোনো অধিকতর দক্ষ, গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়নি। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস সত্ত্বেও জনমনে এ বিষয়ে আস্থার সংকট রয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপেও জনগণের ভেতর এমন কোনো আস্থার সৃষ্টি হয়নি; বরং সবাই যেন পরিস্থিতির কোনো জাদুকরী পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। সেটা কখন, কিভাবে আসবে কেউ জানে না। কিন্তু সবাই অপেক্ষায় আছে নির্বাচনের পরিবেশ আসবে, মানুষ উৎসবমুখর হয়ে উঠবে। গরম হয়ে উঠবে চায়ের কাপ, ঝড় উঠবে আলোচনা-সমালোচনার। মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে, ভোট দেবে। মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা এই নির্বাচনে পূরণ হবে কি না সামনের দিনগুলোতে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

 

নির্বাচনে জামানত, প্রচার-প্রচারণার ধরন আর টাকার খেলা আগে থেকেই দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে প্রার্থিতার অযোগ্য করে রেখেছে


 

সাধারণভাবে ঢাকার মধ্যবিত্ত নাগরিকদের এলাকার প্রভাবশালীদের খুব পরোয়া না করলেও চলে। তবে এর ব্যতিক্রম ঘটে বস্তিবাসীর ক্ষেত্রে


বাংলাদেশের সংসদে বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী। কৃষক, শ্রমিকসহ স্বল্প আয়ের প্রতিনিধি কেউই যে স্মরণকালের মধ্যে সংসদ সদস্য হিসেবে ছিলেন না সেটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়...

মন্তব্য