kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শান্তির নীড়...

মারুফা মিতু   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শান্তির নীড়...

মডেল : তানজিহা, ইনিসি, অতশী ও সুমন ছবি : মঞ্জুরুল আলম

মোরা সুখের লাগি বাঁধি ঘর, সুখ মিলে না। গানের এই কথার মতো আসলেই কি সুখ মেলে না? এই যে আমাদের এত ব্যস্ততা, এত নাগরিক দৌড়ঝাঁপ, তা তো শুধু দুদণ্ড শান্তির জন্যই। কিন্তু আসলেই কি এই শান্তি-প্রশান্তির জীবন ধরা দেয় আমাদের? না রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার সাজানো-গোছানো ঘরটায় বিরাজ করে? সর্বদা অশান্তির বীজ বুনে, অশান্তি বিরাজ করে সংসার সাগরের প্রতিটি সময় পার করতে হয়। এত এত ঝামেলা। এত এত ঝক্কি, এর মধ্যেই সংসারজীবন গুছিয়ে নেন অনেকেই। কেউ পারেন। কেউবা পরিস্থিতির কাছে হেরে যান। সবার আর সুখের ঘর করা হয়ে ওঠে না; কিন্তু যদি আপনি মেনে নেন যে সম্পর্ক হলো একটি চারাগাছ। তাহলে বৃক্ষের প্রতীক্ষায় সেই চারাগাছের যত্ন তো নিয়মিত আপনাকে করতেই হবে।

সংসারজীবনে সুখী থাকাটা নির্ভর করবে শুধু দুজনের ভালো বোঝাপড়ার ওপর। দাম্পত্যজীবন সুখী রাখতে চাইলে দুজন দুজনের কাজকে সম্মান করুন এবং কাজে সাহায্য করুন। দুজনে চাকরিজীবী হলে দুজনে মিলে রান্না ও ঘরের অন্যান্য কাজ করুন। যেমন ধরুন অফিস থেকে আপনারা একসঙ্গেই বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফিরেই স্বামী পেপারটি নিয়ে টিভির সামনে বসে যান। সচরাচর এমন দৃশ্য দেখেই আমরা অভ্যস্ত; কিন্তু দিন বদলের মেলায় যদি টিভিকে আপন করে না নিয়ে চুলায় চায়ের পানিটা আপনিই চড়িয়ে দিলেন। দুজনের জন্য দুই কাপ চা নিয়ে যদি একসঙ্গে একটু টিভিটা দেখলেন, ক্ষতি কি তাতে? চায়ের সঙ্গে সারা দিনের গল্পটাও হয়ে গেল। খুব কিন্তু বেশি কিছু করতে হলো না আপনাকে। বাচ্চাদের গোসল-খাওয়ানো শুধু স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে আপনিও পালন করতে পারেন। আবার সন্ধ্যায় চুলায় রান্না বসিয়ে যখন সন্তানদের পড়াশোনা দেখার দায়িত্বটা আপনার স্ত্রী নিজ হাতেই রাখেন। ঠিক সেই সময়ে কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনা দেখিয়ে দেওয়ার কাজটা আপনিই করতে পারেন। এবার আসি স্ত্রীদের বিষয়ে। অর্থনৈতিক দিকটা শুধু স্বামীর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে স্ত্রী হিসেবে নিজে কিছুটা সাহায্য করতে পারেন। সংসারের টুকিটাকি কেনাকাটা, সন্তানদের স্কুলের বেতন কিংবা শখের জিনিসগুলো স্ত্রীই কিনে দিতে পারেন। বোঝাপড়াটা চমৎকার থাকলে কোনো ঝামেলা আর ঝড়ের মতো এসে উপড়ে ফেলতে পারে না সংসারের শিকড়।

সুখী সংসারজীবনের মূল মন্ত্র হচ্ছে স্বচ্ছতা। স্বচ্ছতা ছাড়া সংসারজীবনে সুখী হওয়া যায় না। স্বামী-স্ত্রী নিজেদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা রাখুন। স্বচ্ছতার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া বজায় রাখুন। কোনো ভুল কাজ করে ফেললে তা সঙ্গীর কাছে শেয়ার করুন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করুন। যত ব্যস্তই থাকুন না কেন, নিয়মিত ফোনে, ফেসবুকে কিংবা টুইটারে প্রিয়জনের খোঁজখবর রাখুন। বিয়ের বয়স কয়েক বছর হয়ে গেছে বলে সম্পর্ক একঘেয়ে হতে দেবেন না। শত ব্যস্ততা থাকলেও নিজেদের বিয়েবার্ষিকী পালন করুন এবং সঙ্গীর জন্মদিনে শুভেচ্ছা বার্তা ও উপহার দিন। সংসারের অন্যান্য কাজ রুটিনমাফিক করুন। সংসারজীবনে সুখী থাকতে চাইলে, সময় পেলে দুজনে মিলে সুখের স্মৃতিচারণা করুন। আর বিষাদের স্মৃতি যত সম্ভব ভুলে থাকার চেষ্টা করুন। বিয়ের পর দুজনে মিলে যেসব জায়গায় ঘুরতে যেতেন, ছুটির দিনে সঙ্গীকে নিয়ে সেসব পুরনো কোনো স্মৃতিময় জায়গায় ঘুরে আসতে পারেন। দেখবেন হাসি-আনন্দে জীবনটা ভরে উঠবে। কিংবা সঙ্গীর প্রিয় কোনো গান শুনতে পারেন, সিনেমা দেখতে পারেন।

দাম্পত্যজীবনে ঝগড়া হওয়া স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু মনে রাখবেন, কেউ ফুলের আঘাতে মূর্ছা যান আবার কেউ কাঁটার আঘাত হাসিমুখে সহ্য করতে পারেন। আপনার সঙ্গীর সহ্য ক্ষমতা বুঝে তাকে শাসন-বারণ করুন। নইলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সঙ্গী কোনো ভুল করলে ক্ষমা করুন। তাকে শুধরে নিতে সহায়তা করুন। তাহলে সংসার ফুলে ফুলে ভরে উঠবে।

নিজেদের মধ্যে কোনো কারণে ভুল বোঝাবুঝি হলে খোলামেলা আলোচনা করুন। খোলামেলা আলোচনা নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করে, সম্পর্ক মজবুত করে। মানিয়ে চলা শুধু দাম্পত্য সম্পর্ক নয়, সব সম্পর্কই সহজ, সুন্দর করে। স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে বলব, মেনে নেওয়াটা যেন একতরফা না হয়। আজকের শিক্ষিত ও কর্মজীবী মেয়েদের জন্য দাম্পত্যজীবন একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এখানে তাকে একই সঙ্গে সুদক্ষ অফিসকর্মী, স্ত্রী-বন্ধু, সুচারু গৃহিণী, মা ইত্যাদি ভূমিকা পালন করতে হয়।

একটু মনে করে দেখুন তো, ছোটবেলায় একটু চোখের আড়াল হলেই মা-বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য মনটা আকুল হয়ে উঠত। আজ আপনার মা-বাবা আপনার জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষায় থাকেন। আপনি তা বুঝতেও পারেন না। যে মা দুই হাতে দশভুজা হয়ে আপনাদের কয়েক ভাই-বোনকে যত্নের সঙ্গে প্রতিপালন করেন, সেই মাকে এক বেলা দেখতে যাওয়ারও সময় হয় না অনেকের। মনে রাখবেন, আপনার একটু সময় দেওয়া, একটু কথা বলা, একটু বুকে টেনে নেওয়া তাঁদের জীবনকে আনন্দময় করে তুলবে। তাঁদের আরো বেশিদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা করবে।

নাগরিক দৌড়ের এই সময়ে অভিভাবকরা অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন; কিন্তু শুধু মানসিকভাবে পরিবারের সঙ্গে নেই, পরিবারকে সঙ্গ দেন না, সন্তানদের সময় ও সঠিক দিকনির্দেশনা দেন না, তাঁদের কথাই বলা হয়েছে। যেসব অভিভাবক বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি, মারধর, স্বামী-স্ত্রীতে অশান্তি, সন্দেহ করেন, সেসব পরিবারের শিশুদের কথা ভাবুন। এসব পরিবারের শিশুরা আক্রমণাত্মক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে যায়। হিংস্র আক্রমণাত্মক ভাষা শিশুর মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ ধরনের পরিবারের সন্তান বেশি বখে যায়। আবার একক পরিবারের মা-বাবা উভয়ে চাকরি করেন, এ ধরনের পরিবারের সন্তান নিঃসঙ্গতায় ভোগে। মা-বাবার বা আপনজনের সঙ্গহীনতায় তারা একটু একরোখা জেদি হয়ে ওঠে।

একজন মানুষ যত বড় হোক না কেন, তার মূল গ্রথিত থাকে পরিবারেই। পরিবারের সুখ-দুঃখ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। পরিবারের সুখই হচ্ছে প্রকৃত সুখ। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি, বিশেষ করে শিশুদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। তাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাতে একদিকে যেমন আপনি ভালো থাকবেন, তেমনি দেশটাও সুনাগরিকে ভরে যাবে। একজন সুনাগরিকই পারে দেশটাকে বদলে দিতে। আর তার শুরুই হয় পরিবারের শান্তি থেকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা