kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জীবিকার তাগিদ

নিজেদের কয়েদখানা বানাচ্ছেন ওঁরা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



নিজেদের কয়েদখানা বানাচ্ছেন ওঁরা

শেফালি হাজং

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার এক নদীতীরে অবৈধ অভিবাসী আটককেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। নির্মম বাস্তবতা হলো, সেখানে ব্যস্ত শ্রমিকদের অনেককেই হয়তো এই কেন্দ্রেই আটক হতে হবে। কারণ সম্প্রতি প্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) তালিকা থেকে তারা বাদ পড়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারলে আটককেন্দ্রেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হতে পারে, তেমনটা জেনেও জীবিকার তাগিদে সেখানেই শ্রম দিচ্ছে তারা।

শ্রমিকদের মধ্যে আছেন পাশের গ্রামের তফসিলি জাতির শেফালি হাজং। এনআরসি থেকে বাদ পড়া প্রায় ২০ লাখ মানুষের মধ্যে তিনিও একজন। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য তাদের সবার মতো শেফালিকেও জন্মসনদ বা জমির মালিকানা বা অন্য কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। সেটা করতে না পারলে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে কোনো এক আটককেন্দ্রে তাঁর জায়গা হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ নিয়ে শেফালির দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ‘কিন্তু আমার পেটটাও তো ভরাতে হবে’, কাজ করতে করতে সে কথা বললেন এ নারী। দিনে চার ডলার মজুরি পান তিনি। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অঙ্কটা বেশ ভালোই বলা চলে। পেটের দায়ে দিনমজুরিতে ব্যস্ত অস্থিচর্মসার শেফালি নিজের প্রকৃত বয়স জানেন না, তবে তাঁর ধারণা তাঁর বয়স ২৬ বছর। তাঁর মা মালতি হাজংও এখানেই দিনমজুরি করছেন। তিনি জানান, ‘আমাদের জন্মসনদ নেই।’

অবৈধ অভিবাসীদের জন্য আসামে কমপক্ষে ১০টি আটককেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর একটি হলো গোয়ালপাড়া শহরের কাছাকাছি নির্মাণাধীন একটি আটককেন্দ্র। কমপক্ষে তিন হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এ আটককেন্দ্রে একটি স্কুল, একটি হাসপাতাল, বিনোদনের জন্য আলাদা জায়গা ও নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য আলাদা কোয়ার্টার থাকছে। উঁচু দেয়ালঘেরা এ স্থাপনায় দুটি ওয়াচটাওয়ারও থাকছে।

এ আটককেন্দ্রের জন্য এরই মধ্যে উঁচু লাল দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে প্রায় সাতটি ফুটবল মাঠের সমান জায়গা। আর সেখানে নির্মাণকাজে ব্যস্ত সময় পার করছে এনআরসি থেকে বাদ পড়া শেফালির মতো আরো অনেকে। তেমনই একজন সরোজিনি হাজং জানান, তাঁরও জন্মসনদ নেই। ‘কী যে ঘটবে, তা নিয়ে সত্যি খুব ভয়ে আছি। কিন্তু আমাদের কী করার আছে? আমার তো টাকা দরকার’, বলেন হাজং গোষ্ঠীর ৩৫ বছর বয়সী এ নারী। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই আশপাশের গ্রাম থেকে আরো মানুষ আসছে কাজের খোঁজে। আটককেন্দ্রের বিশাল রান্নাঘর নির্মাণের দায়িত্বে থাকা কন্ট্রাক্টর শফিকুল হক এ কথা জানান।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আদেশে আসামে বৈধ নাগরিকদের তালিকা তৈরির যে তোড়জোড় শুরু হয়, তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জাতীয় পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যাপক সমর্থন ছিল। এর ভিত্তিতে গত সপ্তাহে যে এনআরসি প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে মুসলমানদের পাশাপাশি বাদ পড়েছে বহু হিন্দুও, যাদের বেশির ভাগই দরিদ্র ও স্বল্পশিক্ষিত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এনআরসি থেকে বাদ পড়া লোকজন নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সর্বশেষ আইনি ধাপ পার হওয়ার আগ পর্যন্ত সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে থাকবে। এর আগ পর্যন্ত তাদের আটক করা হবে না বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অবশ্য মন্তব্য করেছে, ‘আসাম সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জাতীয়তা ও স্বাধীনতা হারানোর দিকে যেতে পারে, এমনকি তাদের মৌলিক অধিকারও খর্ব হতে পারে।’ সূত্র : রয়টার্স।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা