kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

‘করোনাকে ভয় পেলে না খেয়ে থাকতে হবে’

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও প্রসূন মণ্ডল, গোপালগঞ্জ   

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘করোনাকে ভয় পেলে না খেয়ে থাকতে হবে’

‘কী আর করুম। বাইর না অইয়া তো উফাই নাই। ভাত না হোক, ওষুধ কিননের লাইগ্যাঅ টাকা রুজি করত অইব। ডেলি আমার ৩২০ টাকার ওষুধ লাগে। ঘরের খাঅন, বাড়িভাড়াসহ ডেইলি সাত শ টাকার মতো লাগে। এর লাইগ্যা ডরের মইদ্যেঅ বাইর অইছি চা লইয়া।’ কথাগুলো আবুল কালাম আজাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার টিএ রোডের ফ্লাইওভারের নিচে চা বিক্রির সময় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কথা হয় আবুল কালামের সঙ্গে। জানালেন, নবীনগরের সলিমগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ছিলেন। এরপর প্রবাস থেকে ফিরে অসুখে ভুগছেন। একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। স্ট্রোক করে এখন অনেকটাই অচল। প্রাইভেটও পড়াতে পারেন না ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার মৌড়াইলের এই বাসিন্দা।

পৌর এলাকার পুরনো কাছারির (লাল বিল্ডিং) সামনে সামান্য কিছু টাকা বারবার গুনছিলেন রিকশা থামিয়ে বসে থাকা খৈয়াসার এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক মো. লোকমান। জানালেন, রিকশার ভাড়া দিতে হবে ৩০০ টাকা। দুপুর দেড়টার দিকে বের হয়ে ৪টা নাগাদ ২০০ টাকার মতো রুজি করেছেন।

করোনাভাইরাস আতঙ্কে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বত্রই এখন সুনসান নীরবতা। খুব বেশি প্রয়োজন না থাকলে কেউ বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। মানুষকে ঘরে রাখতে বেশ তৎপর প্রশাসন। এ অবস্থার মধ্যে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষকে। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাঁদের দুর্ভোগের এসব কথা জানা যায়।

টিএ রোডে জুতা সেলাইয়ের কাজ করার সময় সঞ্জিত ঋষি বলেন, ‘সারা দিন ইনকাম করে ১২৫ টাকা পাইছি। এমনিতে সাত-আট শ টাকা পাই। লোকজন নাই দেইক্কা কাম কইমা গেছে।’

ট্রাক থেকে নামানোর সময় বস্তার ফাঁকে পড়া সরিষা কুড়িয়ে বিক্রি করেন রাফিয়া বেগম। পৌর এলাকার কান্দিপাড়ার ওই বাসিন্দা জানান, সরিষাগুলো কবুতরের খাবার হিসেবে বিক্রি হয়। আগে প্রতিদিন ১০০ টাকার মতো সরিষা বিক্রি করতে পারতেন। গতকাল ৩০ থেকে ৪০ টাকার মতো আয় হয়।

এদিকে একই চিত্র দেখা গেছে গোপালগঞ্জে। সদরের রঘুনাথপুর গ্রামের সমীর মালাকার বলেন, ‘করোনাকে ভয় পেলে তো চলবে না। কাজে না বেরোলে বাড়িতে চুলা জ্বলবে না। ছেলে-মেয়ে না খেয়ে থাকবে। তাই মানুষ মরছে জেনেও কাজে আসতে হয়। তা ছাড়া আমরা যাদের জমিতে কাজ করি, এই সময়ে কাজ না করলে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ফসলের চিন্তা করে এবং নিজেদের বেঁচে থাকার জন্যই আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে বেরিয়েছি।’

একই উপজেলার করপাড়া গ্রামের দিনমজুর কৃষক সঞ্জিত সরকার বলেন, ‘গরিব মানুষের আবার করোনা কিসের। প্রতিদিন তো আমরা ময়লা-আবর্জনার কাজ করেই জীবন চালাই। কিষান বিক্রি না করলে চুলায় হাঁড়ি উঠবে না। না খেয়ে মরতে হবে।’

রিকশাচালক কাদের মোল্লা বলেন, ‘আমরা সবই জানি। কিন্তু ঘরে তো কোনো খাবার নাই। সামনে দেশের অবস্থা আরো খারাপ হলে কিভাবে চলব! সরকার ঘোষণা দিয়েছে আমাদের মতো দিনমজুরদের খাবারের ব্যবস্থা করবে। কবে পাব সেই খাবার? তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হলে আমরাও ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেব।’

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা জনগণকে সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছি। যার যার অবস্থান থেকে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করি।’

জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, ‘ইতিমধ্যে ১০০ মেট্রিক টন চাল ও সাত লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। শিগগিরই ঘরে ফেরা কর্মসূচির আওতায় যা যা সুযোগ-সুবিধা আছে, তা তাদের দেওয়া হবে। তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, করোনা একটি মহামারি। তা থেকে বাঁচতে সবাইকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা