kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

অনন্য ভালোবাসায় সিক্ত তিনি

মুফতি এনায়েতুল্লাহ   

১৩ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শহুরে জীবনে বাংলার চিরায়ত রূপবৈচিত্র্য ও আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অনেকেই অনভিজ্ঞ। নাড়ির টান গ্রামে হলেও নাগরিক জীবনের এটাই বাস্তবতা। তাইতো দেখা যায়, সামান্য হাঁটাহাঁটি বা রোদের তেজে ক্লান্ত হয়ে ওঠে শহুরেরা। একটু ছায়া খুঁজে এদিক-ওদিক উঁকিঝুঁকি মারে।

বিজ্ঞাপন

তবে এই শহরে তেমন ছায়াদার গাছ আর কই? কার্তিকের শেষ সময়ের সকাল। রোদ খুব একটা তেজোদীপ্ত নয়। তবু দীর্ঘক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর। কিন্তু এখানে তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন সারিবদ্ধভাবে। উদাস দৃষ্টি ঝাপসা করে দেওয়া চোখের পানিসমেত। মাইকের আওয়াজ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। ক্ষণে ক্ষণে মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ! সকাল ১০টায়ই জানাজা শুরু হবে। ঘোষণা শুনে আরো নীরব হয়ে যায় বিশাল জনসমুদ্র।

বুধবার ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর জানাজার পরিবেশ ছিল এমনই। সংখ্যার বিচারে উপস্থিতির চেয়ে বরং রাস্তার চিত্রটা বলি। সকাল সোয়া ৭টা। ঢাকার প্রবেশদ্বার টঙ্গী বাজার বাসস্টেশন। টঙ্গী থেকে খিলক্ষেত-বসুন্ধরা হয়ে যে গাড়িগুলো নিয়মিত চলাচল করে, তার কোনোটাতেই ওঠার উপায় নেই। অফিসগামী মানুষের সঙ্গে টুপি-পাঞ্জাবি পরা যাত্রীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। না বললেও বোঝা যায়, তাঁদের গন্তব্য বসুন্ধরা।

টঙ্গী হয়ে আবদুল্লাহপুর, হাউস বিল্ডিং, আজমপুর, রাজলক্ষ্মী, জসীমউদ্দীন, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রতিটি বাসস্টেশন হয়ে উঠেছিল লোকারণ্য। ঠিক একই চিত্র মিরপুর থেকে কুড়িল উড়াল সেতু হয়ে ও রামপুরা দিয়ে বসুন্ধরা আসার রাস্তায়। সাতসকালে রাস্তায় বের হওয়া এই বিপুল জনতার গন্তব্যও যে মুফতি আবদুর রহমানকে বিদায় জানানো, সেটি ততক্ষণে নগরবাসী বুঝে গেছে।

সেদিন রাজধানীর সব পথ গিয়ে যেন মিলে গিয়েছিল বসুন্ধরা এলাকায়। কফিনবাহী গাড়িটি আসার আগেই জানাজাস্থলে আলেম-ওলামা ছাড়াও নানা পেশার লাখো মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে। অশীতিপর প্রবীণ থেকে শুরু করে বাবার হাত ধরে আসা স্কুলপড়ুয়া শিশুটি-কে ছিল না! সবার বেদনামাখা মুখ। শোকে বিহ্বল সবাই। প্রিয় এই আলেমের জানাজায় অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন তাঁরা।

সংগত কারণে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রবেশের সব রাস্তা লোকারণ্য। এত সকালে বসুন্ধরার আশপাশের অফিসগুলো ব্যস্ত হয়নি। দোকানিরা তাঁদের পসরা তখনো সাজাননি। সাধারণত বসুন্ধরা এলাকার লোকজন মানুষের ভিড়ভাট্টা দেখতে খুব একটা অভ্যস্ত নন। তাঁরাও এই সকালে আগত মানুষের অজুর ব্যবস্থা, অপরিচিতকে রাস্তা বলে দেওয়ার কাজ করেছেন নিজ উদ্যোগে। বসুন্ধরা বড় মাদ্রাসা বা বসুন্ধরা কেন্দ্রীয় মসজিদ বলে খ্যাত ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারে ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর জানাজার কথা থাকলেও লোকজনের ঢল দেখে কর্তৃপক্ষ বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টার-৫-এর সামনের রাস্তায় জানাজার ব্যবস্থা করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইকও প্রস্তুত করা হয়। জানাজার আগে মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর মরদেহ হিমায়িত গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। দেশবরেণ্য এ শীর্ষ আলেমেদ্বীনের সম্মানে বুধবার (১১ নভেম্বর) ঢাকার সব মাদ্রাসার ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়। মাদ্রাসাগুলোতে তাঁর জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়। ব্যবস্থা করা হয় পবিত্র কোরআন খতমেরও।

সকাল ১০টা ১০ মিনিটে জানাজা শুরু হয়। জানাজা পরিচালনা করেন মুফতি আরশাদ রাহমানি। তিনি মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর বড় ছেলে ও ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক। জানাজার আগে দেশের বিশিষ্ট আলেম ও সুধীজন বক্তব্য দেন। মুফতি আবদুর রহমানের কর্মবহুল জীবন নিয়ে কথা বলেন তাঁরা।

জানাজাপূর্ব বক্তব্যের সময় স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। তাঁর কান্নার আওয়াজে উপস্থিত জনতাও কেঁদে ওঠেন। ইট-পাথরের এই পাষাণ নগরে কান্নার রব বিরল হলেও আজ সাক্ষী হয়ে থাকল বসুন্ধরা। একেই বোধ হয় বলে স্বজন হারানোর ব্যথা! কবি বলেছেন, 'জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে? চিরস্থির কবে নীড় হায় রে জীবন নদে?' তবে সব নদী এক নয়, নদী-নদীতে পার্থক্য আছে, রয়েছে বৈচিত্র্যও। এই বৈচিত্র্যময়তার সাক্ষী হয়ে রয়েছে বুধবারের সকালটি।

মৃত্যু চিরন্তন। এটা নিয়ে অভিযোগ করার উপায় নেই। ইসলামও এটা সমর্থন করে না। তার পরও বলি, যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন, দেশের মানুষ, মাটি ও প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, যাঁরা সর্বদা মানবিক-মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলেন, যাঁরা সত্য, সৎ ও সুন্দরের অনুসারী, যাঁরা সৃষ্টিশীল কাজে সদা ব্যস্ত রাখতেন নিজেকে-কেন যেন এমন শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো বড় অসময়ে চলে যান আমাদের মধ্য থেকে। নিকট অতীতকালে আমরা এমন অনেক দিকপালতুল্য আলেমেদ্বীনকে হারিয়েছি। এই শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল প্রমাণ করে, নানা কর্মযজ্ঞ ও জ্ঞানসাধনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের বিশ্বাসী মুসলমান ও ওলামায়ে কেরামের কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। আমরা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে কামনা করি, তিনি যেন পরকালেও এমন ভালোবাসা লাভ করেন।

লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

 

 



সাতদিনের সেরা