kalerkantho


গাজায় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ

কূটনৈতিক জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে ফিলিস্তিনের শান্তি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



কূটনৈতিক জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে ফিলিস্তিনের শান্তি

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব কমানোর চেষ্টা কোনোভাবেই হালে পানি পাচ্ছে না। অবরুদ্ধ গাজায় শান্তি ফেরানোর সর্বশেষ চেষ্টাও মাঠে মারা গেছে। সেখানে অতি জরুরি জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল রবিবার গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসকে শক্ত হাতে দমনের হুমকি দিয়েছেন।

ফিলিস্তিনে ২০০৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর হামাসের সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠন করতে অস্বীকৃতি জানায় ফাতাহ। এ অনৈক্যের জেরে ফাতাহকে উপেক্ষা করে গাজার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় হামাস আর ইসরায়েলের সঙ্গে বরাবরের দ্বন্দ্ব তো আছেই। সব মিলিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করছে গাজাবাসী। বিচ্ছিন্ন এ ফিলিস্তিনি উপত্যকার ২০ লাখ মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সেখানকার পরিস্থিতির অমানবিকতা কল্পনার বাইরে চলে গেছে—এমন মন্তব্য করেছে জাতিসংঘ।

গাজাবাসীকে এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য ইসরায়েল ও তার ঘনিষ্ঠতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর গাজায় জ্বালানি সরবরাহের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে সমর্থ হয় জাতিসংঘ। এমনকি গাজায় প্রথম ছয় মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হামাস সমর্থক কাতার ছয় কোটি ডলার অর্থায়নের অঙ্গীকার করে। সিদ্ধান্ত অনুসারে গত মঙ্গলবার থেকে ট্রাকে করে জ্বালানি সরবরাহের কাজ শুরু হয়। সব মিলিয়ে ছয় ট্রাকের মতো জ্বালানি পাঠানো হয় গাজায়। পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে দিনে ১৫ ট্রাক জ্বালানি সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু গোল বাধতে সময় লাগেনি।

গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে হামাস কয়েক মাস ধরে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের নিয়ে যে বিক্ষোভ করে আসছে, গত শুক্রবার তা নতুন মাত্রা পায়। সেদিনের বিক্ষোভে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়। গাজার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, নিহতের সংখ্যা সাত। এ ঘটনার পর তত্ক্ষণাৎ গাজায় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল।

পরদিন শনিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান টুইটারে লেখেন, ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বিস্ফোরক বেলুন ওড়ানো, টায়ার জ্বালানো ‘পুরোপুরি’ বন্ধ না করলে গাজায় জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু করা হবে না।

গতকাল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল আরো মারমুখী। এদিন মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে হামাসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘হামাস বোধ হয় বার্তাটা বোঝেনি। এসব হামলা যদি এমনিতে বন্ধ না হয়, তবে অন্যভাবে এসব বন্ধ করা হবে, সেটা করা হবে খুব শক্তভাবে।’ হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসরায়েল সময় নেবে না—এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘শিগগির আমরা অন্য রাস্তা ধরব। সে রাস্তায় খুব শক্ত ব্যবস্থাও থাকবে। হামাস যদি বুদ্ধিমান হয়, তবে তারা এখনই এসব অগ্নিকাণ্ড ও সহিংসতা বন্ধ করবে।’

ইসরায়েল এই মুহূর্তে কেবল হামাসের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিচ্ছে বটে, তবে সমস্যার এখানেই শেষ নয়। গাজায় জ্বালানি সরবরাহের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। এর ফলে পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে কি না। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা অবশ্য দাবি করছেন, অনেক চেষ্টার পর ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে এ জ্বালানি চুক্তিতে রাজি করানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গাজায় অমানবিক পরিস্থিতির অবসানে তিনি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেননি।

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আব্বাসকে কোণঠাসা করার প্রশ্ন উঠে আসার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করছে জেরুজালেম ইস্যু। ফিলিস্তিনের আতঙ্ক, এরই মধ্যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানকারী যুক্তরাষ্ট্র এবার এমন এক শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু করবে, যাতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জন্য দুটি আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণার সম্ভাবনা আরো দূরে চলে যাবে। ফিলিস্তিনিদের বঞ্চিত করার লক্ষ্যে পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং গাজায় খুদে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, এমন আশঙ্কাও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তাদের আর কোনো আস্থা নেই।

সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে তীব্র হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক জটিলতা। ইসরায়েল-গাজা সীমান্তে অব্যাহত বিক্ষোভ এ জটিলতাকে আরো তীব্র করে তুলছে।

সূত্র : এএফপি।



মন্তব্য