kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

ঢাকার খোঁজে

নাম দিয়ে যায় চেনা

আবুল হাসান রুবেল   

৩০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নাম দিয়ে যায় চেনা

ব্রিটিশ আমলে চকবাজার

শেকসপিয়ার বলেছেন, ‘নামে কিছু আসে যায় না, গোলাপকে যে নামেই ডাকো না কেন, সে গন্ধ বিতরণ করবেই।’ তাঁর কথা হয়তো সত্য, কাজে হয়তো খুব হেরফের হয় না নামের বদলে, কিন্তু নামের ভেতরে পরিচয় লুকিয়ে থাকে। কখনো কখনো সামাজিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির হদিসও পাওয়া যায় নামের ভেতর দিয়ে। নামের সুলুকসন্ধান করতে গিয়ে অনেক সময় বেরিয়ে আসে ইতিহাসের অজানা বা হারিয়ে যাওয়া কোনো দিক। আমাদের ঢাকা শহর ও তার বিভিন্ন এলাকার নামেও এ রকম অসংখ্য ইতিহাসের সূত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে ঢাকার ইতিহাসের বিভিন্ন দিক বা তার প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে একটা পাঠ তৈরি করা যায়। যদিও এই রচনার উদ্দেশ্য সেটি নয়, বরং এর লক্ষ্য পাঠকের ভেতরে খানিকটা কৌতূহল জাগিয়ে তোলা মাত্র।

প্রথমেই আসা যাক ঢাকা নামটা এলো কিভাবে সে বিষয়ে। ঢাকার নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। কথিত আছে যে মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ তাঁর নৌবহর নিয়ে ঢাকায় এসে দেখেন একদল পূজারি ঢাকঢোল সহকারে পূজা-অর্চনা করছেন। তখন ঢাকিদের একত্রিত করে একসঙ্গে সবাইকে ঢাক বাজানোর আদেশ দেন ইসলাম খাঁ। শুরু হলো সমন্বিত বৃন্দবাদ্য। সুবেদারের অনুচররা উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে গিয়ে যত দূর পর্যন্ত এই ঢাকের আওয়াজ শুনতে পেলেন তত দূর পর্যন্তই হলো মোগলদের বাংলা সুবার নতুন রাজধানী ঢাকা।

আবার অনেক ঐতিহাসিকের মতে, রাজা বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৯ খ্রি.) ঢাকেশ্বরী মন্দির স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে বাংলার সুবেদারের দায়িত্বে থাকাকালে মান সিংহ (১৫৯৪-১৬০৬ খ্রি.) সংস্কার করেন। এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম থেকে ঢাকা নামের উত্পত্তি।

ঢাকার নামকরণসংক্রান্ত আরো কিছু উেসর কথা জানা যায়, সেগুলো হলো—

১. একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাকগাছ (বুটি ফুডোসা) ছিল, সেই ঢাকগাছ থেকেই ঢাকা নামের উত্পত্তি।

২. ‘ঢাকাভাষা’ নামে একটি প্রাকৃত ভাষা এখানে প্রচলিত ছিল, তা থেকেই ঢাকা নামটি এসেছে।

৩. রাজতরঙ্গিণী’তে ঢাক্কা শব্দটি ‘পর্যবেক্ষণকেন্দ্র’ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে অথবা এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লিখিত সমুদ্র গুপ্তের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ডবাকই হলো ঢাকা।

আমার ব্যক্তিগতভাবে ঢাকগাছ থেকে ঢাকা নামের উত্পত্তি ভাবতেই বেশি ভালো লাগে, কিন্তু ভালো লাগলেই তো হবে না, তার জন্য ঐতিহাসিক প্রমাণ চাই। তবে কোনোটাই যেহেতু অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয় কাজেই পছন্দের স্বাধীনতাটা আছে। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের নামকরণের ভেতরে আছে বিভিন্ন সময়ের ছাপ, প্রাকৃতিক অবস্থা, জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি কিংবা শাসকদের পরিচয়। অনেক নাম প্রথমে দেখে যেমনটা মনে হয়, তার ইতিহাস ঘাটলে হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু পাওয়া যাবে। নামগুলোর সঙ্গে টোলা বা টুলী, বাগ বা বাগান বারবার এসেছে। এখানে বিস্তারিত লেখার সুযোগ নেই, কয়েকটি কৌতূহলোদ্দীপক নামের উল্লেখ করছি।

শুরু করা যাক যে এলাকায় বসবাস করি সেই হাতিরপুল দিয়ে। এককালে আমাদের এই আধুনিক নগরী ঢাকায় প্রচুর হাতির আনাগোনা ছিল। তবে তাদের মাঠে চরা বা গোসল করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না। ১৮৬৪ সালে দুই কাউন্সিল গঠনের পূর্বে লেফটেন্যান্ট গভর্নর ঢাকা দর্শন করতে আসেন। ঢাকা কমিটির সদস্যদের অভিযোগ অনুযায়ী সে সময় হাতির পাল ঢাকায় ভয়ানক উপদ্রব করত। সে জন্য হাতিদের জন্য কিছু জায়গা ঠিক করে দেওয়া হলো। পিলখানা থেকে রমনা পর্যন্ত হাতিদের চলার পথটি কালের বিবর্তনে এলিফ্যান্ট রোড নামে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজ শাসনামলে প্রচুর হাতি ব্যবহার করা হতো। বন্য হাতিকে পোষ মানানো হতো যেসব জায়গায় তাকে বলা হতো পিলখানা। বর্তমান ‘পিলখানা’ ছিল সর্ববৃহৎ। পিলখানা থেকে হাতিগুলোকে নিয়ে যাওয়া হতো হাতির ঝিলে গোসল করাতে, তারপর রমনা পার্কে রোদ পোহাত তারা, সন্ধ্যার আগেই পিলখানায় চলে আসত। যাতায়াতের রাস্তাটির নাম ‘এলিফ্যান্ট রোড’—পথের মধ্যে ছোট্ট একটি কাঠের পুল ছিল দুয়ে মিলে সেই স্থানটির নামকরণ হলো ‘হাতিরপুল’। হাতিরপুল নামের সঙ্গে হাতির যেমন প্রত্যক্ষ সংযোগ পাওয়া গেল, কিন্তু আলুর বাজারের সঙ্গে আলুর তেমন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংযোগই পাওয়া যায় না। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে, জাফর খান ঢাকায় বাস করতে আসেন। তিনি লালবাগ এলাকায় বসবাস করতেন। এই এলাকাটি তাঁর মালিকানাধীন ছিল যা আজ ‘আলুর বাজার’ নামে পরিচিত। তাঁর ছেলের নাম ছিল আলেয়ার খান। আলেয়ার খানের সময়ই এই বাজারের কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চলমান ছিল। মোগল সম্রাট আজিমুস্সান-এর মতে, এই বাজারের মূল নাম ছিল ‘আলেয়ার খানের বাজার’ যাকে কালের বিবর্তনে মানুষ ‘আলুর বাজার’ বলা শুরু করে।

এখন আলুর বাজারের সঙ্গে আলুর কোনো সম্পর্ক নেই বলে কেউ যদি ভেবে বসেন ধানমণ্ডির সঙ্গে ধানের কোনো সম্পর্ক নেই তাহলে কিন্তু ভুল হবে। মোগল শাসনামলে এখানে একটি বিশাল হাট বসত যেখানে চাল ও হরেক রকমের শস্য কেনাবেচা হতো।  শস্যের মধ্যে প্রধান ছিল ধান, সেখান থেকেই ‘ধানমণ্ডি’ নামের উত্পত্তি। কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, সবজিবাগান, পরীবাগ, গোপীবাগ, স্বামীবাগ, মধুবাগ, টোলারবাগ ইত্যাদি নানা বাগ বা বাগান নামের ছড়াছড়ি দেখে বোঝা যায়, এখানে বাগানের উপস্থিতি ভালো রকমেই ছিল। এত যদি বাগ থাকে তবে তার জন্য তো মালিও লাগবে তাই না? তো যে মালিরা এত বাগান দেখাশোনা করত তারা যেখানে থাকত তারা কি নিজেরা সেখানে বাগান করত না? করত নিশ্চয়ই, সে জন্য তাদের থাকার এলাকার নাম হয়ে গেল মালিবাগ। 

১৯০৪ সালে পিলখানায় হাতির র‌্যালি

ঢাকায় ব্রিটিশ শাসনামলে নানা ধরনের নামের উদ্ভব ঘটেছে তাদের প্রভাবে। যেমন ইস্কাটন শব্দটি ‘স্কটল্যান্ড’-এর একটি বিকৃত সংস্করণ। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সময়কালে কিছু স্কটিশ প্রচারক দ্বারা সেখানে একটি গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই নামের উত্পত্তি সেখান থেকেই।

১৯ শতকের শেষ দশকে, ঢাকার ব্রিটিশ কমিশনারের নাম ছিল ককেরেল, তাঁর নামানুসারে সম্ভবত একটি রাস্তা ছিল, যার মাধ্যমে পরে ওই এলাকা এই নামে পরিচিতি লাভ করে। মানুষ শেষ পর্যন্ত ককেরেলকে কাকরাইল উচ্চারণ করা শুরু করে।

এ ছাড়া ঢাকায় বিভিন্ন টোলা বা বাজারের সঙ্গে বিভিন্ন পেশার লোকের অবস্থান বা বিশেষ ব্যক্তির প্রভাবের ছাপ পাওয়া যায়। আবার মূলত পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা মোহম্মদপুরে বেশির ভাগ নাম মোগল শাসকদের নামে। কিন্তু মোগল আমলে সবচেয়ে জমজমাট জায়গা ছিল আসলে আজকের চকবাজার। ১৮০৯ সালে চার্লস ডেল চকবাজার সম্পর্কিত বর্ণনায় বলেছেন—‘চক’ ‘ঘধশযধং’ দ্বারা পরিচিত। এটি ২০০ ফুটের একটি বর্গক্ষেত্র এলাকা, যা সূর্যাস্তের সময় জমজমাট হয়ে ওঠে। আরবিতে ‘ঘধশযধং’ অর্থ হচ্ছে ‘দাস বিক্রেতা’। মোগল আমলে এটি ছিল দাস ব্যবসায় ও লোকজনের আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু। এখন সেই বিনোদনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই এলাকায় তৈরি হচ্ছে মুখরোচক সব খাবার। দাস ব্যবসা এখন বিদায় হয়েছে, থেকে গেছে চকবাজারের খাবারদাবার। 

ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের নামের যে বিপুল ভাণ্ডার, তার সামান্যই এখানে উল্লেখ করা গেল। তবে এটুকু বলা যায়, এই নামগুলো কৌতূহলজাগানিয়া, শুধু নামগুলোর রহস্য আবিষ্কারের জন্যও এ বিষয়ে আগ্রহী হতে পারেন।  আর তাতে উন্মোচিত হতে পারে ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায়।



সাতদিনের সেরা