kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

যন্ত্রণার নদী পার হয়ে মুক্তির শ্বাস নিচ্ছে উহানবাসী

দুই মাস উহানের সব কিছু বন্ধ ছিল। প্রথম দিকে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও প্রথম চার সপ্তাহ পার করার পর সংখ্যা কমতে শুরু করে। গত সপ্তাহে নতুন রোগী পাওয়া গেছে মাত্র একজন। আর আক্রান্তদের ৯৩ শতাংশই পুরোপুরি সেরে উঠেছে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যন্ত্রণার নদী পার হয়ে মুক্তির শ্বাস নিচ্ছে উহানবাসী

উহানে করোনাভাইরাসবিরোধী যুদ্ধে এই তিন সেবিকা লড়াই করেছেন একসঙ্গে। গতকাল এঁদের মধ্যে একজন (লাল পোশাকে) নিজ প্রদেশ জিলিনে ফেরেন। উহানের তিয়ানহে বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় দিতে এসে আবেগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন তাঁরা। ছবি : এএফপি

৭৬ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর মুক্ত হলো উহান। তাদের লড়াইটা ছিল অদৃশ্য এক শত্রুর বিরুদ্ধে। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা ওই শত্রুকে প্রাথমিকভাবে পরাস্ত করেছে উহান। খুলে দেওয়া হয়েছে তাদের গণপরিবহন, শহর ছেড়ে যাওয়ার বা শহরে প্রবেশের বাস-ট্রেন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন পার হয়ে উহানবাসী এখন মুক্তির শ্বাস নিচ্ছে। তবে তা অবশ্যই মাস্ক পরে। কারণ শত্রু আপাতত পরাজিত হলেও উহানের মাটি থেকে বিদায় নেয়নি।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান নগরীতে গত ডিসেম্বরে প্রথম করোনাভাইরাসের কথা জানা যায়। এ শহরের প্রথম ব্যক্তি করোনায় মারা যায় জানুয়ারিতে। এরপর দাবানলের মতো ছড়াতে থাকে এই ভাইরাস। ভাইরাস ছড়ানোর পর চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া ব্যবস্থার ব্যাপারে স্থানীয় ও উহানের বিজ্ঞানীদের নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

জানুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহ উহান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ছিল, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তখন পর্যন্ত তাদের ধারণা ছিল, এই ভাইরাস বন্য প্রাণী থেকে ছড়ায়। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় না। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। ১২ জানুয়ারি জানা যায়, হাসপাতালগুলোর শ্বাসকষ্টসংক্রান্ত ওয়ার্ডগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে। বহু লোক চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও ১৬ জানুয়ারি উহান কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন কোনো আক্রান্তের কথা জানা যায়নি। শহরের ওপরও কোনো কড়াকড়ি আরোপ করেনি তারা। রেস্তোরাঁগুলো উপচে পড়ছিল ভিড়ে, শপিং সেন্টারগুলো ঠাসা ক্রেতা, নববর্ষ উপলক্ষে ট্রেন স্টেশন আর বিমানবন্দরগুলোতে অতিরিক্ত মানুষের আনাগোনা। ওই সময় শহর কর্তৃপক্ষ মাস্ক ব্যবহার বা সাধারণভাবে শরীরের তাপমাত্রা মাপার মতো কাজগুলো শুরু করে।

পরিস্থিতি পাল্টায় ১৮ জানুয়ারির পর থেকে। ওই দিন বেইজিং থেকে বিজ্ঞানীদের একটি দল উহানে পৌঁছে। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন ৮৩ বছর বয়সী রোগ বিস্তারসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ঝং নানশান। তিনি ২০০৩ সালেও সার্স ভাইরাসের কথা প্রথম বলেছিলেন। তাঁর দল পরের দুই দিন উহানে অবস্থান করে। এই দলটি বেইজিংয়ে ফিরে গিয়ে উহানের পরিস্থিতির কথা জানায়। সোয়া কোটির এই শহরটিকে লকডাউন করার প্রস্তাব তারাই দেয়। একই সঙ্গে বড় ধরনের হাসপাতাল দ্রুতগতিতে নির্মাণ করার কথাও বলা হয়।

উহান কর্তৃপক্ষ শুরুর দিকে অর্থনৈতিক সংকটের কথা চিন্তা করে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ২০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকার তাদের এই ব্যবস্থাগুলো মেনে নিতে বাধ্য করে। ২৩ জানুয়ারি উহানে লকডাউন কার্যকর হয়। শহরে কারো প্রবেশ এবং বের হওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণপরিবহন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়। শহরবাসী আটকা পড়ে নিজ নিজ বাড়িতে। সরকার হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করে। উহানের নেতৃত্বে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকেও সরিয়ে দেয় বেইজিং।

দুই মাস উহানের সব কিছু বন্ধ ছিল। প্রথম দিকে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও প্রথম চার সপ্তাহ পার করার পর সংখ্যা কমতে শুরু করে। গত সপ্তাহে নতুন রোগী পাওয়া গেছে মাত্র একজন। আর আক্রান্তদের ৯৩ শতাংশই পুরোপুরি সেরে উঠেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে এই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। গতকাল পুরো শহরের ওপর থেকেই বিধিনিষেধ উঠে যায়।

সিঙ্গুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সরকারের করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের সদস্য সুয়ে লান বলেন, ‘লকডাউনের সময় যেসব সতর্কতা আমরা মানতে বাধ্য হয়েছি, সেগুলো সম্ভবত আমাদের রোজকার জীবনের অংশ হয়ে যাবে। এখন থেকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়াবে সামাজিক দূরত্ব। এটাই হবে তখন স্বাভাবিকতা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা