kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

বাণিজ্যিক পরিবহনের চাহিদা বাড়তেই থাকবে

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাণিজ্যিক পরিবহনের চাহিদা বাড়তেই থাকবে

ছবি : রেদোয়ান ইসলাম সুস্মিত

ছয়টি পিকআপ ভ্যান দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল যে প্রতিষ্ঠানের, সেটি এখন দেশের বাণিজ্যিক পরিবহন বাজারের ৭-৮ শতাংশ দখল করে আছে। সংখ্যাটি ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে দেশের বাণিজ্যিক পরিবহনের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, এ খাতের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে কালের কণ্ঠর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির মোটর ভেহিকল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জসীম উদ্দিন স্বপন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান মাহামুদ

কালের কণ্ঠ : দেশের অটোমোবাইল বাজার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?

জসীম উদ্দিন স্বপন : আমাদের অটোমোবাইল মার্কেট খুব শক্তিশালী। এর প্রবৃদ্ধিও বেশি। বছরে গড়ে ২০-২৫ শতাংশ বলা যায়। এখন দেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, বর্তমান সরকারের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকল্প ও পদক্ষেপসহ বিভিন্ন কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে।

গত কয়েক বছরে সড়কের অবকাঠামোতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন রংপুর থেকে কুমিল্লা, চট্টগ্রামে পণ্য যায় সহজে। তেমনি পঞ্চগড়, তেতুলিয়ায়ও যাচ্ছে চট্টগ্রামের পণ্য।

 

কালের কণ্ঠ : বাণিজ্যিক পরিবহনে বিনিয়োগের বর্তমান চিত্রটা কেমন?

জসীম উদ্দিন স্বপন : বাংলাদেশে পিকআপ ও ট্রাকের বাজার আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার। এটাও বাড়ছে। অর্থনীতির পরিধির পাশাপাশি গত কয়েক বছরে পরিবহন চাহিদা বেড়েছে। জাতীয় অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই এমন। সামষ্টিকভাবে এটি অগ্রসর হয়। গত কয়েক বছরে দেশে বৃহৎ কারখানা বেড়েছে। বাল্ক কার্গো ট্রান্সপোর্ট বৃদ্ধির পাশাপাশি হেভি ডিউটি গাড়ির চাহিদাও বেড়েছে। আমাদের দেশে এখন বছরে ১৫-২০ শতাংশ কমার্শিয়াল ভেহিকলের প্রবৃদ্ধি রয়েছে। লাইট কমার্শিয়াল ভেহিকলের প্রবৃদ্ধি রয়েছে ১০ শতাংশ। তিন বছর ধরে হেভি ডিউটি ভেহিকলের প্রবৃদ্ধি রয়েছে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। এটি অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক। যেকোনো ধরনের পরিবহনের চাহিদা ১৫-২০ শতাংশ হারে বাড়া একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পরিমাপক।

পদ্মা সেতু ও পায়রা বন্দরের নির্মাণকাজ শেষ হলে জিডিপি বাড়বে। পরিবহনের চাহিদাও বাড়বে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে প্রান্তিক কৃষক, চাষি, ব্যবসায়ী ও উৎপাদকরা উপকৃত হবেন। ভোক্তারাও উপকৃত হবেন। পণ্যের স্থানান্তরের জন্য বাণিজ্যিক পরিবহনের ব্যবহার বাড়ছে, চাহিদাও বাড়ছে। আর এই চাহিদা বাড়তেই থাকবেই।

 

কালের কণ্ঠ : এনার্জিপ্যাকের শুরু নিয়ে বলুন।

জসীম উদ্দিন স্বপন : ১৯৮২ সালে স্বল্প পরিসরে যাত্রা শুরু করে এনার্জিপ্যাক। এখন বার্ষিক টার্নওভার কয়েক হাজার কোটি টাকা। আমাদের প্রথম সেক্টর ছিল ট্রান্সফরমার। ১৯৮৬ সাল থেকে ট্রান্সফরমার মেরামতের কাজ শুরু করি। সঙ্গে ছোট ছোট ট্রান্সফরমার উৎপাদনও শুরু করি। এখন আমরা ৩০০ এমভিএ পর্যন্ত বড় বড় ট্রান্সফরমার বানাই। ন্যাশনাল গ্রিডের জন্য দেশের প্রায় সব উপকেন্দ্রের সাবস্টেশন আমাদের সরবরাহকৃত। ১৯৯৫ সালে বুঝতে পারলাম দেশে বিদ্যুৎ সংকট আসছে। তখন আমরা পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবসা শুরু করি। পরে পাওয়ার প্লান্ট, ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন), ইলেকট্রিক পণ্য প্রভৃতির ব্যবসা শুরু করি। দেশের অন্যতম বৃহৎ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি হিসেবে এনার্জিপ্যাক যন্ত্রাংশ ও মানবসম্পদে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে থাকে।

 

কালের কণ্ঠ : বাণিজ্যিক পরিবহনের প্রসঙ্গে এনার্জিপ্যাকের নাম আসবেই। এ সফলতার রহস্য কী?

জসীম উদ্দিন স্বপন : পরিবহন গাড়ির ব্যবসায় এক যুগ অতিক্রম করা এনার্জিপ্যাক এখন বিভিন্ন মডেলের পিকআপ, ট্রাক, বাস বিক্রি করছে। শুরু থেকেই আমদানির বিকল্প সৃষ্টি, পরিবেশ সচেতনতা, ব্যবসার সামাজিক দায়বোধ—এগুলো আমরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিই। আমরা ট্রেডিং, এজেন্সিশিপ থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের প্লান্টে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছি। অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছি। ১২ বছর ধরে কমার্শিয়াল ভেহিকলের বিজনেস করছি এবং বর্তমানে আমাদের বিক্রীত প্রায় পনেরো হাজার গাড়ি রাস্তায় চলাচল করছে।

তবে ভেহিকল খাতে আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও গুরুত্ব দিই। যারা স্বল্প পুঁজি নিয়ে পরিবহন ব্যবসায় আসতে চান, তাঁদের আমরা সহজ কিস্তিতে গাড়ি দিচ্ছি।

জ্যাক ব্র্যান্ডের পিকআপে বেশি সাড়া পাই। এনার্জিপ্যাক দেশে কারখানা করে জ্যাক ব্র্যান্ডের পিকআপের সংযোজন শুরু করে ২০১৬ সালে। এখন প্রতিবছর ২০০০ পিকআপ ভ্যান সংযোজন করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছি আমরা।

দেড় টন বাণিজ্যিক পরিবহন খাতে আমাদের জ্যাক পিকআপটি ৬০ শতাংশ বাজার দখল করে রেখেছে।

বাংলাদেশে পিকআপ ও ট্রাকের বাজার আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার। এই বাজারের ৮ শতাংশ দখল করে আছে এনার্জিপ্যাকের ব্র্যান্ড ‘জ্যাক’। তিন বছরের মধ্যে এর লক্ষ্য বাজারের ১৫ শতাংশ দখলে নেওয়া।

 

কালের কণ্ঠ : বাণিজ্যিক পরিবহনে বিনিয়োগে কী কী বাধা রয়েছে বলে মনে করেন?

জসীম উদ্দিন স্বপন : দেশে এখনো প্রায় ৮০ শতাংশ গাড়ি বিক্রি হয় কিস্তিতে। অনেকে নানা জটিলতার কারণে ব্যাংকের লোন সুবিধা পায় না। আমাদেরই এসব ব্যবসায়ীকে ক্রেডিট দিতে হয়। ২০ শতাংশের মতো গাড়ি বড় কম্পানিগুলো নেয়। সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আমাদের অনুরোধ, বাণিজ্যিক গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ঋণ প্রদান যেন আরো সহজ করা হয়। এর সুফল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশই পাবে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কৃষি খাতের মতো ট্রান্সপোর্টগুলোতেও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে তাহলে ভালো হয়। কৃষিজমি চাষ করার ট্রাক্টর কেনার ক্ষেত্রে সুবিধাটি পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক পরিবহনেও সুবিধাটি চালু করা যেতে পারে।

 

কালের কণ্ঠ : বাণিজ্যিক পরিবহনের বিকাশে আপনার চাওয়া?

জসীম উদ্দিন স্বপন : আমরা এখনো পুরোপুরি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তাই জ্বালানিগুলোর মানের দিকে সরকারের আরেকটু মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বেশ কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এগুলোতে গাড়ি সংযোজনের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে এবং অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া দেশে দু-একটি বেসরকারি ইপিজেড হতে পারে শুধু গাড়ি সংযোজনের কারখানার জন্য। পাশাপাশি সরকার কর্তৃক দেশীয় কম্পানিগুলোকে সাবসিডাইজড করে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। গাড়ি সংযোজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আমদানি প্রক্রিয়াও আরো সহজ করা প্রয়োজন। তাতে অনেক প্রতিষ্ঠান গাড়ি সংযোজনের মতো ভারী শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবে এবং দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হবে ও আমদানিনির্ভরতা কমবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা