kalerkantho

অনুচ্ছেদ ৩৫এ : কাশ্মীরের জন্য বিশেষ আইন কেন বিতর্কিত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অনুচ্ছেদ ৩৫এ : কাশ্মীরের জন্য বিশেষ আইন কেন বিতর্কিত

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত জম্মু-কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আলোচনা এবার নতুন গতি পেল। কারণ সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদের মাধ্যমে ভূখণ্ডটির বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছে ভারত সরকার। ফলে এই ধারার অন্তর্গত ৩৫এ ধারাও স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেল মনে করছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের অনেকে। দেখে নেওয়া যাক এসব ধারার আদ্যোপান্ত এবং এগুলো নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক।

ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ ধারাকে অস্থায়ী অভিহিত করা হয়েছে। এই ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ১১ নম্বর অংশে অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল এবং বিশেষ অধ্যাদেশ অনুসারে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের অন্য ধারাগুলো ভারতের বাকি অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য না-ও হতে পারে, এমনটাই ছিল পরিস্থিতি।

এত দিন ৩৭০ ধারা বলবৎ থাকায় প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ এবং যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে জম্মু-কাশ্মীরে হস্তক্ষেপের অধিকার কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। শুধু তা-ই নয়, ওই রাজ্যে কোনো আইন প্রণয়নের অধিকারও কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না।

আলোচিত ৩৫এ ধারা ৩৭০ ধারার অধীনেই ছিল। ৩৫এ ধারা অনুযায়ী কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা বিশেষ সুবিধা পেত। স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ সেখানে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে পারত না। স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার জন্যও ছিল নির্দিষ্ট নিয়ম। যারা ১৯৫৪ সালে মে থেকে ওই রাজ্যে রয়েছে কিংবা যারা টানা ১০ বছর ওই রাজ্যে বাস করছে, তারাই শুধু স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সার্টিফিকেট পেত। ধারাটি বাতিল হওয়ায় এখন থেকে যেকোনো রাজ্যের বাসিন্দা সেখানে জমি কিনতে পারবে। এত দিন জম্মু-কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা আরো যেসব সুবিধা ভোগ করছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান। অন্য রাজ্যের বাসিন্দারা সেখানে চাকরির আবেদন করতে পারত না। দিতে পারত না ভোটও। স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে কাউকে সার্টিফিকেট দেওয়া ও তাদের অধিকার নির্ধারণের ক্ষমতা রাজ্যের বিধানসভার ওপরই ন্যস্ত ছিল।

৩৫এ ধারার সবচেয়ে কঠোর দিক হলো জম্মু-কাশ্মীরের কোনো নারী রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনি এমনকি তার উত্তরাধিকারীরাও সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো।

ভারতের একমাত্র মুসলিমপ্রধান রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্যবাসীর সম্পর্কে আরো অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ এরই মধ্যে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ আশঙ্কা প্রকাশ করে টুইট করেছেন। এ ছাড়া বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি আগেই সতর্ক করেছেন, কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যবাসী নড়বড়ে সম্পর্ক এবার একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে। পাশাপাশি ৩৭০ ধারা বাতিল করলে রাজ্যে হিন্দুদের আধিক্য বেড়ে যাবে বলে যে আশঙ্কা কাশ্মীরিরা সব সময় করে আসছিল, সেটাও এবার সত্যি হবে, এমনটা মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

মূলত পাঞ্জাব থেকে ধেয়ে আসতে থাকা মানুষের স্রোত ঠেকাতে ১৯২৭ সালে আইন পাস করেন কাশ্মীরের মহারাজ হরি সিং। ওই আইনের বর্তমান রূপ তথা ৩৫এ ধারা নির্ধারিত হয় ১৯৫৪ সালে। ৩৭০ ধারা বাতিলের ফলে ৩৫এ ধারাও বাতিল হয়ে গেল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকারপক্ষের কেউ কেউ বলছে, আদালত এ ধারা বহাল রাখলে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে তা বাতিল করা হবে।

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করায় ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের উত্তেজনা পাকিস্তানশাসিত অংশেও পৌঁছে যাবে। কাশ্মীরকেন্দ্রিক এ উত্তেজনা ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে, এমনটা ভাবলে ভুল হবে বলে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ। তাঁদের মতে, এ ভূখণ্ডকে ঘিরে বির্তক আরো অনেক আগে থেকে। কাশ্মীরের অধিকার নিয়ে এরই মধ্যে দুই দফা যুদ্ধও করেছে ভারত-পাকিস্তান। প্রতিবেশী দেশ দুটি ২০০৩ সালে অস্ত্রবিরতি চুক্তি করলেও উত্তেজনার অবসান হয়নি, বরং বর্তমানে তাদের সম্পর্ক সংকটজনক পর্যায়ে রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি, ডন, আনন্দবাজার।

মন্তব্য