kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নাগরিকত্ব হারানো গৃহবধূ জমিরন

‘এখন আমার কী হবে’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘এখন আমার কী হবে’

জমিরন পারভিন

গতকাল দুপুরে যখন জানতে পারেন, চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা বা এনআরসিতে তাঁর নাম নেই, আতঙ্কে আর অনিশ্চয়তায় মুষড়ে পড়েছেন আসামের গুয়াহাটির গৃহবধূ জমিরন পারভিন। স্বামী আজম আলী মৃধা এবং শ্বশুরবাড়ির অন্যরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আট-নয় বছরের একমাত্র ছেলেসন্তানটি উদ্বিগ্ন হয়ে মাকে দেখছে। স্বামী-সন্তান এবং শ্বশুরবাড়ির সবারই চূড়ান্ত তালিকায় নাম রয়েছে। বাবার পরিবারের সবাই তালিকায় রয়েছেন। বাদ পড়েছেন একমাত্র তিনি।

বিবিসিকে জমিরন বলেন, ‘খসড়া তালিকায় নাম না ওঠার পর সব কাগজপত্র দিয়ে আপিল করেছিলাম। কিন্তু তার পরও নাম নেই। জানি না এখন আমার কী হবে।’

জমিরনের জন্ম আসামের বড়পেটায়। কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রবেশপত্রে জমিরনের বাবার নামের বানান ভুল লেখা হয়েছিল বলেই এই পরিণতি। তাঁর বাবার নাম আতব আলী, কিন্তু পরীক্ষার প্রবেশপত্রে নাম লেখা হয় আতাবর আলী। দুই অক্ষরের ভুলেই অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছেন এই নারী।

জমিরনের স্বামী জানালেন, তাঁরা ট্রাইব্যুনালে আপিল করবেন।

জমিরন পারভিনসহ আসামের ১৯ লাখেরও বেশি মানুষের নাম চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি থেকে বাদ পড়েছে।

এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই ১৯ লাখ বাংলাভাষী মানুষের, যাদের সিংহভাগই মুসলমান, এখন কী হবে?

তারা কি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ল?

এখনই সেটা তারা হচ্ছে না। বাদ পড়া এই মানুষগুলোকে আপিলের জন্য ১২০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে তৈরি ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও তারা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টেও আপিল করতে পারবে। তবে ভারতের সব আদালত এমনিতেই সারা বছরই মামলার চাপে পর্যুদস্ত। ফলে আদালতে গিয়ে দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল আপিল প্রক্রিয়ার সুবিধা কতজন নিতে পারবে তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের সন্দেহ রয়েছ।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র, অল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষগুলোর জন্য এই আপিল প্রক্রিয়ায় ঢোকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যারা আপিলে অসফল হবে বা এই প্রক্রিয়ায় ঢুকবেই না, তারা রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়বে—সে সম্ভাবনাই প্রবল।

ট্রাইব্যুনালের প্রতি আস্থার অভাব

আসামের লেখিকা সঙ্গিতা বড়ুয়া পিশারডি বিবিসিকে বলেন, ‘যাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই তারা অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েছে যে তাদের এখন কী হবে। এর প্রধান কারণ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি ভালো না, মানুষের আস্থা নেই। ফলে সেখানে গিয়ে আদৌ কাজ হবে কি না তা নিয়ে বহু মানুষ সন্দিহান।’

নাগরিকত্ব নির্ধারণে আসামে এখন এ ধরনের ২০০টি বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর। অক্টোবরের মধ্যে এ ধরনের ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা দাঁড়াবে এক হাজার। এসব আদালতের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তাদের কাজের মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতাও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, প্রমাণের সব দায় বর্তায় বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তির ওপর।

লাখ লাখ দরিদ্র, নিরক্ষর মানুষের কাছে সব কিছুর লিখিত রেকর্ডও নেই।

সাংবাদিক রোহিনী মোহন আসামের একটি জেলায় এসব ট্রাইব্যুনালের ৫০০টিরও বেশি রায় বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, ৮২ শতাংশ অভিযুক্তকেই বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ৭৮ শতাংশ রায় হয়েছে অভিযুক্তের বক্তব্য না শুনেই। বলা বাহুল্য, বিদেশি হিসেবে ঘোষিত এসব মানুষের সিংহভাগই মুসলমান। তবে বাংলাভাষী হিন্দুর সংখ্যাও কম নয়।

এমনকি মোহাম্মদ সানাউল্লাহ নামের ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক এক সদস্য, যিনি তাঁর কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছিলেন, তাঁকে পর্যন্ত বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল।

এই ‘বিদেশিদের’ পরিণতি কী হবে?

তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হতে পারে। যে হাজারখানেক মানুষকে আসামে এরই মধ্যে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের বিভিন্ন কারাগারের ভেতর ছয়টি আটককেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে। সূত্র : বিবিসি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা