kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

‘দুই দিনে কেউ বাড়িতে খাবার দিয়া আসেনি’

ঝালকাঠিতে এক নারীর অভিযোগ

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি    

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘দুই দিনে কেউ বাড়িতে খাবার দিয়া আসেনি’

ঝালকাঠি : সাহায্য পাওয়ার আশায় শহরের বিভিন্ন স্থানে নারী-পুরুষ জটলা করে আছে পৌর ভবন এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘শুনছি পৌরসভা থেকে সবাইরে খাবার দেওয়া হইতে আছে, এ খবর শুইন্যা মোরাও আইছি। কিন্তু হেরা (পৌর কর্তৃপক্ষ) কইছে, খাবার বাড়িতে দিয়া আসবে। দুই দিন অপেক্ষা করলাম, কেউ বাড়িতে খাবার দিয়া আসেনি।’ করোনা ঝুঁকি সত্ত্বেও বাড়ির বাইরে আসার কারণ জানতে চাইলে ঝালকাঠি শহরের কাঠপট্টি এলাকার হাসি বেগম এসব কথা বলেন।

শুধু তিনি নন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা না মেনে ঝালকাঠিতে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। কেউ আসছে খাবারের সন্ধানে, কোথাও ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে কি না খবর নিতে। কেউ আবার জটলা সৃষ্টি করে দিচ্ছে আড্ডা। অনেকে আবার হাট-বাজারে গা-মিলিয়ে কেনাকাটা করছে। প্রতিদিন জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সতর্কবার্তা প্রচার, ভ্রাম্যমাণ আদালত, সেনাবাহিনীর টহল ও স্বেচ্ছাসেবীদের অনুরোধ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ মানছে না কোনো আইন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু দোকান ছাড়া সব বন্ধ থাকবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘরের বাইরে লোকজনকে বের না হওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে মানুষের জটলা লেগেই আছে। যানবাহনেও যাতায়াত করছে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচজন। সকাল ৯টার পর শহরের রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। জরুরি কাজ ছাড়াও অনেকে রাস্তায় হাঁটছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানেও নিয়ম না মেনে একসঙ্গে জড়ো হয়ে কেনাকাটা করা হচ্ছে। অথচ স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দোকানগুলোর সামনে নির্দিষ্ট দূরত্বে গোল বৃত্ত আঁকা রয়েছে। এমন চিত্র শহরের লঞ্চঘাট, বান্ধাঘাটা, বাঁশপট্টি, কাঠপট্টি, ট্রলারঘাট, পৌর খেয়াঘাট, কলেজ খেয়াঘাট, চৌমাথা, সাধনার মোড়, ফায়ার সার্ভিস মোড়, কলেজ মোড়, ব্র্যাক মোড় ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। সকাল ১০টার দিকে শহরের বড়বাজারে গিয়ে দেখা যায়, একসঙ্গে অনেক লোক কেনাকাটা করছে। অনেকে মাস্ক ব্যবহার করলেও, অনেকের মধ্যে কোনো ধরনের সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি এখনো।

এদিকে দুপুর ১২টার দিকে পৌরসভাসংলগ্ন এলাকায় ভিড় করে আছে নারীরা। ঘরে খাবার না থাকায় এই নারীরা সহায়তা পাওয়ার আশায় রাস্তায় নেমেছে বলে তারা জানায়। একসঙ্গে জটলাবেঁধে তারা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আবার বসে আছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে তাদের কাছে জানতে চাইলে বলে, ‘আমাগো আল্লায় বাঁচাইবে। গরিবের আল্লা ছাড়া আর কেউ নাই।’

হাসি বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নতুনচর এলাকার হালিমা খাতুন বলেন, ‘আমরা কোনো সময় সাহায্য পাই না। স্বামী কাম-কাইজ কইর্যা সংসার চালায়, এখন কাজ বন্ধ। খামু কী?’

তাঁদের কথা শোনার সময় শহরের কলাবাগান এলাকার আকতার হোসেন ডেকে বললেন, ‘ভাই, তিন দিন কাজে যাইতে পারি না। তাই রাস্তায় নামছি, পারলে কিছু সাহায্য করেন, অথবা ব্যবস্থা কইর্যা দেন।’

তবে তাঁদের মুখে শুধু সহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপ, কিন্তু করোনাভাইরাসের সতর্কতা মেনে চলার কোনো সচেতনতা লক্ষ করা যায়নি। অনেকে জানেই না করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে।

ঝালকাঠির পৌর মেয়র লিয়াকত আলী তালুকদার বলেন, ‘এক হাজার মানুষের তালিকা রয়েছে, যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের বাড়িতে গিয়ে আমাদের কর্মীরা চাল, ডাল ও আলু পৌঁছে দিচ্ছে।’

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন জনসাধারণকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। ঘরের বাইরে প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হলে তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখনো সাড়ে ৩৯ টন চাল ও নগদ সাড়ে আট লাখ টাকা মজুদ রয়েছে। আমরা কর্মহীন মানুষের মধ্যে এসব খাদ্যসামগ্রী তুলে দিচ্ছি। আশা করি কেউ না খেয়ে থাকবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা