kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আসামে এনআরসি

বাদ পড়াদের সামনে জটিল দীর্ঘ পথ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাদ পড়াদের সামনে জটিল দীর্ঘ পথ

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) থেকে যে ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাদের সামনে এখন একটাই রাস্তা—নিজেকেই প্রমাণ করা। তাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা অবৈধ বাংলাদেশি নয়—ভারতের নাগরিক। আর এই প্রমাণের জন্য তাদের এখন পাড়ি দিতে হবে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পথ।

আইন অনুযায়ী, এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য ১২০ দিনের মধ্যে বিদেশি ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে হবে। বলা হয়েছে, বিশেষভাবে তৈরি ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও তারা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টেও আপিল করতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, আদালতে গিয়ে দীর্ঘ, জটিল এবং ব্যয়বহুল আপিল প্রক্রিয়ার সুবিধা কতজন নিতে পারবে?

নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এমন একজন, বঙ্গাইগাঁও জেলার বাসিন্দা আহম্মদ তৈয়ব। তিনি জানান, নাগরিকত্ব প্রমাণে সরকার যেভাবে নিয়ম করে দিয়েছে, তিনি সে অনুযায়ী কাজ করবেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভারতীয় নাগরিক, এ নিয়ে আমার সব নথি আছে। এখন এনআরসিতে যেহেতু নাম ওঠেনি, তাই সরকার যে রকম নিয়ম করেছে যে ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে, তাহলে সেটাই করব।’

আসামে অনেক দশক ধরে বিদেশি ট্রাইব্যুনাল কাজ করছেন। সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে এখন ৩০০টি ট্রাইব্যুনালে ঠেকেছে। কিছুদিনের মধ্যে সরকার মোট এক হাজার ট্রাইব্যুনাল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে—কারণ এনআরসি থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষের মামলা এই আধাবিচারিক ট্রাইব্যুনালগুলোকে সামলাতে হবে। এখন প্রশ্ন উঠেছে এ ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যক্রম নিয়ে। এ ব্যাপারে গুয়াহাটি হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হাফিজ রশিদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনাল কিভাবে কাজ করে, সেটা নিয়ে বিভিন্ন আইনজীবীর কাছ থেকে তিনি নানা অভিযোগ শুনেছেন। এর মধ্যে একটি হলো ট্রাইবু্যুনালে সাক্ষীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো সাক্ষ্য আদায় করা।

তিনি আরো বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে গেলে সাক্ষীদের ধমক দেওয়া হয়, এই তুমি এটা বলো কেন, ওইটা বলো। গরিব মানুষ ধমকে ঘাবড়ে যায়। ট্রাইব্যুনালের কথামতো সাক্ষ্য দিয়ে দেয়। এ রকম শত শত মামলা আমাদের কাছে রিপোর্ট করছেন উকিলরা। জুনিয়র উকিলরাও কিছু বলতে পারেন না।’ এ রকম অবস্থায় তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষগুলো কতটা ন্যায়বিচার পাবে, সেটা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। রশিদ চৌধুরী মনে করেন, এই মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত কিভাবে থাকবে সেটা একমাত্র সরকারের ওপর নির্ভর করবে।

গুয়াহাটি হাইকোর্টের আরেক আইনজীবী আমান ওয়াদুদ। তিনি নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে অনেক দিন ধরে নানা গুরুত্বপূর্ণ মামলা লড়ছেন। তিনি জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের ব্যাপারে আপিল করার জন্য ১২০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। সরকার এ জন্য সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু এটা আদৌ কতটা কাজে আসবে সেটা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তিনি বলেন, ‘আদালতের মামলা সব সময় একটু জটিল হয়। আর এখানে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার বোঝাটা আপনার ওপরই থাকবে। যা পুরো বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলবে।’

বিদেশি ট্রাইব্যুনালে নিজের কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, অনেক সময় ব্যক্তির নাম, বয়স, কেস অব রেসিডেন্সের ভুলের জন্য, এমনকি দুই ব্যক্তির ছোটখাটো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বা অসংগত বক্তব্যের কারণে অনেকেই নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়।’

নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়াদের এরপরে কী করণীয়, তা নিয়ে সরকার এরই মধ্যে একগুচ্ছ ঘোষণা দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ট্রাইব্যুনালে মামলা লড়ার সব খরচ সরকারই বহন করবে। কিন্তু সেসব ঘোষণা এনআরসি থেকে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের সবার কাছে এখনো পৌঁছয়নি। তিনি সারাদিন ধরে যে গাড়িটি ব্যবহার করেছেন, তার চালক বলেছেন যে ওই তালিকায় তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর নাম এলেও তাঁদের সন্তানের নাম আসেনি। এ অবস্থায় তিনি বেশ উদ্বেগ নিয়ে জানতে চেয়েছেন, এরপরে তাহলে কী করতে হবে? ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে হবে—সে তথ্য তখনো পৌঁছয়নি গুয়াহাটি শহরেরই বাসিন্দা ওই গাড়িচালকের কাছে। সূত্র : বিবিসি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা