kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.) স্মরণে

বিরলপ্রতিভার চিরবিদায়

মুফতি আব্দুল হালিম বোখারী   

১৩ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিরলপ্রতিভার চিরবিদায়

বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টার-৫-এর সামনের রাস্তায় ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর জানাজার একাংশ

১৯৬০ সালে আমি পটিয়া মাদ্রাসায় এসে ভর্তি হলাম। তখন থেকেই ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন তিনি বগুড়া জামিল মাদ্রাসায় ছিলেন। কয়েক বছর পড়াশোনার পর ১৯৬৪ সালে আমি অধ্যয়ন সমাপ্ত করি।

বিজ্ঞাপন

ফারেগ হওয়ার পর পটিয়া মাদ্রাসায় বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। আমাদের নিয়েই এ বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় পটিয়া মাদ্রাসার তৎকালীন মহাপরিচালক হাজি ইউনুছ (রহ.) মুফতি সাহেবকে পটিয়ায় নিয়ে আসেন। ফারেগ হয়ে আমি টাঙ্গাইল চলে যাই। সেখান থেকে ১৯৮২ সালে পটিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। সেই সময় হুজুরের সঙ্গে আমার মেলামেশা, ওঠাবসা বেশি হয়েছে। তাতে যা দেখেছি, তিনি ক্ষণজন্মা, বিরলপ্রতিভা ছিলেন। ফিকহের কিতাবগুলোতে রয়েছে : ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজ সময় ও সমাজ সম্পর্কে জানে না, সে-ই প্রকৃত মূর্খ। ' মুফতি হওয়ার জন্য যুগ-সচেতনতা খুবই জরুরি বিষয়। মুফতি আবদুর রহমান (রহ.)-এর স্বাতন্ত্র্য এখানেই। তিনি অত্যন্ত যুগ-সচেতন মুফতি ছিলেন। একবার এক মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেব হুজুরের কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করলেন, হজরত! আমাদের এক মুহাসসেল (অর্থ সংগ্রহকারী) হজের মৌসুমে সৌদি আরবে গেছেন। তিনি আরাফাহ, মিনা, মুজদালিফাসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে সেগুলোও মাদ্রাসার খরচ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এখন আমরা কি সেই ব্যয়ভার গ্রহণ করতে বাধ্য? মুফতি সাহেব জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই দিতে হবে। কারণ আরাফাহ, মিনা ও মুজদালিফায় বহু লোকের সমাগম ঘটে। অনেকে মনে করে, সেখানে দান করলে সওয়াব বেশি। উক্ত মুহাসসিল ওই সব এলাকায় মাদ্রাসার কাজেই গেছেন বলে ধরা যায়। তাই সেখানকার খরচও মাদ্রাসাকে বহন করতে হবে। '

মুফতি সাহেবের মেধাশক্তি খুবই প্রখর ছিল। একবার এক মাদ্রাসার শিক্ষক এসে সেই মাদ্রাসার মুহতামিমের বিরুদ্ধে বলতে লাগলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ওই মাদ্রাসায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। হুজুর দীর্ঘ সময় তা শুনে পরিশেষে বললেন, 'আপনার কথা দ্বারা বোঝা গেল, মুহতামিম সাহেব আপনার ওপর অবিচার করেছেন। তাহলে এমন জালিমের অধীনে আপনি চাকরি করেন কেন? আমি হলে সেখান থেকে অন্যত্র চলে যেতাম। ' হুজুর ওই মাদ্রাসায় বিশৃঙ্খলা হতে দেননি। বরং হিকমতের সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে নিরুত্তর করে দেন। মুফতি সাহেব (রহ.) ফতোয়া সম্পর্কে খুবই দক্ষ ছিলেন। তিনি সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পারতেন। তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল খুবই তীক্ষ্ন। কওমি মাদ্রাসার মধ্যে হরকাতুল জিহাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম তিনিই সোচ্চার হন। সেই সময় অন্যরা কেউ হরকাতুল জিহাদের চূড়ান্ত পরিণতি বুঝতে পারেননি। পরে সবাই ধীরে ধীরে বিষয়টি উপলব্ধি করতে থাকে। কওমি মাদ্রাসা নিয়ে কেউ কেউ আজকাল যে দু-একটা বিরূপ মন্তব্য করার সুযোগ পাচ্ছে, তা এই হরকতের কারণেই। হুজুরই প্রথম এর বিরোধিতা করেছিলেন। ডা. জাকির নায়েক আহলে হাদিসের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর বিষয়ে মুফতি সাহেবই সবার আগে মানুষকে সতর্ক করেছেন। চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসম্মেলনে তিনি এ বিষয়ে আলেমসমাজ ও সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে বলেছেন। অথচ তাঁর বিতর্কিত বক্তব্যগুলো তখনো এতটা প্রচার পায়নি। তখন আলেমদের কেউ কেউ এ বিষয়ে হুজুরের সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু এখন তো সবার কাছে জাকির নায়েকের বিষয়টি পরিষ্কার। মুফতি সাহেব বলার বহু পরে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, দারুল উলুম দেওবন্দ, এমনকি সৌদি আরব থেকে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে ফতোয়া এসেছে। আহলে হাদিসের অপতৎপরতার বিরুদ্ধেও তিনিই প্রথম প্রতিবাদী হন। তখন তাদের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে ছিল। এখন তো এটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমরা হুজুর বলার পর থেকেই এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি অব্যাহত রেখেছি। এটা হুজুরের দূরদৃষ্টির জ্বলন্ত প্রমাণ।

হাদিসশাস্ত্রেও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি একজন দক্ষ শায়খুল হাদিস ছিলেন। পটিয়া মাদ্রাসায়ও তিনি দীর্ঘদিন বুখারি শরিফ পাঠদান করেছেন। তাঁর দরসের বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি হাদিসের ব্যাখ্যায় বড় বড় মুহাদ্দিসের উদ্ধৃতি দেওয়ার পর বলতেন, এই হাদিস থেকে বর্তমান যুগের এই মাসআলা সমাধান করা যায়। অর্থাৎ বাস্তব ক্ষেত্রে তিনি শরিয়তের বিধিবিধানের প্রয়োগ দেখাতেন। এভাবে তিনি দরস দিতেন। মুফতি সাহেবের মেধা ও স্মরণশক্তি খুবই প্রখর ছিল। এমন মেধাবী মানুষ আমি খুবই কম দেখেছি। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ইত্তেহাদুল মাদারিসের প্রতিষ্ঠালগ্নে হাজি ইউনুছ সাহেবসহ মুফতি সাহেব সারা দেশে ব্যাপক প্রচারণা চালান। তখন মুফতি সাহেবকে দেখতাম এশার নামাজের পর ওয়াজ করতে বসতেন, ফজরের আগে সেই বসা থেকে উঠতেন। কোনো ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শ করত না। এটা ১৯৮২ বা ৮৩ সালের কথা। তখনকার কিছু কথা এই কিছুদিন আগে হুজুরের সামনে ওঠে। আমি দেখলাম, হুজুর সেই ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বলে যাচ্ছেন। পরে মুফতি সাহেব সুলুক ও তাসাউফের দিকে ধাবিত হন। তিনি এই জগতেও ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন। খুব অল্প সময়ে হারদুয়ী হজরত হারাম শরিফে তাঁকে খিলাফত দেন। অথচ হারদুয়ী হজরত যাকে-তাকে খিলাফত দেন না, এমনকি মুরিদও বানান না।

মুফতি সাহেব খুবই কর্মতৎপর মানুষ ছিলেন। একবার ইত্তেহাদুল মাদারিসের বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হয়ে যায়। হুজুর আমাকে নিয়ে এক রাতে বসে প্রায় ৩০টি পরীক্ষা হলের ছাত্রদের রেজাল্ট লিখে ফেলেন। অথচ হুজুরকে একটুও ক্লান্ত দেখা যায়নি।

হুজুরের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল, অনেক সময় অন্যদের সঙ্গে চিন্তাগত বিরোধ হলেও তিনি আমাদের তা বুঝতে দিতেন না। কিন্তু নিজে নিজে তিনি বিষয়টির মীমাংসার পথ খুঁজতেন। বিরূপ পরিস্থিতি তিনি খুব সহজেই জয় করতে পারতেন। নেতৃত্বের পূর্ণ দক্ষতা ও যোগ্যতা হুজুরের মধ্যে ছিল। তিনি কখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন না। যেকোনো বিষয়ে তাঁর স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত ছিল। সবার অভিমত শোনার পর তিনি বলতেন, 'আমার অভিমত হলো এই। ' জাতির যাঁরা অভিভাবক, তাঁরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে জাতির জন্য সেটা খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়। মুফতি সাহেব সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। কখনোই তাঁর সিদ্ধান্তহীনতা ছিল না। এমনকি তিনি যে বিষয়কে সঠিক জ্ঞান করতেন, শত বাধা-প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি তা করে দেখাতেন। যোগ্য মুরব্বির অন্যতম গুণ হলো, অধীনদের বিষয়ে সতর্ক খবরাখবর রাখা। কেননা অনেক সময় অধীনদের মন্দ কাজকর্মের দায়ভার মুরব্বিদেরই বহন করতে হয়। কোনো কাজ করলে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখাশোনা করতেন। এমন করতেন না যে কাউকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে তিনি বসে থাকতেন। এভাবে তিনি কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।

মুফতি সাহেবের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সমলোচকদের কখনো আঘাত করতেন না। ভালোবাসা দিয়ে, আদর-আপ্যায়ন দিয়ে তিনি শত্রুদের কাছে টেনে নিতেন। যারা তাঁকে অপছন্দ করত, তারাও কখনো হুজুরের কাছে এলে তিনি এমনভাবে আপ্যায়ন করতেন যে একসময় ওই ব্যক্তিও হুজুরের ভক্ত হয়ে যেত। ইমানের সঙ্গে আমলের, তালিমের সঙ্গে তারবিয়াতের এক অসাধারণ সমন্বয় করেছিলেন তিনি। তাই তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে আমলের ওপর খুবই জোর দেওয়া হয়। তিনি মানুষকে নজিরবিহীন মেহমানদারি করতেন। আমার দেখা আর কোনো মাদ্রাসায় এভাবে উত্তমরূপে মেহমানদারির ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেক মেহমানের স্তর ও মান অনুযায়ী অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে তিনি মানুষকে আপ্যায়ন করতেন। বাংলা ভাষায় মানুষ যাতে সহজে সমকালীন মাসলা-মাসায়েল জানতে পারে, সে জন্য তিনি মাসিক 'আল-আবরার' নামে একটি পত্রিকা বের করেছেন। অন্য সব মাসিক পত্রিকার তুলনায় আমার বিবেচনায় এটা খুবই সমৃদ্ধ। এর পাঠকসংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।

তিনি তর্কশাস্ত্র, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যায়ও খুবই পারদর্শী ছিলেন। একদিকে হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য, অন্যদিকে ইলমে মানতেক জানা লোকের সংখ্যা সত্যিই বিরল। তিনি মাতৃভাষায় পাঠদানের পক্ষপাতী ছিলেন, তবে জ্ঞানের আরো বহু জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য তিনি ফারসি ও উর্দু ভাষা শেখা-শেখানোর প্রতিও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম রূপকার তিনি। লেনদেন পরিচ্ছন্ন না হলে ধর্মের ওপর টিকে থাকা কঠিন। এই মর্মে মুফতি সাহেবই প্রথম এগিয়ে আসেন। তিনি বাংলাদেশে ইসলামিক ইকোনমিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে গবেষণা করা হয়।

লেখক : মহাপরিচালক

আল-জামেয়া আল-ইসলামিয়া, পটিয়া, চট্টগ্রাম

 



সাতদিনের সেরা