kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

নারীশিক্ষা এখনো অধরা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারীশিক্ষা এখনো অধরা

তালেবানের ফাঁকা গুলির শব্দে পালাতে থাকা নারীরা। গতকাল তোলা। ছবি : এএফপি

একসময় গুল আগা জালালির রাতের পর রাত কাটত তালেবানের নির্দেশমতো বোমা বসানোর কাজ করে। আর এখন রাত কাটে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে। পড়ছেন ইংরেজি নিয়ে। ভর্তি হয়েছেন কাবুলের এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার বিজ্ঞান কোর্সে।

বিজ্ঞাপন

নিজের দুই জীবনের মধ্যে শিক্ষাজীবনটাকেই বর্তমানে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন ২৩ বছর বয়সী জালালি। তাঁর সাফ কথা, ‘যখন আমাদের দেশ অবিশ্বাসীদের দখলে ছিল, তখন আমাদের বোমা, মর্টার ও অস্ত্রের প্রয়োজন ছিল। এখন শিক্ষার অনেক প্রয়োজন। ’

আরেক তালেবান সদস্য আমানুল্লাহ মুবারিজ। ১৮ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন তালেবানে। এখন আবার শুরু করেছেন পড়ালেখা। ইচ্ছা থাকলেও ইংরেজিতে ভালো নাম্বার না পাওয়ায় যেতে পারেননি ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর বদলে কাবুলেই পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ছেন তিনি।

ক্ষমতা নিজেদের দখলে নেওয়ার পর তালেবানের বহু যোদ্ধাই জালালি ও মুবারিজের মতো পড়ালেখার দিকে ঝুঁকেছেন। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ কমান্ডারদের চাপে। রক্ষণশীল অনেক তালেবান ধর্মগুরুর আপত্তি থাকলেও আধুনিক শিক্ষার ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে। এটি যে প্রয়োজন, সেটিও অনুধাবন করছেন তাঁরা। যেমন—জালালি বলেন, ‘বিশ্ব পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের প্রযুক্তি ও উন্নয়ন প্রয়োজন। ’

অন্যদিকে একই দেশে নারীদের ভাগ্যে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে বহু আফগান মাধ্যমিক ছাত্রীকে। এ রকমই এক শিক্ষার্থী ২০ বছর বয়সী নাফিসা। তালেবান ভাইয়ের রক্তচক্ষু এড়িয়ে নিজ বাড়িতে বই লুকিয়ে রাখার জন্য রান্নাঘরকে বেছে নিয়েছেন তিনি। নাফিসার যুক্তি, ‘রান্নাঘরে ছেলেদের কোনো কাজ নেই, তাই আমি আমার বই ওখানে রাখি। ’ শুধু বই লুকিয়ে রাখা নয়, লুকিয়ে লুকিয়ে গ্রামের গোপন এক স্কুলেও যান তিনি। নাফিসার গ্রামটি বেশ প্রত্যন্ত অঞ্চলে, পূর্ব আফগানিস্তানে। সেখানে গোপনে শিক্ষাদানের কাজ করছে ‘রেভল্যুশনারি অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য উইমেন অব আফগানিস্তান (রাওয়া)’।

পড়ালেখার খবর ভাইয়ের কানে গেলে মারধরের শিকার হতে হবে—এমন শঙ্কাও রয়েছে নাফিসার। কিন্তু তিনি বলেন, ‘আমরা এই ঝুঁকিতে রাজি, নাহলে অশিক্ষিতই রয়ে যেতে হবে আমাদের। ’

ঝুঁকি তো আছেই, করতে হচ্ছে আত্মত্যাগও। যেমন—নাফিসা মরিয়া হয়ে পড়া চালাতে থাকলেও তাঁর বোন তা পারছেন না। কোনোভাবে যেন ভাইয়ের সন্দেহ না হয়, সে জন্য ছাড় দিচ্ছেন নাফিসার বোন।

মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক স্কুল পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল তালেবান। কিন্তু বাদ সাধেন তালেবান প্রধান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। মার্চে তাঁরই নির্দেশে বন্ধ হয়ে যায় স্কুলের কার্যক্রম।  

তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে নারীদের যে শুধু পড়ালেখার অধিকার খর্ব হয়েছে তা নয়, তারা এখন পুরুষদের সাহচর্য ছাড়া দীর্ঘ সফরেও বের হতে পারে না। অনেক চাকরিতেও নেই তাদের কোনো প্রবেশাধিকার।

সরকারি চাকরির দুয়ার অনেকটা পাকাপোক্তভাবে বন্ধই হয়ে গেছে বহু নারীর জন্য। তালেবানের রোষানল এড়াতে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও নিচ্ছে না নারীদের। যারা নিচ্ছে, সেখানেও মানতে হচ্ছে নানা শর্ত।

গতকাল শনিবার প্রায় ৪০ জন নারী ‘রুটি, কাজ ও স্বাধীনতা’ স্লোগানের মিছিল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন কাবুলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনের সামনে। জবাবে ফাঁকা গুলি ছুড়ে এবং তাঁদের পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে আফগান যোদ্ধারা।

ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার আগে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার চাওয়া আফগান নারীরা গতকাল ‘সুবিচার, সুবিচার’ স্লোগান দিচ্ছিলেন, হাতে ছিল ‘আগস্ট ১৫ কালো দিন’ লেখা ব্যানার। ওই দিনটিতেই ক্ষমতায় ফিরেছিল তালেবান।

তালেবানের একটি অংশ নারীশিক্ষার বিরোধিতা করলেও এর পক্ষে কথা বলছেন দলের তরুণ সদস্যরা। যেমন—জালালি বলেন, ‘এই দেশের আমাদেরকে যতটা দরকার, তাদেরও ততটা দরকার। ’ মুবারিজ বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে তরুণ হিসেবে, ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, তাদের শিক্ষার অধিকার রয়েছে। ’

সূত্র : এএফপি



সাতদিনের সেরা