kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

জলবায়ু পরিবর্তন

ধারণার আগেই তীব্র হচ্ছে প্রভাব

জাতিসংঘের প্রতিবেদন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধারণার আগেই তীব্র হচ্ছে প্রভাব

আজ যে শিশুটি জন্ম নিয়েছে, বয়স ত্রিশের কোঠা পার হওয়ার আগেই তার জন্য অপেক্ষা করে আছে নিদারুণ কঠিন এক ভবিষ্যৎ। আমাদের ধারণার চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে চলেছে নতুন প্রজন্ম। দশক দশক ধরে নির্গত কার্বন পৃথিবীকে যেভাবে বিষাক্ত করে তুলেছে, সেটার জেরেই তাদের ভুগতে হবে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক আন্ত সরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) বিশ্বের খরা পরিস্থিতি সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে মানবজাতির উদ্দেশে এমন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইপিসিসির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীবজগতের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ-প্রাণীর বিলুপ্তি, রোগবালাইয়ের প্রকোপ বৃদ্ধি, তাপমাত্রা অসহ্য হয়ে ওঠা, বাস্তুসংস্থানে ধস নামা, সাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে গিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার মতো বিভিন্ন ক্ষতিকর ঘটনার গতি আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে। মানুষ দ্রুততম গতিতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও এসব ভয়াবহতা এড়ানো যাবে না, বরং আজকের শিশুরা বেড়ে ওঠার আগেই পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ ধারণ করবে।

প্রতিবেদনে রাখঢাক না রেখে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এখনো আসেনি। সেই পরিস্থিতিতে আমাদের সন্তান ও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যতটা ভুগবে, তা আমাদের ভোগান্তির চেয়ে অনেক বেশি। আর আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুত ঘনিয়ে আসছে সেই দুর্ভোগ।’

আইপিসিসির চার হাজার পৃষ্ঠার বিশাল ওই প্রতিবেদন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করার কথা। এর আগেই হাতে প্রতিবেদনের যে খসড়া এএফপির হাতে এসেছে, সেটার ভিত্তিতে আশঙ্কাজনক ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে যাদের দায় তুলনামূলক কম, তারাও ভুগবে নির্বিচারে। উষ্ণায়ন আর জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে পৃথিবীতে যা ঘটছে, তাতে প্রকৃতির বাকি অংশ খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও মানুষ পারবে না, এমনটাও স্পষ্ট করে বলা হয় প্রতিবেদনে।

খসড়া প্রতিবেদনে চারটি মুখ্য বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আসন্ন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এবং সেই ক্ষতি এড়াতে মানুষের বিশেষ করে নীতিনির্ধারকরদের করণীয়।

শুরুতেই জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা এনেছেন বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধির বিষয়টি। ২০১৫ সালে করা প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্বনেতারা অঙ্গীকার করেছেন, প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির বেশি যেন না বাড়ে, সে জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেবেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি বাড়ার পথে রয়েছে। অথচ তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি বাড়লেই অনেক জীববৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। বিবর্ণ হতে থাকা প্রবালপ্রাচীরগুলো সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে চলেছে।

এরপর বিজ্ঞানীরা মানবজাতিকে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে যা ঘটতে চলেছে, তা মোকাবেলায় মানুষের এখনকার প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। এই প্রস্তুতির জন্য যে বিপুল অর্থ প্রয়োজন, সেটা উল্লেখ করতেও ভোলেননি বিজ্ঞানীরা।

তৃতীয় যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা হলো প্রকৃতিতে এমন সব পরিবর্তন আসতে চলেছে, যেগুলো আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। এই যেমন সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি বাড়লেই গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪৩ ফুট বেড়ে যাবে এবং তা আর কখনোই কমানো যাবে না। সাইবেরিয়ার পার্মাফ্রস্ট গলে গিয়ে শত শত কোটি টন কার্বন উন্মুক্ত হয়ে বাতাসে মিশে যাবে। খরা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, দাবানল এসব বেড়ে গিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। এসব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জন্য সহজ কোনো সমাধান নেই, তা বলাই বাহুল্য।

এত সব আশঙ্কাজনক তথ্যের বিপরীতেও আশার বাণী শোনাতে চান বিজ্ঞানীরা। অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগেই তা ঠেকাতে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ আর বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন কতটা জরুরি, সেটাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, মানুষ যদি খাদ্যের জন্য প্রধানত উদ্ভিদনির্ভর হয়, তবেই কার্বন নিঃসরণ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সরকার পর্যায় পর্যন্ত পরিবর্তন আনা এবং আমাদের পুরো জীবনযাপন পদ্ধতি ও ভোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর মধ্যেই রয়েছে আমাদের কল্যাণ, এমনটা বলা হয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে। সূত্র : এএফপি।



সাতদিনের সেরা