kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রবার্ট মুগাবের প্রয়াণ

জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার যোদ্ধা থেকে স্বৈরশাসক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার যোদ্ধা থেকে স্বৈরশাসক

উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রবার্ট মুগাবের রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি। স্বাধীন জিম্বাবুয়ে প্রতিষ্ঠায় সফল এ নায়ক দেশ শাসনেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর ভোটের রাজনীতি ছেড়ে দেশে কার্যত স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে তিনি রীতিমতো খলনায়ক বনে যান মাত্র এক দশকের মধ্যে। দেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। সেই ক্ষুণ্ন ভাবমূর্তি নিয়েই গতকাল শুক্রবার তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। গত এপ্রিল থেকে তিনি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। ১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হারারের এক রোমান ক্যাথলিক মিশনে তাঁর জন্ম হয়েছিল।

মুগাবের স্বর্ণযুগ : ক্যাথলিকদের কাছ থেকে শিক্ষা অর্জন করে মুগাবে প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরে তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আফ্রিকান জাতীয়তাবাদের এ সূতিকাগার থেকে পড়ালেখা শেষ করে তিনি ১৯৬০ সালে দেশে ফিরে রাজনীতিতে যোগ দেন। শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরোধিতা করায় রাজনীতি শুরুর মাত্র চার বছরের মাথায় তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালে তাঁর শিশু ছেলে ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ নেতৃত্বাধীন সরকার সেই শিশুর শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগদানের জন্য মুগাবেকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার মানবিকতাটুকুও দেখায়নি। স্বাধীনতাযোদ্ধা মুগাবের শাসনকালের কঠোরতার কারণ ব্যাখ্যায় অনেক ইতিহাসবিদ তাঁর জীবনের এ নিষ্ঠুর ঘটনার উল্লেখ করেন।

কারামুক্তির পর মুগাবে দ্রুত জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির শীর্ষে পৌঁছে যান এবং ব্রিটিশ সমর্থনপুষ্ট শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই শুরু করেন। যুদ্ধ শেষে ১৯৮০ সালের মার্চের নির্বাচনে জিতে তিনি হন স্বাধীন জিম্বাবুয়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিকে তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন, যদিও পরে তাঁর মত পরিবর্তনে দেরি হয়নি।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুতে তিনি জাতীয় অর্থনীতিতে দারুণ গতি আনেন, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন এবং ঔপনিবেশিক আমলের বর্ণবাদী বৈষম্য হটাতে কৃষ্ণাঙ্গদের শিক্ষায় ব্যাপক গুরুত্ব দেন। জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে যেসব শ্বেতাঙ্গ ব্রিটেন বা দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে গিয়েছিল, মুগাবের উন্নয়নমুখী শাসনব্যবস্থার জেরে আশির দশকে তারা দেশে ফেরার চেষ্টাও করেছিল।

ধীরে ধীরে স্বৈরশাসনের পথে : কিন্তু মুগাবের নৃশংসতা সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী জশুয়া এনকোমোকে দমনের স্বার্থে তাঁকে সমর্থনকারী এনদেবেলে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেন মুগাবে, এমন অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সেনা অভিযানে এনদেবেলে গোষ্ঠীর ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনে নৃশংসতার পথ বেছে নেওয়া মুগাবে দুই দফা প্রধানমন্ত্রিত্ব পার করেও ক্ষান্ত হননি। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে তিনি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট পদে বসেন। তাতেও সন্তুষ্ট হতে না পেরে তিনি নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে জনসমর্থন আদায় করতে গণভোটের আয়োজন করেন, কিন্তু তাতে পরাজিত হন এবং এর জন্য সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের দায়ী করেন। এর কয়েক দিনের মাথায় দেশজুড়ে শ্বেতাঙ্গ মালিকানাধীন খামারবাড়িগুলোয় জবর দখল শুরু করে দেয় কৃষ্ণাঙ্গরা। ওই ঘটনাকে মুগাবে ঔপনিবেশিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

ধ্বংসের পথে জিম্বাবুয়ে : কৃষিজমিতে শ্বেতাঙ্গদের অধিকার বেআইনিভাবে খর্ব হওয়ার মধ্য দিয়ে জিম্বাবুয়ের বহুমাত্রিক অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ওই ঘটনার জেরে ২০০০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি এক-তৃতীয়াংশ সংকুচিত হয়ে যায় বলে তাঁদের অভিমত। এ ছাড়া বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশের ওপরে উঠে যাওয়া, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি আর লাখ লাখ লোকের দেশ ছাড়ার ঘটনাও ঘটে।

মুগাবের চূড়ান্ত পতন : অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দ্রুত রাজনীতিতেও প্রবেশ করে। চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বরে মুগাবেকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। সেটা মানতে নারাজ মুগাবেরকে শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টে অভিশংসিত করে তাঁর নিজের দল। ওই বছর জুলাইয়ে মুগাবেবিহীন সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কার্যত শেষ হয়ে যায় জিম্বাবুয়ের মুগাবে পর্ব। সূত্র : রয়টার্স, দ্য হিন্দু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা