kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নতুন রাজধানী গড়ে তুলতে হবে

রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অনিমা রায়। রবীন্দ্রনাথের গানে নিবেদিত এই শিল্পী বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের শিক্ষক। এই ঢাকায়ই তাঁর বেড়ে ওঠা। যাপিত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নতুন রাজধানী গড়ে তুলতে হবে

জন্ম ঢাকার কেরানীগঞ্জে। বেড়ে ওঠা মহাখালীতে। বৈবাহিক সূত্রে এখন ধানমণ্ডি থাকেন। পূজা-পার্বণ এলে প্রতিবছরই ছুটে যেতেন গ্রামের বাড়ি কেরানীগঞ্জে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই পরিবারের সবাই মিলে দুই-একবার বাড়ি যাওয়া হতো। সেই সময়টা ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। শৈশবে মহাখালী থেকে কেরানীগঞ্জ যেতে বড়জোর ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা লাগত। জ্যামের কারণে এখন তা দুই ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকেছে।’ শৈশবের ঢাকার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘শৈশবে সহপাঠীদের নিয়ে এবাড়ি-ওবাড়ি চষে বেড়াতাম। কোনো ভয়-ডর ছিল না। আমার স্কুল ছিল মহাখালী মডেল স্কুল, তারপর ভিকারুননিসা। বান্ধবীরা স্কুলে এসে আবার আমাকে নিতে আসত। সেসব দিনের কথা ভাবলে এখনো অনেক মজা লাগে। হেসে উঠি মনের অজান্তে। কারণ এখনকার দিনে তো মা-বাবারা সেসব ভাবতেই পারেন না। আমার বাচ্চাকে গাড়ি দিয়ে স্কুলে পাঠাই, তার পরও টেনশনে থাকি ঠিকমতো পৌঁছাল কি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘তখনকার ঢাকা ছিল অনেক ফাঁকা। এখনকার প্রজন্ম সে ঢাকা কল্পনাই করতে পারবে না। যেকোনো দেশের প্রাণকেন্দ্র সেই দেশের রাজধানী। সে হিসাবে ঢাকাও তাই। এখানে সারা দেশের মানুষ আসে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যাঁরা আসেন, তাঁরা যাওয়ার জন্য আসেন না, যাপনের জন্য আসেন। হয়তো সেটা ঘটে বাধ্য হয়েই। কারণ এখানে বেশির ভাগ মানুষই আসেন কাজের খোঁজে। এর কারণ ঢাকাকেন্দ্রিক আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যা আমরা সমভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারিনি। আর সে ব্যর্থতার খেসারতই দিতে হচ্ছে আমাদের। তবে রাজধানীর বিরাজমান পরিস্থিতির বিচারে আমি বলব ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। একটি নতুন রাজধানী গড়ে তুলতে হবে। বহির্বিশ্বেও অনেক দেশে আজীবন এক জায়গায়ই রাজধানী থাকে না। প্রয়োজনে রাজধানী স্থানান্তর হয়। এতে দেশের সামগ্রিক উন্নতি ঘটে। ক্রমান্বয়ে ঢাকার ওপর যেভাবে চাপ বাড়ছে—আমি মনে করি ঢাকা আর নিতে পারছে না। এই একটি শহরই দিনকে দিন মানুষের আকাঙ্ক্ষার বস্তু হয়ে উঠছে। আর সে কারণেই তো এখন ৩০ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে লাগছে আড়াই ঘণ্টা।’ অনিমা আরো বলেন, ‘আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। আমার বাসা ধানমণ্ডি। এই সামান্য পথ যেতে লেগে যায় ঘণ্টার বেশি সময়। আর কোনো সমাবেশ বা ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলে তো কথাই নেই, দুই-আড়াই ঘণ্টার ধাক্কা। এই অব্যবস্থাপনা থেকে আমাদের বেরোতে হবে।’

আবারও শৈশবের স্মৃতিচারণায় ফিরতে বললে তিনি বলেন, ‘শৈশবের সবচেয়ে যে দিকটা আমি বেশি মিস করি। তা হলো প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের। এখনো মনে মনে তাদের খুঁজি। হয়তো একই শহরে আছি, একই এলাকায় থাকি—কেউ কারো খোঁজ জানি না! সময়ের স্রোতে আমরা ছিটকে পড়েছি। আর একটি ব্যাপার, যেটা অনেকের মতো আমিও দেখেছি। যারা ঢাকার অরিজিন, তারা যেন কেমন পড়াশোনার ব্যাপারে একটু উদাসীন। কারণ বাবার ব্যবসা থাকে। অল্প বয়সে সবাই সেখানে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে আমার একেবারে সেই শৈশবের খেলার সাথিরা কে কোথায় আছে জানি না। মাঝে মাঝে আফসোস লাগে। আমি কি এতই লম্বা দৌড় দিয়েছিলাম যে সবাইকে কোথায় ফেলে এসেছি—খোঁজটা পর্যন্ত নেওয়ার সুযোগ পাইনি!’

পুরান ঢাকার হাজির বিরিয়ানি তাঁর খুব প্রিয়। এখনো কোনো উপলক্ষ হলে অতিথিদের খাওয়ানোর জন্য মূল আকর্ষণ থাকে সেটা। কিংবা বাসায় নিয়ে আসেন। বিউটি বডিংয়ের সঙ্গে পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। এখনো মাঝেমধ্যে যাওয়া হয়। ‘আমি নিউ ঢাকায় বড় হলেও ওল্ড ঢাকার ঐতিহ্য আমাকে সব সময়ই খুব টানত। বাবা ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমরা হিন্দু হলেও ঈদের সময় আমাদের তিন ভাই-বোনের জন্য নতুন জামা থাকত। ঈদের দিন বাসায় ভালো রান্না হতো। আমরা আসলে কখনো হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ বুঝতে পারিনি। মা-বাবারা তা বুঝতে দিতেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব পাল্টে যাচ্ছে। প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আত্মিক বন্ধনটা ক্রমেই কমে আসছে। সেদিকটায় আমাদের বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা