kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

সূচক ওঠে চাকায় চাকায়

গত কয়েক দশকে দেশের জাতীয় অর্থনীতির সঞ্চালনে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল আক্ষরিক অর্থেই বড় চালিকাশক্তি। বাড়ছে এই খাতের ক্ষুদ্র ও বড় বিনিয়োগও। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনের পথে হাঁটছে দেশের পরিবহন খাত। লিখেছেন শায়েখ হাসান

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সূচক ওঠে চাকায় চাকায়

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

জাতীয় অর্থনীতিতে পরিবহন খাতের গুরুত্ব ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে এখন দেশেই গাড়ি তৈরি ও রপ্তানির পরিকল্পনা করছে সরকার। পণ্য, শ্রম বা তথ্য প্রবাহের ধরন বহুলাংশেই যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশে পরিবহন ব্যবসা যে হারে এগিয়েছে, তাতে মধ্যম আয়ের দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা অনেকটাই প্রস্তুত। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘পণ্যের বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন যোগাযোগব্যবস্থার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহেও এ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ নজর দিতে হবে। দেশে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর বাজারজাতকরণ কিংবা রপ্তানির উদ্দেশে বন্দরে পৌঁছানোর জন্য তো ট্রাক-লরির বিকল্প নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা ও শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সাহায্য করে ভারী ও বাণিজ্যিক যানবাহন। এতে কর্মসংস্থানও কিন্তু কম হয় না।’

পরিসংখ্যান যা বলছে

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে পরিবহন খাতের অবদান ১১.১২ শতাংশ এবং এর প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ৬.৩৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এসংক্রান্ত সর্বশেষ জরিপ পরিচালনা করে ২০১২ সালে। সেই জরিপের তথ্যানুসারে স্থলপথে যন্ত্রচালিত বাহনের (বাস, ট্রাক ইত্যাদি) অবদান ৬৩ শতাংশ। অযান্ত্রিক বাহনের (রিকশা, গরুর গাড়ি ইত্যাদি) অবদান ২৯ শতাংশ, নৌপরিবহনের অবদান ৬ শতাংশ, আর রেল, বিমানসহ বাকি সব পরিবহনের অবদান মাত্র ৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত কয়েক বছরের ব্যবধানে এই হার অন্তত দ্বিগুণ বেড়েছে।

গত কয়েক বছরে শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে কনটেইনার পরিবহনের হারও বাড়ছে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান দ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে গত অর্থবছরে কনটেইনার পরিবহনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। কনটেইনার প্রবৃদ্ধির হারও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির সমান। শিল্প খাতের পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহনে সেবা খাতেরও প্রভাব রয়েছে।

পণ্য পরিবহনে ট্রাকের সঙ্গে আছে কার্গো ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ডেলিভারি ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর ইত্যাদিও। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএতে নিবন্ধিত হয়েছে ১২ হাজার ৬৬৩টি ট্রাক, ১৩ হাজার ৯৭টি পিকআপ, এক হাজার ২৮০টি কার্গো ভ্যান, পাঁচ হাজার ৭২৯টি কাভার্ড ভ্যান, দুই হাজার ১০০টি ডেলিভারি ভ্যান। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ৭৪৪টি ট্রাক, ৩৩৯টি কাভার্ড ভ্যান ও ১৩০টি ডেলিভারি ভ্যান নিবন্ধিত হয়েছে।

২০১৭ সালে সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ১০ হাজার ৩৫৩টি ট্রাক, ১৩ হাজার ৫১২টি পিকআপ, এক হাজার ৪১৩টি কার্গো ভ্যান, পাঁচ হাজার ১৭৬টি কাভার্ড ভ্যান, দুই হাজার ৪১০টি ডেলিভারি ভ্যান ও দুই হাজার ৭৭৭টি ট্রাক্টর।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের গবেষণা বলছে, এক টন পণ্য কিলোমিটারে পরিবহনে ট্রেনে ব্যয় হয় এক টাকা ৪৯ পয়সা, নৌযানে এক টাকা ৯৯ ও ট্রাকে তিন টাকা চার পয়সা। আবার ২৫০ কিলোমিটার পথ পণ্য পরিবহনে ট্রাকে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, নৌযানে ২০ ও ট্রেনে ২৬-৩০ ঘণ্টা (ওয়েটিং টাইমসহ)।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ট্রেনে পণ্য পরিবহন হয় ৩২ লাখ ৮২ হাজার টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২০ লাখ সাত হাজার টনে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পরিবহন হয় ৩০ লাখ ১০ হাজার টন, ২০০৯-১০ এ ২৭ লাখ ১৪ হাজার, ২০১০-১১ এ ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ২১ লাখ ৯২ হাজার টন।

 

দেড় মাসে নীতিমালা

কয়েক বছর ধরে দেশে পরিবহন খাতের প্রয়োজন বেড়েছে। তাই এখন দেশেই গাড়ি বানানো ও রপ্তানির পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

দেশে গাড়ি তৈরিসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘আমরা যদি এখানে গাড়ির যন্ত্রাংশ বানাতে পারি, তাহলে গাড়িও বানাতে পারব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে কাজ করছি। এরই মধ্যে একটা খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আমরা সেটা দেখব। প্রয়োজনে সংশোধন আনা হবে।’

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এখন কিছু ব্র্যান্ডের টু-হুইলার (মোটরবাইক) সংযোজন করলেও চার চাকার গাড়ি তৈরি করা যাচ্ছে না নীতিমালার অভাবে। নীতিমালা হয়ে গেলে এর ধারাবাহিকতায় আইনও প্রণয়ন করা হবে। গাড়ি নির্মাতা কম্পানিগুলো যাতে বাংলাদেশে কারখানা খুলতে উৎসাহী হয়, সে জন্য সরকার ভর্তুকিও দিতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সরকার যৌথ বিনিয়োগকে উৎসাহ দেবে। যেসব দেশে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, সেখানে গাড়ি রপ্তানির সুযোগ প্রশস্ত হবে সে ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে গাড়ি নির্মাণকে পুরোদস্তুর শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ জন্য অনেক কাজ করতে হবে আমাদের। এখনো আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। নীতি সুপারিশগুলো তৈরি করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘অটোমোবাইল শিল্প বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসাবান্ধবনীতি নেওয়ায় দুই চাকার বাহন তৈরির ক্ষেত্রে বেশ ভালো বিনিয়োগ আসতে দেখেছি আমরা। এখন তিন ও চার চাকার বাহনে এটা করতে পারলে আমাদের এখানেও এ শিল্পের বিকাশ সম্ভব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা