kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

স্মৃতির শহর

ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের কোনো চিহ্নই আর নেই

১০ মে, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের কোনো চিহ্নই আর নেই

জুয়েল আইচ, জাদুশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা

ষাটের দশকের ঢাকার কথা বলছি। সেই সময়ের ঢাকায় তখন যানজট বলে কিছু ছিল না। গাড়ি-ঘোড়াও কম ছিল। মানুষের যাতায়াতের জন্য অল্প কিছু বাস ছিল। আর ঢাকা বিস্তৃত ছিল সদরঘাট থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত। নিউ মার্কেট যাওয়ার মাঝখানে বহু খোলা জায়গা ছিল। সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত একটি পার্ট, এলিফ্যান্ট রোড থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত একটি পার্ট। মাঝখানে বায়তুল মোকাররম মসজিদ; একটু দূরে গিয়ে সচিবালয়, হাইকোর্ট, রমনা পার্ক ছিল। ঢাকাজুড়েই গাছপালা, পাখি, ফুল—এসব ছিল। গুলিস্তানের মাঝখানে ফুলবাড়িয়ায় একটি রেললাইন ছিল। সেই ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের কোনো চিহ্নই আর নেই। এই প্রজন্মের অনেকে জানেও না। নবাবপুর থেকে তাকালে উঁচু মিনারওয়ালা ডিআইটি বিল্ডিংটা দেখা যেত। অনেক দূরে গিয়ে নটর ডেম কলেজ। মতিঝিল আলাদা একটি জায়গা ছিল। চকবাজার বাজারের মতো ছিল না। ধানমণ্ডি এলাকা তখনো শহর হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে দু-একটি বাড়ি হচ্ছিল। ঢাকায় প্রথমবার এসেছিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। বিল্ডিংয়ের আর্কিটেকচারটা দারুণ ছিল। ভর্তি পরীক্ষা দিলাম, রেজাল্ট হলো। আমি সেকেন্ড হলাম। আনন্দের সঙ্গে পিরোজপুরে ফিরে বাবার সামনে গেলাম। বাবার মত ছিল না। তাঁর ইচ্ছা ছিল অন্য কিছু করব। তখন তো বাবার সঙ্গে তর্ক করতাম না। তবে বললাম, সাবজেক্টটি আমার খুব ভালো লাগে। তিনি বললেন, ‘জেনারেল বিষয়ে পড়াশোনা করলে যেকোনো দিকেই যাওয়ার সুযোগ থাকবে।’ বললাম, আমার এটাই করতে ইচ্ছা করছে। বাবা বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত শিক্ষিত সাইনবোর্ড লিখিয়ে হবি।’ আমি আর কিছু বলতে পারিনি। সন্ধ্যার পর বাবার বন্ধুরা বাসায় এসেছেন। বন্ধুরাও বললেন, ‘সাইনবোর্ড লিখিয়ে হবে কেন?’ বাবা বললেন, ‘শিল্প করবে, কিন্তু বাঁচবে অন্য কারো ফরমায়েশ খেটে।’

বাবা যা বলেছিলেন, সেদিন তা হুবহু না হলেও অন্যরাও এ ধরনের মন খারাপের কথাই বলেছেন। একজন খুবই বড় শিল্পী আমাকে মন খারাপ করে বলছিল, ‘যখনই আমাদের বাঁচার প্রশ্নটা ওঠে, তখন চাল-ডালের বিষয়টি আসে। হয় আমাদের চিত্রগুলো বেচতে হবে, অথবা চাকরি করতে হবে। মনে মনে সে দুঃখী ছিল। বাচ্চার অসুখ হলে হাসপাতালে নিতে হবে। ছাড়া পেলে তো লাখ লাখ টাকা পে করতে হবে। তাহলে বাড়িভাড়া, সোসাইটির জন্য টাকা দিতে হচ্ছে। এর জন্য আমাকে চাকরি করতে হচ্ছে। অথবা ছবি বিক্রি করতে হচ্ছে।’ তার কথাগুলো লজিক্যালি ছিল। সবচেয়ে বেশি ইমোশন দিয়ে এঁকেছি। কিন্তু এক্সিবিশনে কোনো পুরস্কারই পাচ্ছে না। অনেকে আবার গাছ, লতাপাতা আঁকলেই পুরস্কার পাচ্ছে। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ লেখেন বড় মানুষ। বাংলাবাজারের দোকানদারের কাছে সবই ‘মাল’। বইও বলে না। বলে, ‘ওই মালটা ৫০০ কপি বাঁধ। কবিতার মধ্যে কত জিনিস আছে। ও একটা কবিতা কোনো দিনই পড়লও না। সব বিবেচনায় সেবার আর ঢাকায় ভর্তি হওয়া হয়নি। ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম পিরোজপুর থেকেই। ১৯৬৯ সালের দিকে ঢাকায় এসে ভর্তি হলাম।

গণ-অভ্যুত্থান চলছিল। প্রতিদিনই ছোট-বড় সভা হতো। আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান বাধ্য হলেন, ইলেকশন করবেন না। শিক্ষকদের মধ্যে কিছু কিছু আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। কিছু শিক্ষক আবার বিরক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন, সব আন্দোলন কি রাস্তায় হয় নাকি। ইলেকশনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ জিতল।

পরে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু। শিশু পার্কের ওখানে নৌকার আদলে মঞ্চ বানানো হলো। সাড়ে ১১টার দিকে টিএসসির গেট দিয়ে চলে এলাম। মানুষের প্লাবন। হেঁটে যাওয়ার জো নেই। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। ঠেলেঠুলে মঞ্চের কাছে গেলাম। ওপরে হেলিকপ্টার ছিল। কেউ কেউ বাঁশ হাতে ছিল। আমাদের ভাবটা এমন, লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে হেলিকপ্টার নামিয়ে দেব। এখন বুঝি, পরবর্তী সময়ে যে অত্যাচারটা করেছে, ওপর থেকে বোমা ফেলে মেরে ফেলতে পারত। পুরো ঢাকা শহরের মানুষ ছিল সেই জায়গায়। এর মধ্যে শোনা গেল, রেডিওর অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।



সাতদিনের সেরা