kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

গ্যাসের আগুনে পুড়ছে জীবন : সতর্কতার বিকল্প নেই

রাতিব রিয়ান   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গ্যাসের আগুনে পুড়ছে জীবন : সতর্কতার বিকল্প নেই

আশুলিয়ার জামগড়া মোল্লাবাজারের একটি বাসায় রান্নাঘরের গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়েছে এই মা ও শিশুসহ তাদের পরিবারের পাঁচজন

রাজধানী ঢাকায় গ্যাসের ব্যবহার অবিচ্ছেদ্য এক অনুষঙ্গ। এর ব্যবহার নাগরিক সংসারজীবনে এনে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য; কিন্তু এই দাহ্য বায়বীয় পদার্থটি ব্যবহারে সচেতনতা না থাকায় মুহূর্তে দুর্ঘটনা বয়ে আনে বড় অঘটন। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগে আগে এই দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো কারণে গ্যাসের পাইপ ছিদ্র হলে কিংবা সিলিন্ডারের কোথাও ত্রুটি দেখা দিলে বেরিয়ে আসা গ্যাস শীতল আবহাওয়ায় জমাটবদ্ধ হয়ে থাকে। ফলে বেশির ভাগ গ্যাস উড়ে যায় না। এতে বেরিয়ে আসা গ্যাস রান্নাঘর কিংবা রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। অসাবধানতাবশত আগুন জ্বালালে ঘটে যায় অঘটন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, গত অক্টোবরে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে গ্যাসের আগুনে দগ্ধ ৩৬০ জন ভর্তি হয়েছিলেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভর্তি হয়েছেন অর্ধশত রোগী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দগ্ধ স্বজনদের নিয়ে সাভার থেকে এসেছেন রিপা। তিনি বলেন, ‘তখন সকাল ৭টা। স্বামী ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে গিয়েছে। আমি দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে বিছানায় বসেছিলাম। শ্বশুর-শাশুড়ি পাশের রুমে। শাশুড়ি আমার রুমে আসবেন, এক পা কেবল দিয়েছেন আর স্বামী রুম থেকে বেরোবে—ঠিক এ সময়ে আমি শুধু একটা শব্দ শুনলাম। আর দেখলাম, রান্নাঘর থেকে বড় একটা আগুনের হলকা। সেই আগুনে স্বামী-শাশুড়ি দগ্ধ হয়ে গেল।’ তিনি আরো জানান, গত মঙ্গলবার মারা গেছেন তাঁর স্বামী, তার আগের শনিবার সকালে মারা গেছেন শাশুড়ি আর শুক্রবার রাতে মারা যান তাঁর শ্বশুর। আইসিইউর চিকিৎসক জানান, বাঁ হাত ও শরীরের অন্যান্য অংশে ৩০ শতাংশ পোড়া নিয়ে বেঁচে আছে রিপার দেড় বছরের মেয়ে আয়েশা। গত ২ নভেম্বর ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া মোল্লাবাজারের কবরস্থান রোডে অবস্থিত আব্দুল হামিদের বাসায় ঘটে এ দুর্ঘটনা।

পুরান ঢাকার নবাবগঞ্জের বাসিন্দা শাহানা বেগম (৭০) বলেন, ‘গত সোমবার বিকেল ৪টার দিকে চা বানাতে যাই, চুলা জ্বলে না। ছেলে এসে দাঁড়াল পাশে, চাবি (গ্যাস জ্বালানো) দিল। আগুন লেগে গেল আর কিছু জানি না।’ গ্যাসের আগুনে শাহানার ডান হাত, পাসহ শরীরের অনেকখানি অংশ পুড়ে গেছে, তবে তিনি বিপদমুক্ত। শাহানা বলেন, ‘কয়েক বছর বিদেশ থাকার পর ছেলে নজরুল ইসলাম (৪০) দেশে ফিরেছে। সেদিন ছেলেটা আমারে বাঁচাতে গিয়ে পুইড়া গেল, এখন আমি জানি না আমার ছেলের কী অবস্থা।’ শাহানার মেয়ে নাসিমা বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভাইয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন। বেঁচে থাকবে কি না জানি না!’ চিকিৎসকরা জানান, নজরুল ইসলামের অবস্থা গুরুতর, তিনি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকরা বলেন, ‘এ বছর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং গ্যাসের লিকেজ পাইপ থেকে বিস্ফোরণের ফলে দগ্ধ হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত নভেম্বর মাসেই এখানে ভর্তি হয়েছেন ৩০৭ জন।’ চিকিৎসকরা আরো বলছেন, কঠোর নজরদারি, মনিটরিং ও সচেতনতা ছাড়া এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমার ৪০ বছরের চিকিৎসক জীবনে গ্যাসের আগুনে পুড়ে যাওয়া এত রোগী দেখিনি। বার্ন ইউনিটে যত রোগী এসেছে বেশির ভাগ গ্যাসের আগুনে পোড়া। এগুলো দেখে খারাপ লাগে।’ দুর্ঘটনারোধে করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সরকার, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, বাড়িওয়ালা, চিকিৎসক, গণমাধ্যমকর্মী প্রত্যেককে সোচ্চার হতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে কেন এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। এবং তার প্রতিকারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা এবং প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে, কিভাবে বন্ধ করা যায়—সেখানে জোর দিতে হবে। এর অংশহিসেবে পাড়ায়-মহল্লায়, মসজিদে প্রচারণা চালাতে হবে। মোট কথা সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। অনেক সময় শুনি, গ্যাসের লাইনে অবৈধ পাইপ ছিল—এগুলো সরকার যদি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ না করে তাহলে এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। এতে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো দরকার। আমরা ৫০০ শয্যার হাসপাতাল উদ্বোধন করেছি, কিন্তু সচেতন না হলে আরো শয্যা বাড়িয়েও লাভ হবে না।’

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে ঢাকায় গ্যাস দুর্ঘটনার বেশির ভাগ ঘটে সচেতনতার অভাবে। গ্রাহকরা সিলিন্ডারটি এমন জায়গায় রাখেন যে লিক হয়ে গ্যাস বের হলেও তা ঘরের বাইরে যেতে পারছে না। রান্নাঘরের জানালা খোলা রাখা হয় না। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেন, ‘রান্নাঘরগুলোতে পর্যাপ্ত বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা নেই, এমনকি রান্নাঘরে বড় কোনো জানালাও থাকে না। তাই গ্যাস লিকেজের কারণে বিস্ফোরণ ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাদের দায় আছে। তাঁরা যেন পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রেখে রান্নাঘর নির্মাণ করেন, সে উদ্যোগ নিতে হবে।’

সরকারের নীতিমালার কারণে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার গত ৯ বছরে ৮০০ গুণ বেড়েছে। ব্যবহার বাড়লেও নিরাপত্তার সঠিক সূচক অনুসরণ করা হচ্ছে না। অভিযোগ আছে, রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির সময় গ্যাসলাইন ফুটো হয়ে যায়। গ্যাসের গন্ধ পাওয়ার পর গ্যাস কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হয়েছে; কিন্তু তার পরও কোনো প্রতিকারের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। এর ফলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘পুরনো গ্যাস লাইনগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনারোধে গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও টহল টিম কাজ করছে। প্রতিটি জীবনই মূল্যবান, অকালে কেউ প্রাণ হারাক সেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে সেটি আমাদের কখনো কাম্য নয়।’

মন্তব্য