kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভয়ংকর ম্যানহোল ফাঁদ!

রাতিব রিয়ান   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভয়ংকর ম্যানহোল ফাঁদ!

দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা মিলে রাজধানীর গভীর-অগভীর ড্রেনে ম্যানহোলের সংখ্যা ৯০ হাজার। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ম্যানহোল ব্যস্ততম সড়কজুড়ে। কোনো ম্যানহোলের ঢাকনা আছে, আবার কোনোটির নেই। যেগুলোর ঢাকনা আছে তার বেশির ভাগ ম্যানহোল উঁচু হওয়ায় ঢাকনা পড়ে থাকে ম্যানহোলের বেশ নিচে। ফলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। রাজধানীতে ঢাকা ওয়াসার গভীর ড্রেন রয়েছে ৩৪৬ কিলোমিটার। এসব ড্রেনে ম্যানহোল রয়েছে সাড়ে আট হাজার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গভীর-অগভীর ড্রেনের পরিমাণ দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এসব ড্রেনের ওপর স্লাব সিস্টেমের ম্যানহোল তৈরি করেছে সংস্থাটি। এর বাইরে প্রায় ৫০০ সাধারণ আকৃতির ম্যানহোল রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের। এ সংস্থার দুই ধরনের মিলে ম্যানহোল প্রায় ৫০ হাজার। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গভীর ও অগভীর ড্রেন রয়েছে প্রায় এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার। উত্তর সিটি করপোরেশনের আদলে এসব ড্রেনের ওপর স্লাব সিস্টেমের প্রায় ৪০ হাজার ম্যানহোলের পাশাপাশি রয়েছে পাঁচ শতাধিক স্বাভাবিক আকৃতির ম্যানহোল। সব মিলিয়ে দুই সিটি করপোরেশনে ম্যানহোলের সংখ্যা ৯০ হাজার।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়ও কিছু ম্যানহোল তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন কম্পানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসব তৈরি করেছে। এসব ম্যানহোলের তদারকি কেউই করে না। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এসব ম্যানহোলের ঢাকনা সড়কের সমান সমতল না হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। কোথাও সড়কের সমতল আবার কোথাও অনেক নিচু। ফলে সড়কগুলো হয়ে পড়ছে অনিরাপদ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর ধানমণ্ডি থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, সাতমসজিদ রোড, শিয়া মসজিদ, তাজমহল রোড, মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটি এলাকায় ঢাকনাযুক্ত অনেক ম্যানহোল রয়েছে, যেগুলো সড়কের সমতলের নয়। এ ছাড়া নতুন বাজার, বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল হয়ে মালিবাগ পর্যন্ত সড়কে শতাধিক ম্যানহোল রয়েছে, যেগুলোর ঢাকনার অবস্থা একই রকম। একই অবস্থা বাসাবো থেকে গোড়ান পর্যন্ত সড়কে। এই সড়কটিতে অন্তত দুই শ ম্যানহোল রয়েছে। পান্থপথ ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে স্কয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কেও রয়েছে অন্তত তিনটি দুর্ঘটনাপ্রবণ ম্যানহোল। এফডিসি মোড়, কারওয়ান বাজার এলাকায়ও রয়েছে দুর্ঘটনাপ্রবণ ম্যানহোল।

ঢাকনা নেই এমন ম্যানহোলও আছে রাজধানীতে। একই অবস্থা ধানমণ্ডির বেশ কিছু রাস্তায়। এখানে সিটি করপোরেশনের ৩৪টি ম্যানহোলের মধ্যে ঢাকনা নেই ১২টির। এ ছাড়া ওয়াসা ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার উন্নয়নকাজের পর ঢাকনাবিহীন অবস্থায় আছে আরো অন্তত ১৫টি ম্যানহোল। রাজধানীর উত্তরা, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কেও একই অবস্থা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাবে, বর্তমানে তাদের এবং ওয়াসার মিলিয়ে প্রায় ১০০টি ম্যানহোল আছে ঢাকনাবিহীন অবস্থায়। যানবাহন চালকরা জানান, নগরীর সড়কগুলোতে প্রায় সব সময়ই তো যানজট লেগে থাকে। মাঝখানে ফাঁকা না রেখে একটি গাড়ি আরেকটির সঙ্গে চলাচল করে। ফলে এর ফাঁকফোকরে ম্যানহোল থাকলে তা অনেক সময় দেখা যায় না। বড় চাকার গাড়িগুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে বাঁচলেও দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

বছর বছর উন্নয়ন করার কারণে সড়কগুলো ম্যানহোলের ঢাকনা থেকে অন্তত দুই-তিন ফুট উঁচু হয়ে গেছে। এর ফলে ঢাকনার ওপরের অংশগুলো বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। সড়কে চলাচলের সময় অসতর্ক অবস্থায় এসব গর্তে পড়ে যানবাহনগুলো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে। ঢাকার বেসরকারি এক রেডিও চ্যানেলে কাজ করেন সাংবাদিক ফিরোজ মিজান। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মহাখালী যাওয়ার পথে এক ম্যানহোলে তাঁর মোটরসাইকেলের চাকা আটকে যায়। এতে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে তাঁর হাত ভেঙে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মতো অনেকেই ম্যানহোলে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এটা খুবই বিপজ্জনক। কোনো ম্যানহোল নির্মাণ করার সময় সিটি করপোরেশন বা ওয়াসার উচিত সমতল অনুযায়ী ম্যানহোল নির্মাণ করা।’

কয়েক দিন আগে রাজধানীর শিয়া মসজিদ এলাকায় ম্যানহোলের গর্তে চাকা আটকে দুর্ঘটনায় পড়েন সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক চালক। চলতি পথে অটোরিকশা হঠাৎ আটকে যাওয়ায় তিনি কোমরে আঘাত পান। পরে তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসব দুর্ঘটনার বিষয়ে অটোরিকশাচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘যেসব এলাকার রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে, সেগুলোর ম্যানহোলের অবস্থা যদি এ রকম হয়, তাহলে তা চিন্তার বিষয়। ম্যানহোলগুলো অনিরাপদ থাকলে দুর্ঘটনা তো ঘটবেই।’

মহাখালীর নাখালপাড়ার বাসিন্দা ও সিএনজিচালক ইউসুফ আলী বলেন, ‘গত মাসে বড় একটি বাসের পেছনে পেছনে সিএনজি চালাচ্ছি। বাসটি তার বড় চাকা দিয়ে ম্যানহোল পার হওয়ার পর আমি পড়লাম বিপদে। সিএনজির চাকা ছোট। হঠাৎ করেই ম্যানহোলের গর্তে চাকা আটকে গেল। ব্রেক করে গাড়ি থামিয়ে দিলাম। পেছন থেকে আরেকটা সিএনজি এসে ধাক্কা দিল। ম্যানহোলের কারণে এ রকম ছোটখাটো দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে।’

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা বলেন, ‘উন্নয়নকাজ করায় বছর বছর রাস্তাগুলো উঁচু হচ্ছে; কিন্তু ম্যানহোলগুলো উঁচু হচ্ছে না। সে কারণে ম্যানহোলের ওপর গর্তের মতো সৃষ্টি হয়। এ রকম বেশ কিছু ম্যানহোলের তালিকা আমরা করেছি। সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বলেন, ‘বেশির ভাগ ম্যানহোল ঢাকা ওয়াসার। সিটি করপোরেশনের অধীনে যে ম্যানহোলগুলো আছে, সেগুলো ঠিকঠাক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান জানান, ম্যানহোলের মালিকানা সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার। ম্যানহোলের অব্যবস্থাপনার সঙ্গে সড়ক খুঁড়ে নালায় পরিণত করার কাজটি তারা বেশি করে থাকে। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও ম্যানহোল ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় চরমভাবে উদাসীন। এতে নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি শিশু জিহাদ এবং একই বছরের ৮ ডিসেম্বর নীরবের মৃত্যুর পর হাইকোর্ট ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা না রাখার বিষয়ে সেবা সংস্থাগুলোর প্রতি সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেন। এর পরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা