kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মানুষ গড়ার কারিগর রেহেনা

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মানুষ গড়ার কারিগর রেহেনা

রেহেনা পারভীন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে হতে পারতেন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তা না করে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতার পেশা। ছোট থেকেই শিক্ষানুরাগী। ছাত্রাবস্থায় শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতেন। সবাই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে, সে লক্ষ্যে গড়ে তোলেন ‘চ্যালেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’; কিন্তু পথটা মসৃণ ছিল না। পেরোতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই। তাঁর সেই পথ চলার গল্প শুনেছেন নূরুল হক বাবুল

রেহেনা পারভীনের জন্ম ঢাকার মিরপুরে। নগরের বিত্ত-বৈভবের জীবনের পাশাপাশি বস্তির দরিদ্র শিশু ও পথশিশুদের দেখে বড় হয়েছেন মিরপুরের ছোট্ট মেয়ে রেহেনা। শিক্ষা ও তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত শিশুদের মানবেতর জীবন তাঁকে ব্যথিত করত। ১৯৯৪ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর মন স্থির করলেন তাদের পাশে দাঁড়াবেন। সে ভাবনা থেকেই একনাগাড়ে তিন মাস সময় দিলেন অধিকারবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার পেছনে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের দেখে, তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমার খুব খারাপ লাগত। তাই ছাত্রাবস্থায় ন্যূনতম অক্ষর জ্ঞান দিতে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। আর এসব গুণ মূলত বলতে পারেন আমার পারিবারিক আবহাওয়া থেকেই পাওয়া। আমার মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে দেখতাম, তাঁরা নিজেরাই কিছু না কিছু করছেন। সাধ্যমতো অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, যেকোনো কাজে অন্যের পাশে দাঁড়ানো, আত্মীয়-প্রতিবেশীদের খোঁজখবর রাখা—এটা আমাকেও খুব টানত। এসব শিক্ষা আমি আমার পরিবার থেকেই পেয়েছি।’

শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড় কোনো পদে চাকরি না করে শিক্ষক হলেন কেন জানতেই চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করি। এরপর সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স করেছি ২০০২ সালে। অতীশ দীপংকর থেকে বিএড ও এমএড করেছি ২০১২ সালে। আমার শিক্ষাজীবন শেষ করেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। বিয়ের পর চলে এলাম স্বামীর বাড়ি খিলবাড়িরটেকে। বাড়ির পাশেই ‘চ্যালেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’ নামে একটি স্কুল ছিল। সেটা সবেমাত্র গড়ে উঠেছে। সেই স্কুলেই শিক্ষিকা হিসেবে স্বল্প বেতনে চাকরি শুরু করলাম। তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন সৈকত কর্মকার। সে সময় এই এলাকার রাস্তা ছিল আধা কাঁচা-পাকা। স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই অপ্রতুল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী খুঁজে আনতাম। আমি মনে করি জীবন, পরিবার, সমাজকে আলোকিত করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই। অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকতার ওপর দুর্বলতা তো ছিলই। বলা যায়, সে জন্যই অন্য কোনো বিশেষ চাকরির খোঁজ না করে আমি শিক্ষকতা পেশাকেই বেছে নিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয় শিশুদের লেখাপড়া শেখানো যেন কাদামাটি দিয়ে মনের মতো করে পুতুল বানানোর কাজ। সারা জীবন কোমলমতি শিশুদের বুকে শিক্ষার আলো জ্বালাতে চেয়েছি। এই পেশাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই পেশায় পুরো স্বাধীনতা আছে, তবে সব কিছু ম্যানেজ করেই করতে হয় এবং আমি সেটি করতে পেরেছি।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক স্কুলটি পরিচালনা করতে ব্যর্থ হলে আমার কাছে অর্পণ করেন। তখন স্কুলটি লোকসানের মুখে পড়েছিল। আমি সাহস করে স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করি। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। স্কুলের উন্নয়নে বলা যায় আদাজল খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। টানা তিন-চার বছর অনেক পরিশ্রম করেছি। আজ সে পরিশ্রমের ফলও পাচ্ছি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের থেকে অনেক বেড়েছে। আগে পড়ানো হতো ইনফ্যান্ট নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এখন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। তুলনামূলক বার্ষিক পরীক্ষার ফলও ভালো হচ্ছে। এতে খুশি হচ্ছেন অভিভাবকরাও। আর এই অগ্রগতিতে সবচেয়ে খুশি আমি। আসলে পথ যত কণ্টকাকীর্ণই হোক না কেন, একাগ্রতা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দৃঢ়তা থাকলে সফলতা আসবেই।’’

আর কী কী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন জানতে চাইলে, রেহেনা বলেন, ‘‘আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল স্কুলটি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা; কিন্তু ২০১২ সালের জুন মাসে বাড়ির মালিক যখন বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেন; তখন আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। কোনো উপায়ান্তর না দেখে বাড়ির মালিকের কাছে অনেক অনুরোধ করে ছয় মাসের সময় চেয়ে নিলাম। শুরু হলো স্কুলের নতুন ঠিকানার খোঁজ। অনেক কষ্টে-সৃষ্টে বর্তমান ১০৯১ খিলবাড়িরটেকে এই স্কুলটি গড়ে তুলি। এটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন জমি নেওয়া, স্কুলের অবকাঠামো গড়ে তোলা। যথাযথ সম্মানী দিয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়েছে। এককথায় সম্পূর্ণ খোলনলচে বদলে নিতে হয়েছে। সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো তুলনামূলক এলাকাটি গরিব হওয়ায় এখানকার অনেকে সচেতনতার অভাবে শিক্ষার মান বোঝে না, খোঁজে বেতন কম কোথায়। তারা সন্তানদের স্কুলে দেওয়ার চাইতে কাজে দিতে আগ্রহী বেশি। কারণ অসচ্ছল পরিবারে টাকার জোগান পেলে তাদের আর্থিক সচ্ছলতা আসে। অন্যদিকে পড়ালেখা করানো মানে বাড়তি খরচ! তবে সচ্ছল মানুষরা অনেক আন্তরিক, শিক্ষানুরাগী। আসলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের একটি স্লোগান আছে—‘আগে শিক্ষা পরে কাজ, গড়ে তোল শিক্ষিত সমাজ।’ এ কারণেই আমরা প্রতিভা বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’

পিটি করছে চ্যালেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা

আমার স্কুলে বিগত দিনে পিএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। আমার এই পথ চলায় সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দিয়েছেন ওয়ার্ড ভিশন এনজিওর অর্চনা ডি রোজারিও। তিনি আমার স্কুলে অধ্যয়নরত কিছু গরিব শিক্ষার্থীকে সচেতনতার জন্য প্রশিক্ষণ দিতেন। ওদের জন্য তিনি প্রতিবছর বই-খাতা, রংতুলি, পেনসিলসহ শিক্ষার নানা উপকরণ উপহার দেন। এ ছাড়া আমাদের ওয়ার্ড মেম্বার মাহমুদা আক্তারের অপার সহযোগিতায় শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের সচেতন কর্মশালার মাধ্যমে বাল্যবিয়ে প্রচলন বন্ধসহ যৌতুক প্রথা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হারও কমে গেছে। বর্তমানে আমার বিদ্যালয়ে ১৬ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ২৪০ জন। ২০০৯ সাল থেকে পথশিশুদের জন্য শিক্ষা খরচ ফ্রি করা হয়েছে। এবং ২০১০ সাল থেকে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ শেখার জন্য ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আরবি শেখানোর জন্য রাখা হয়েছে মৌলভি শিক্ষক এবং ছবি আঁকা শেখানোর জন্য রয়েছে অংকন শিক্ষক। আমার আরেকজন সহকর্মী ও অনুপ্রেরণাদায়ক সুহৃদ হলেন কিন্ডারগার্টেন ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সোলেমান হোসেন। তিনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘রেহেনা, আপনি এগিয়ে যান, সফলতা ধরা দেবেই।’ তিনি প্রতিবছর ‘কিন্ডারগার্টেন ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানে সহায়তা করেন। এতে এলাকায় স্কুলের গ্রহণযোগ্যতা আরো বেড়েছে এবং নতুন নতুন শিক্ষার্থীর আগমন ঘটছে। পরিবার ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বামী এনামুল হক মিঠু আগে চাকরি করতেন; বর্তমানে ব্যবসা করেন। আমার দুই সন্তান—এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েটির নাম মিহিকা আর ছেলেটির নাম মিকদাত। ওরা দুজনেই মানারত স্কুলে অধ্যয়নরত। আর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বলতে—নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখি। এই স্কুল একদিন কলেজে পরিণত হবে। যেখানে আরো অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিক্ষার আলোয় জেগে ওঠা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখবে আমার প্রতিষ্ঠানও।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা