kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

বডি বানানোর আদ্যোপান্ত

এখন বাইরে থেকে আমদানির চেয়ে বরং দেশেই তৈরি হচ্ছে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনের বডি। শুধু ইঞ্জিন ও চেসিস বাইরে থেকে এনে দেশে তৈরি গাড়ি চলছে দেশে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সিদ্দিকা তুলি

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বডি বানানোর আদ্যোপান্ত

ভারী যানের চেসিস ও ইঞ্জিন। এর ওপরেই বসবে বডি ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

রাজধানীর বেড়িবাঁধ, গাবতলী, তেজগাঁও, মহাখালী, সায়েদাবাদ, আমিনবাজারসহ দেশের অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে বডি তৈরির কারখানা। ভালো একটি বডি বানাতে তিন থেকে চারজন মিস্ত্রির সময় লাগে দুই সপ্তাহের মতো। খরচ পড়ে দেড় থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা।

ঢাকার বাইরেও রয়েছে বডি তৈরির কারখানা। অনেক ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ও চেসিস বাইরে থেকে আনার পর বডি তৈরির সময় চেসিসের আকার পরিবর্তন করে আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়। তবে বডিমিস্ত্রিরা বলছেন, মালিকপক্ষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। অনুমোদিত সিটের কিংবা আকারের বাড়তি বডি খুব বেশি বানাতে হয় না তাদের।

রাজধানীর গাবতলী ও আমিনবাজারে রয়েছে কয়েকটি ওয়ার্কশপ। গাবতলী থেকে পর্বতার দিকে এগিয়ে গেলে কানে আসবে বডি তৈরির টুং টাং শব্দ। রাস্তার দুই পাশজুড়ে ছোট-বড় অনেক ট্রাক দাঁড়িয়ে। কোনোটায় ঘষামাজা চলছে তো কোনোটার রং করা নিয়ে ব্যস্ত বডিমিস্ত্রিরা। কোথাও বা দাঁড়িয়ে আছে বডি ছাড়া ট্রাকের কঙ্কাল! তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তায় চৌরাস্তার মোড় থেকে বাঁ দিকে একটু ভেতরে গেলেই দেখা মিলবে অনেক ওয়ার্কশপের।

এখানকার মিলন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের মালিক মিলন মিয়া একসময় বডি তৈরির মিস্ত্রি ছিলেন। এখন তিনি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের দোকান দিয়েছেন। তাঁর দোকানে কাজ করেন ছয়জন মিস্ত্রি।

তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, এখন বাস, ট্রাক ও লরির মোটামুটি ৮০ শতাংশ বডি দেশে বানানো হয়। আমরাই তো আগে শুধু বডি রিপেয়ারিং করতাম। এখন মোটামুটি মাসে তিন থেকে চারটা ফুলবডি তৈরি করছি। এ রকম বডি বানানোর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ ঢাকায় কম করে হলেও শখানেক আছে।’

মিলন মিয়া আরো জানান, তাঁর ওয়ার্কশপে ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরনের ট্রাকের বডি এখানকার ওয়ার্কশপগুলোতে তৈরি করা হয়। কাভার বডিসহ ট্রাকের যাবতীয় কাঁচামাল, প্লেইন শিট আনা হয় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে। ওয়ার্কশপগুলোতে জাহাজের পাত নির্দিষ্ট আকারের সাইজ করে মেশিনে কেটে রাখা হয়। নির্দিষ্ট মডেলের কাভার বডিও চট্টগ্রাম থেকে আসে। কাভার বডির সুবিধা হচ্ছে, সরাসরি মূল ইঞ্জিনের চেসিসের ওপর বসিয়ে দিলেই হয়। বাড়তি ঝামেলা নেই। এর সঙ্গে সামনে একটি ক্যাপ বসিয়ে দেন মিস্ত্রিরা। তাতে ট্রাকের সৌন্দর্য বাড়ে।

ইঞ্জিনসহ মূল চেসিস নিয়ে আসার পর প্রথমে ডিজাইন করা হয়। বডি খোলা থাকবে, নাকি ঢাকনাসহ—সেটা জেনে শুরু হয় মূল কাজ। প্রথমে মূল চেসিসের ওপর আলাদা একটি চেসিস বসানো হয়। এরপর ডিজাইন অনুসারে বডি বানিয়ে চেসিসের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ কাজ রং করা। মালিকের পছন্দমতো বডিতে নকশা এঁকে সে অনুযায়ী রং করা হয়।

সাধারণত ট্রাকের বডি তৈরিতে ইস্পাতের পাতই বেশি ব্যবহার হয়। খরচ কমাতে কেউ কেউ কাঠও ব্যবহার করেন। এসব কাঠও আসে চট্টগ্রাম থেকে। ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে স্থায়িত্ব। গাড়ি ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ভালো একটি বডি ১০ বছরেরও বেশি টেকে।

ট্রাকের বডির মডেলভেদে খরচ একেক রকম। ছোট একটি ট্রাকের বডি তৈরিতে খরচ দুই লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। মাঝারি বডির খরচ দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা। আর কনটেইনারসহ কাভার বডির খরচ তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা।

দেশে তৈরি হচ্ছে ছোট, বড় ও মাঝারি আকৃতির বাসের বডিও। সাধারণ বাসের বডি বানাতে ট্রাকের চেয়ে খরচ একটু বেশি। সময়ও লাগে বেশি।

বাসের মডেল ও আসনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে খরচ। বেশির ভাগ খরচ হয় আসনের পেছনে। যত ভালো আসন তত বেশি খরচ। এরপর রয়েছে কাপড়, প্লেইন শিট, ইস্পাতের পাত, ফ্যান, লাইট, সুইচ ও অন্যান্য সামগ্রী।  প্রথমে মডেল বানাতে হয়। পরে ফ্রেম। এরপর দেয়াল, জানালা, ছাদ ও সামনের অংশের কাজ। সর্বশেষ ধাপ অঙ্গসজ্জা। এসব কাজে তিন থেকে চারজন মিস্ত্রির এক মাস লাগে। ৪০ সিটের একটি বাসের বডি বানাতে মানভেদে ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়।

 

তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল বাসের বডিও

বিলাসবহুল এসি বাসের বডিও তৈরি করছে কয়েকটি দেশি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে নাভানা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আফতাব অটোমোবাইলস ও ইফাদ অটোস। আগে বিলাসবহুল এসব বাসের একেকটির আমদানীকৃত বাজারমূল্য ছিল প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা। এখন দেশে তৈরি হওয়ায় দাম কমে সোয়া এক কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। এ জন্য কাঁচামাল আলাদাভাবে আমদানি করা হয়। এরপর নিজস্ব কারখানায় তৈরি করা হয় বডি।

যশোরের অতিকায় বডি বাজার : যশোর শহরের মণিহার সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে এগিয়ে গেলে রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়বে অনেক অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ। এসবের সামনে নির্মাণ করা হচ্ছে বাস, ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের বডি। অভিজ্ঞ কারিগর আর খরচ কম হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান  থেকে বাস, ট্রাক, পিকআপের মালিকরা তাঁদের গাড়ির বডি যশোরের এসব ওয়ার্কশপ থেকে তৈরি করান। ঈগল পরিবহন, আকিজ গ্রুপ, প্রাণ গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের বডিও তৈরি হয় এখানে।

পঞ্চাশের দশক থেকে যশোরে এই অটোমোবাইল শিল্প যাত্রা শুরু করলেও মূলত নব্বইয়ের দশকে এসে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। একই সময় ভারত থেকে টাটা ও অশোক লেল্যান্ড গাড়ি আমদানি শুরু হয়। এসব গাড়ির বডি তৈরির বিশাল ক্ষেত্রও তৈরি হয় এ সময়।

যশোর জেলা অটোমোবাইল মালিক সমিতির তথ্য মতে, সমিতিভুক্ত ও সমিতির বাইরের ওয়ার্কশপগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এসব ওয়ার্কশপের দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীরা অল্প সময়ে বাস-ট্রাকের আন্তর্জাতিক মানের বডি তৈরি করে দিতে পারেন। দেশের অন্য স্থানের তুলনায় এখানে বডি নির্মাণ করলে বাস-ট্রাক প্রতি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ কম পড়ে। এ কারণে যশোর ও আশপাশের জেলা তো বটেই, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলার মালিকরা তাঁদের গাড়ির বডি যশোর থেকে তৈরি করান।

যশোরের ওয়ার্কশপগুলোতে হিনো, অশোক লেল্যান্ড, টাটা, এইচার, মাজদা কম্পানির বাস-ট্রাকের বডি বেশি নির্মাণ করা হয়ে থাকে। নির্মাণ করা হয় কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের বডিও। এ ছাড়া দুর্ঘটনার শিকার এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন গাড়ির বডিও রি-মডেলিং করা হয় এখানে।

নতুন-পুরনো মিলিয়ে প্রতি মাসে যশোরে গড়ে সাড়ে চার শ বাস ও ট্রাকের বডি তৈরি হচ্ছে। সে অনুযায়ী বছরে এখানে তৈরি হচ্ছে সাড়ে পাঁচ হাজার বাস-ট্রাকের বডি। এর বাইরে কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের বডিও তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ খাতে বছরে লেনদেন হচ্ছে ৬৫০ কোটি টাকারও বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা