kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

ফকিহুল মিল্লাতের সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম

রিজওয়ান রফীক জমীরাবাদী   

১৩ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উপমহাদেশের শীর্ষ মুরব্বি মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশসহ অগণিত দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক, ফকিহুল মিল্লাত, শায়খুল হাদিস ফিল আরবি ওয়াল আজম হজরত মুফতি আবদুর রহমান সাহেব ১৯২০ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত ইমামনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মরহুম চাঁদ মিয়া (রহ.)। প্রখর মেধা ও ধীশক্তির বলে অত্যন্ত ছোটবেলায় তিনি নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা ও জামিআ আহলিয়া মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়া সমাপ্ত করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন এবং ১৯৫০ সালে সমাপনী বর্ষ তথা দাওরায়ে হাদিসে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে ১৯৫১ সালে সর্বপ্রথম উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ তথা উফতা বিভাগের সূচনা করা হয়। দাওরায়ে হাদিস পাস করার পর তিনি উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণার জন্য ওই বিভাগে ভর্তি হয়ে কোর্স সমাপ্ত করে দারুল উলুম দেওবন্দের সর্বপ্রথম মুফতি সনদ গ্রহণ করেন। অতঃপর দারুল উলুম দেওবন্দেই ফুনুনাতে আলিয়ার কোর্স শেষ করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে থাকাকালে তিনি সাহারানপুর মাদ্রাসায় হজরত শায়খুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া (রহ.)-এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁর সাহচর্যলাভে ধন্য হতেন। আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রারম্ভ হজরত শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর হাতে হলেও তিনি পরবর্তী সময়ে হাকিমুল উম্মত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর সর্বশেষ খলিফা মুহিউসসুন্নাহ হজরত মাওলানা আবরারুল হক সাহেব হারদুয়ী (রহ.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করে আধ্যাত্মিক শিক্ষায় পূর্ণতা লাভ করে খিলাফত প্রাপ্ত হন। খিলাফতলাভের পর থেকে তিনি সুলুক ও আত্মশুদ্ধির পথে দেশব্যাপী অবদান রেখে চলেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন খানকায়ে এমদাদিয়া আশরাফিয়া আবরারিয়া, যেখান থেকে আধ্যাত্মিক পথে উপকৃত হতে চলেছেন দেশবরেণ্য উলামায়ে কেরাম থেকে শুরু করে ছাত্র ও সাধারণ মুসলমানরা।

দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আলজামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হজরত মুফতি আজিজুল হক (রহ.)-এর আহ্বানে তিনি জামিয়া পটিয়ায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এতে তিনি হাদিস, তাফসির ও অন্যান্য ফুনুনের বিভিন্ন জটিল কিতাবাদির পাঠ দান করেন।

একসময় দেশের বিশালায়তন উত্তরাঞ্চল তথা উত্তরবঙ্গে দ্বীনি শিক্ষার জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। তেমনই এক সন্ধিক্ষণে উত্তরবঙ্গের কিছু লোক পটিয়ার হজরত মুফতি সাহেব হুজুর (রহ.)-এর কাছে এসে একজন সুযোগ্য কর্মঠ আলেম উত্তরবঙ্গে পাঠানোর জন্য আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি হজরত মুফতি আবদুর রহমান সাহেবকে উত্তরবঙ্গে প্রেরণ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি উত্তরবঙ্গ গমন করে ওয়াজ-নসিহত, শিক্ষাদীক্ষা, উন্নত আদর্শ ও আপন যোগ্যতাবলে পুরো উত্তরবঙ্গে দ্বীনি আদর্শের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন।

উত্তরবঙ্গে দীর্ঘ ছয় বছরের সফল মিশন শেষে তিনি আলজামিয়া পটিয়ায় চলে আসেন। এখানে ১৯৮৯ পর্যন্ত হাদিস, তাফসির ও ফিকাহর শিক্ষাদানের পাশাপাশি জামিয়ার শিক্ষা বিভাগীয় পরিচালক ও সহকারী মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এই বছরগুলোতে তিনি এই জামিয়ায় বুখারি শরিফ প্রথম খণ্ডেরও পাঠ দান করেন। বর্তমানে আলজামিয়া পটিয়া বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেওয়ার পেছনে হজরত হাজি ইউনুস সাহেব (রহ.)-এর পাশাপাশি তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেহনত অনস্বীকার্য।

১৯৯০ সালে তিনি আলজামিয়া পটিয়া থেকে চলে গিয়ে দেশ-বিদেশের বরেণ্য আলেম-উলামা ও মুরব্বিদের পরামর্শে ১৯৯১ সালে ঢাকায় স্বতন্ত্র একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৪ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জে বসুন্ধরা রিভারভিউতে জামিআতুল আবরার নামে আরেকটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন, যা ২০০৭ সাল পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসায় রূপ নেয়।

আলজামিয়া পটিয়ায় থাকার সময় থেকে তিনি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন। তখন থেকে ইসলামী ব্যাংকিং ও ইসলামী ফিন্যান্সের ওপর তাঁর লিখিত বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। সেই থেকে তাঁর একটা প্রচেষ্টা ছিল যে দুনিয়াব্যাপী সুদভিত্তিক অর্থনীতির স্থলে কিভাবে সুদবিহীন ইসলামী অর্থনীতি প্রবর্তন করা যায়। ২০০৯ সালে তিনি ইসলামী ফিন্যান্সের ওপর একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম রাখা হয় 'সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ'। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী অর্থনীতির উচ্চ গবেষণার ক্ষেত্রে সারা দেশে একক ও অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবদান রেখে যাচ্ছে। এ ছাড়া তিনি ঢাকায় মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা বসুন্ধরা এবং আশরাফিয়া মাদ্রাসা গাজীপুর নামে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সব মিলিয়ে ঢাকায়ই তাঁর সরাসরি পরিচালনাধীন মাদ্রাসা পাঁচটি। তিনি চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী শুলকবহর মাদ্রাসা ও উত্তরবঙ্গের বগুড়া জামীল মাদ্রাসারও সরাসরি পরিচালক ছিলেন। এ ছাড়া দেশের শত শত মাদ্রাসার উপদেষ্টা ও মুরব্বি হিসেবেও তিনি কল্পনাতীত খিদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের মুরব্বিদের মধ্যে মসজিদে নববীতে বসে আরব দেশের ছাত্রদের হাদিসের দরস দেওয়ার ঘটনা বিরল। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি প্রতিবছর রমজান মাসে মসজিদে নববীতে আরব ছাত্রদের হাদিসের কিতাবাদির দরস দিতেন। সে কারণ কেউ কেউ তাঁর নাম দিয়েছেন শায়খুল হাদিস ফিল আরব ওয়াল আজম। দীর্ঘকাল ধরে তিনি বার্ষিক তিনবার মক্কা-মদিনা জিয়ারত করতেন। তিনি অন্তিম শয্যায়ও যে আকাঙ্ক্ষাটি দেখাতেন তা হলো মক্কা-মদিনার জিয়ারত। দীর্ঘ ছয় মাস শয্যাশায়ী অবস্থায় সামান্য শক্তি পেলেই বলতেন, 'আমার জন্য তাড়াতাড়ি ভিসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করো। আমি মক্কা-মদিনা ঘুরে আসি।' এমনকি যখন তিনি আইসিইউতে ছিলেন, তখনো তাঁর ছেলেদের এ ব্যাপারে খুব পীড়াপীড়ি করতেন। তাঁর সুযোগ্য সন্তানরাও ব্যবস্থাগুলো করে রেখেছিলেন, যাতে সামান্য শক্তি ফিরে পেলেই হুজুরকে মক্কায় নিয়ে যাওয়া যায়।

তিনি দেশের বেশ কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ কমিটির সভাপতি ও ইসলামী ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ শরিয়াহ কাউন্সিলেরও (সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো বেশ কয়টি বোর্ডের অধীনে নিয়ন্ত্রিত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বোর্ড হলো পাঁচটি। ঢাকায় বেফাকুল মাদারিস বাংলাদেশ, চট্টগ্রামে ইত্তিহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, সিলেটে আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম, উত্তরবঙ্গে তানজিমুল মাদারিস বাংলাদেশ এবং দক্ষিণবঙ্গে গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসাভিত্তিক বেফাকুল মাদারিস। এর মধ্যে পরের চারটি বোর্ড নিয়ে গঠিত কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেরও তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উত্তরবঙ্গ তানজিমের তিনি সরাসরি চেয়ারম্যান ছিলেন।

হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.) সমাজের প্রতিটি স্তরকে সুন্নাতে রাসুল অনুযায়ী জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতেন। বিশেষ করে মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন যেন সুন্নাতে নববীর আলোয় সুসজ্জিত হয়, সে চেষ্টায়, সে চিন্তায় বিভোর থাকতেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে মাহফিল, সভা, বৈঠক করে মুসলমানদের এবং আলেম-ওলামাকে সুন্নাতের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতেন।

ফকিহুল মিল্লাত ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ নামে তাঁর একটি সেবামূলক সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থার মাধ্যমে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, হিফজখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ ছাড়া তিনি এই সংস্থার মাধ্যমে দেশের গরিব, মিসকিন ও এতিম ছাত্রদের আহার-বিহার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। ২০০৪ সালে ফকিহুল মিল্লাত (রহ.) এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক আল-আবরার

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা