kalerkantho

মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরের স্বকীয়তা বদলানোই লক্ষ্য?

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরের স্বকীয়তা বদলানোই লক্ষ্য?

জম্মুর রাস্তায় সেনা পাহারা। গতকাল তোলা ছবি। ছবি : এএফপি

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের ডেমোগ্রাফি বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে দেওয়াই ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের পেছনে আসল উদ্দেশ্য কি না, তা নিয়ে এখন তীব্র বিতর্ক দানা বাঁধছে। দেশটিতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি বা তাদের পুরনো অবতার জনসঙ্ঘ অবশ্য বহু বছর ধরেই সংবিধানের এই বিতর্কিত ধারাটি বিলোপ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। বিজেপির বক্তব্য ছিল, কাশ্মীর যাতে সম্পূর্ণভাবে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত বা ‘আত্মীকৃত’ হতে পারে সে জন্যই ধারাটি বিলোপ করা দরকার।

ভারতের স্বাধীনতার সাত দশক পর একটি বিজেপি সরকার অবশেষে তাদের এই বহু পুরনো রাজনৈতিক এজেন্ডাটি বাস্তবায়ন করল। সোমবার পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নাটকীয় ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস বুঝিয়ে দেয়, তারা এই পদক্ষেপের মধ্যে অন্য অভিসন্ধি দেখছে। রাজ্যসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদ তৃণমূলসহ অন্য কিছু বিরোধী দলকে পাশে নিয়ে ঘোষণা করেন, ‘ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীরের যে অনন্য চরিত্র, কলমের এক খোঁচায় বিজেপি সেটাই বরবাদ করে দিতে চাইছে।’ তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, সীমান্তবর্তী রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর এমন একটি প্রদেশ, যার সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি—সবই দেশের বাকি অংশের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।’ তিনি বলেন, ‘এই রাজ্যের লাদাখে বৌদ্ধ ও মুসলিমরা থাকে, কাশ্মীরে থাকে মুসলিম, পণ্ডিত ও শিখরা। আর জম্মুতে জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ হিন্দু আর বাকি ৪০ শতাংশ মুসলিম।’

‘এমন একটি রাজ্যকে যদি কেউ এক সূত্রে বেঁধে রাখতে পারে, সেটা ছিল সংবিধানের ৩৭০ ধারা। এই ধারায় রাজ্যের সব ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষের জন্যই বিশেষ ব্যবস্থা ছিল, যা আজ বিজেপি শেষ করে দিল’—বলেন তিনি।

ভারতশাসিত কাশ্মীরের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী যে কথাটা কিছুটা রাখঢাক করে বলছেন, কাশ্মীরি অ্যাক্টিভিস্টরা সেটাই বলছেন আরো খোলাখুলিভাবে যে এর মাধ্যমে কাশ্মীর উপত্যকা বা ভ্যালির ডেমোগ্রাফি বদলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

কাশ্মীরের বারামুলা কলেজে একসময় অধ্যাপনা করেছেন নাজির আহমেদ শল, কাশ্মীরিদের ‘সেলফ ডিটারমিনেশন’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে তিনি বহু বছর ধরে লন্ডনে আন্দোলন চালাচ্ছেন। লন্ডনভিত্তিক জাস্টিস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার অধ্যাপক শল বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘৩৭০ ধারা বিলোপের আগেই অন্তত দুটি পদক্ষেপ থেকে পরিষ্কার আঁচ করা যাচ্ছিল, বিজেপি সরকার কাশ্মীরের আবহমান কালের চরিত্রটা পাল্টে দিতে চাইছে।’ তাঁর মতে, প্রথমত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কাশ্মীরের জন্য যে ‘ডোভাল ডকট্রিন’ ফর্মুলেট করেছিলেন, তার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই ছিল ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে লোকজনকে কাশ্মীরে এনে বসত করানো। যেমন ওই ডকট্রিনে কাশ্মীরে হিন্দু পণ্ডিতদের জন্য আলাদা কলোনি স্থাপন, কাশ্মীরে শিল্পাঞ্চলের জন্য বাকি ভারত থেকে শিল্প শ্রমিকদের এনে বসতি গড়া কিংবা ভারতীয় সেনার সাবেক সদস্যদের এনে কাশ্মীরে জমি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, বিগত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও আর্টিকল ৩৫এ বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এমনকি তারা সরাসরি ঘোষণা করেছিল, বিজেপিকে ভোট দিয়ে জেতালে কাশ্মীরে জমিজিরাত কিনতে পারবেন অনায়াসেই।

ফলে অধ্যাপক শলের বলতে কোনো দ্বিধা নেই, ‘এদিনের পদক্ষেপ আসলে একটি সাংবিধানিক সন্ত্রাসবাদ, যার মাধ্যমে কাশ্মীরের স্বকীয় পরিচিতি বা আইডেন্টিটি ধ্বংস করে ডেমোগ্রাফিক রি-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

এটা ঠিকই যে বিজেপি গত নির্বাচনের আগে পোস্টার দিয়েছিল, ঠিকঠাক ভোট দিলে আপনার ভোট কিন্তু আপনাকে কাশ্মীরে জমির প্লটও এনে দিতে পারে।

বস্তুত ৩৭০ ধারা বিলোপের সমর্থনে বিজেপি ঠিক এই যুক্তিটাই দিচ্ছে যে এত দিনে কাশ্মীর ভারতের আর পাঁচটা রাজ্যের সঙ্গে সমান কাতারে এলো, কাশ্মীরের ভারতভুক্তি সম্পূর্ণ হলো।

বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা ও পলিসি রিসার্চ সেলের সদস্য অনির্বাণ গাঙ্গুলির কথায়, ‘জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আজ থেকে ৬৬ বছর আগে কাশ্মীরের সর্বাত্মক ভারতভুক্তির জন্য যে ৩৭০ ধারা বিলোপের দাবি জানিয়েছিলেন, আজ তাঁর রাজনৈতিক উত্তরসূরিরাই সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন। ‘আর ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের কথা যাঁরা বলছেন, সেটা এই পটভূমিতে সম্পূর্ণ অবান্তর।’

‘কারণ ৩৭০ ধারা এত দিন ছিল বলেই কাশ্মীরে যারা তফসিলি জাতি বা উপজাতিভুক্ত, কিংবা অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণির, তারা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন।’

কিন্তু এই পদক্ষেপের বিরোধীরা মনে করছেন, ইসরায়েল একদিন যা ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত অঞ্চলে করেছে অথবা চীনও করেছে তিব্বতে—সুন্নি মুসলিমগরিষ্ঠ কাশ্মীরে ভারতও ঠিক সেই একই ধরনের পদক্ষেপ নিল বলে তাঁরা মনে করছেন। সূত্র : বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য