kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৭ । ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৪ সফর ১৪৪২

বৈরুত বন্দরে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের গুদাম

ছয় বছরের অবহেলা কাড়ল শত প্রাণ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ছয় বছরের অবহেলা কাড়ল শত প্রাণ

লেবাননের বৈরুতে মঙ্গলবারের বিস্ফোরণে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বন্দর ও আশপাশের এলাকা। বিস্ফোরণের জেরে উঁচু এই গুদাম থেকে ছড়িয়ে পড়া খাদ্যশস্য চোখে পড়ে দূর থেকেও। ছবি : এএফপি

বিস্ফোরকে রূপ নেওয়ার আগে প্রায় তিন হাজার টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বৈরুতের বন্দরে পড়ে ছিল ছয় বছর। ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সেটা জানতেনও। তাঁরা এটাও জানতেন, নিরীহভাবে পড়ে থাকা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট পরিস্থিতি বদলালে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তা নিয়ে কেউ কেউ মাথাও ঘামিয়েছেন। তবে তাতে লাভ হয়নি। বিপুল প্রাণহানি আর ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা শেষ পর্যন্ত ঘটেই গেল।

বিভিন্ন সরকারি রেকর্ড আর অনলাইনে প্রকাশিত নথি ঘেঁটে আলজাজিরা জানিয়েছে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দরে ছয় বছর আগে গুদামজাত করা হয় দুই হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। গুদামজাত করার পেছনের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে মলদোভার পতাকাবাহী রুশ মালিকানাধীন একটি পণ্যবাহী জাহাজ লেবাননে পৌঁছে। জলযানের অবস্থান শনাক্তকরণে নিয়োজিত ফ্লিটমন শীর্ষক সাইটের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, রসাস নামের ওই জাহাজ জর্জিয়া থেকে মোজাম্বিকে যাচ্ছিল।

ওই জাহাজের এক নাবিকের পক্ষের আইনজীবীদের তথ্য মতে, কারিগরি সমস্যার কারণে জাহাজটি বৈরুত বন্দরে নোঙর করতে বাধ্য হয়। লেবাননের সরকারি কর্মকর্তারা পরে আর ওই জাহাজকে বন্দর ত্যাগ করতে দেননি। ফলে মালিকপক্ষ জাহাজটি সেখানেই ফেলে রাখতে বাধ্য হয় এবং নাবিকরাও জাহাজ ত্যাগ করেন। ফ্লিটমনের তথ্য সে রকমটাই বলছে।

পরে জাহাজ থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট কার্গোসহ সরিয়ে বৈরুত বন্দরের ১২ নম্বর হ্যাঙ্গারে মজুদ করা হয়। রাজধানীতে ঢোকার মুখে মহাসড়কসংলগ্ন বন্দরের ওই হ্যাঙ্গারেই এত দিন পড়ে ছিল আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ওই বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক।

এর মাঝখানে অবশ্য লেবাননের সরকারি কর্মকর্তারা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ভয়াবহতার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। ২০১৪ সালের ২৭ জুন লেবানিজ কাস্টমসের তৎকালীন পরিচালক শফিক মারহি ‘জরুরি ব্যাপার সংক্রান্ত বিচারকের’ উদ্দেশে চিঠি লিখে ওই সমস্যার সমাধান চান। পরের তিন বছরে কাস্টমস কর্মকর্তারা বন্দরে মজুদ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ব্যাপারে নির্দেশনা চেয়ে আরো পাঁচবার চিঠি দেন। ২০১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে ৬ মে, ২০১৬ সালের ২০ মে, একই বছর ১৩ অক্টোবর ও ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর বিচারকদের কাছে ওই সব চিঠি পাঠানো হয়।

চিঠিগুলোয় কাস্টমস কর্মকর্তারা তিনটি ভিন্ন সমাধানের প্রস্তাব দেন—মজুদ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রপ্তানি করা হোক, লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হোক কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন লেবানিজ এক্সপ্লোসিভ কম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হোক।

এর মধ্যে ২০১৬ সালে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আগের চিঠিগুলোর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বরাবরের মতো সেই চিঠিরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

সব চিঠিতেই বলা হয়েছে সার হিসেবে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অরক্ষিত পরিবেশে থাকলে তা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় বন্দর ও বন্দরের কর্মীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রায় তিন হাজার টন অ্যামোনিয়ম নাইট্রেটের বিষয়ে বারবার নির্দেশনা চেয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা; কিন্তু কোনো ফল হয়নি।

আলজাজিরা জানায়, বন্দরকেন্দ্রিক দুর্নীতি নিয়ে লেবানিজদের ক্ষোভ এমনিতেই তুঙ্গে। গত মঙ্গলবারের বিস্ফোরণে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি আর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।

স্থানীয়দের কাছে ‘আলীবাবা ও ৪০ চোরের গুহা’ হিসেবে পরিচিত ওই বন্দরকে ঘিরে দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর সরকার শত শত কোটি ডলার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা কর ফাঁকি দিচ্ছেন। অব্যবস্থাপনার চরমে থাকা এই বন্দর গত মঙ্গলবারের বিস্ফোরণে তছনছ হয়ে গেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা