kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০

ফল নির্ধারণ করবে করোনাভাইরাস!

শামীম আল আমিন, নিউ ইয়র্ক   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফল নির্ধারণ করবে করোনাভাইরাস!

নিউ ইয়র্কের উডসাইট এলাকার বাসিন্দা এ এস এম ফেরদৌস। এই সরকারি চাকরিজীবীর জীবনে গত এপ্রিলে হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। অসুস্থ স্ত্রী রউশন আরা ফেরদৌসকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর জানা গেল, তিনি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত। আর তিনি মারা গেলেন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। এ নিয়ে অনেক আক্ষেপ ফেরদৌসের। প্রচণ্ড কষ্ট আর অভিমান নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো দিন ভাবিনি, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশ একটি ভাইরাস থেকে আমার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারবে না। সবাইকে মারা যেতে হবে। তাই বলে এতটা নির্মম ও নিঃসঙ্গভাবে? তার সাথে শেষ দেখাটাও হলো না।’

শুধু রউশন আরা ফেরদৌস নন, যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সর্বশেষ হিসাবে দেশটিতে আক্রান্ত ৮৮ লাখ ৩১ হাজার। আর মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি। এ জন্য নেতৃত্বের দুর্বলতাকে দায়ী করছেন ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক, এই ভাইরাসকে আমরা কেউই চিনতাম না। বিপর্যয় কমবেশি ঘটবে, এটাও ঠিক। তাই বলে এত মানুষের ক্ষতি! এ জন্য অবশ্যই দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়দায়িত্ব নিতেই হবে।’

বিশ্লেষকরাও বলছেন, এত সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়েও অনেকটা যেন নির্বিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অথচ নির্বাচনী ফল নির্ধারণে এই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার বিষয়টি হয়ে উঠেছে মূল নির্ধারক। বিভিন্ন জরিপের ফলেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে এই ইস্যুটিকে কাজে লাগাতে চাইছে ডেমোক্র্যাটরা। জো বাইডেন এ নিয়ে বেশ সরব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। তবে রিপাবলিকানরা বলছে, এই সময়টায় মানুষকে অর্থনৈতিক নানা সুবিধা দেওয়া থেকে শুরু করে মহামারি মোকাবেলায় যে ভূমিকা প্রেসিডেন্ট রেখেছেন, তাতে নির্বাচনী বৈতরণী বেশ ভালোভাবেই উতরে যাবেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, শুরু থেকেই ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে গুরুত্বই দেননি। মাস্ক পরা নিয়ে অনিচ্ছা দেখিয়েছেন, উপহাস করেছেন প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেনকে। ভাইরাসটির ভয়াবহতা এবং ওষুধ নিয়ে একেকবার একেক কথা বলেছেন। নির্বাচনী শোভাযাত্রা করার জন্য হাজারো মানুষের সামনে উপস্থিত হয়েছেন। হোয়াইট হাউসে অনেক মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান করেছেন, যেখানে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি মানা হয়নি; অনেকে মাস্ক পর্যন্ত পরেননি। এমনকি তিনি নিজে, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং ছোট ছেলে ব্যারন করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন। হাসপাতালে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পরও দায়িত্বশীল আচরণ করেননি ট্রাম্প। বরং হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এসে শোভাযাত্রা করেছেন।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আলাবামার ডিজিটাল জার্নালিজমের সহযোগী অধ্যাপক ড. এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন সবার জন্য আইকন। দেশের মানুষ তাঁকে অনুসরণ করবে। কিন্তু করোনার ভয়াবহতাকে তিনি তো মানছেনই না, বরং তাঁর সমর্থকদের মধ্যেও বিরূপ ধারণা দিচ্ছেন। তাঁর আচরণ থেকে কী শিখব—সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।’

তবে সারা যুক্তরাষ্ট্র যখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, নিউ ইয়র্কে যখন মানুষের মৃত্যুর মিছিল, তখনো এ নিয়ে রাজনীতি হয়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের। তাদের অভিযোগ, তারা এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ চায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন ভ্যাকসিন আবিষ্কার দিয়ে একটি চমকের অপেক্ষায়; নির্বাচনের আগে যা আসবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ রয়েছে। ভ্যাকসিন এলে দুই প্রার্থীই বিনা মূল্যে তা সাধারণ মানুষকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে নতুন করে লকডাউন না বসিয়ে বরং সব কিছু খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প ও বাইডেনের অবস্থান একেবারে ভিন্নমুখী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অর্থনীতির ক্ষতি ও মানুষের মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরে সব কিছু খুলে দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে জো বাইডেন বলেছেন, তিনিও চান সব কিছু খুলে যাক। তবে সেটি একটি নীতিমালার আওতায়, সঠিক পরিকল্পনা ও সাবধানতার সঙ্গে, পর্যায়ক্রমে। মানুষের জীবন নিয়ে বাজি ধরতে চান না তিনি।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে রিপাবলিকানরা উল্টো অভিযোগের আঙুল তুলেছে ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত স্টেটগুলোর গভর্নর ও মেয়রদের দিকে। সেই সঙ্গে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সংক্রমণ বেড়েছে বলে তাদের অভিযোগ। বাংলাদেশি আমেরিকান রিপাবলিকান অ্যালায়েন্সের চিফ কো-অর্ডিনেটর মুশতাক চৌধুরী বলেন, ‘নিউ ইয়র্কের কথাই যদি বলি, দেখুন এখানেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ এটি ডেমোক্র্যাট স্টেট। এখানে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। গভর্নর ও মেয়রের মতবিরোধ রয়েছে।’ এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

করোনা পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ের মুখে থাকা দেশটিতে নির্বাচন হচ্ছে। আর অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। অবস্থা যা-ই হোক, সাধারণ মানুষ চাইছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা