kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি থেকে সাবধান!

সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পাচ্ছে। লোভনীয় চাকরির নামে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অর্থ খোয়াচ্ছেন অসতর্ক চাকরিপ্রার্থীরা। এ ধরনের ঘটনা পর্যালোচনা ও কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন হাবিব তারেক

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি থেকে সাবধান!

মডেল : নাফিজ ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

শুধু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যানারেই যে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হচ্ছে, তা নয়। আজকাল নামি প্রতিষ্ঠানের নামও ব্যবহার করছে ভুয়া বিজ্ঞপ্তিদাতারা। এমনকি প্রথম সারির পত্রিকায়ও বিজ্ঞাপন দেওয়ার সাহস করছে। শুধু তা-ই নয়, টার্গেট করা প্রতিষ্ঠানের আদলে ওয়েবসাইট তৈরি করেও বোকা বানাচ্ছে প্রার্থীদের। টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের নামে পত্রিকায় ভুয়া বিজ্ঞপ্তি ছেপে কয়েক শ প্রার্থীর কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সম্প্রতি গণমাধ্যমে এসেছে। এ ছাড়া সরকারি চাকরির ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবরও প্রায়ই আসছে।

 

প্রতারণার যত ফাঁদ

প্রতারকরা সাধারণত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগ, এনজিও, কমিউনিটি ক্লিনিক, টেলিকম, বিদেশে চাকরি ও কনজ্যুমার প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং/সেলসে চাকরির কথা উল্লেখ করে। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে যেমন ভুয়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হতে পারে, আবার পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামেও ভুয়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হতে পারে। পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নামে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারকরা একই রকমের মনোগ্রাম বা নাম ব্যবহার করে ঠিকই, তবে সেখানে নিজেদের ই-মেইল ঠিকানা জুড়ে দেয়, যাতে প্রার্থীরা সেখানে সিভি পাঠায় বা যোগাযোগ করে। সিভি পাঠানোর পরই তারা প্রার্থীদের হাল-অবস্থা দেখে ঠিক করে কাকে ফাঁদে ফেলবে। আবার এমনও হতে পারে—আপনি কম্পিউটার দোকান বা কুরিয়ার থেকে একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন পাঠিয়েছেন। কিছুদিন পর ওই প্রতিষ্ঠানের নামে আপনার কাছে কল এলো। তারা চাকরি পাওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের প্রস্তাব করল। আপনি হয়তো ভাববেন, এটা ঠিক জায়গা থেকেই এসেছে। এমনটি না-ও হতে পারে। ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কেউ এই লেনদেনের ব্যাপারে হয়তো কিছুই জানে না। তৃতীয় পক্ষের কেউ প্রার্থীর তথ্য ও মোবাইল নম্বর পেয়ে এমনটি করতে পারে।

 

টাকা হাতানোর কায়দা

প্রতারণামূলক কায়দার অনেক ধরন ও ফাঁদ আছে। যেমন—কারো কারো টার্গেট থাকে শুধু আবেদন ফির নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। তারা প্রার্থীদের অফিসে ডাকে না। আবার কেউ কেউ আবেদন ফি না নিলেও সিভি দেখে প্রার্থীদের ডাকে। এরপর নেওয়া হয় লোক-দেখানো ইন্টারভিউ। এরপর প্রার্থীর অবস্থা বুঝে ফেলা হয় টাকা হাতানোর টোপ। সম্প্রতি এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) ঘরানার প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যও বেড়ে গেছে। তারা প্রার্থীদের ডেকে নামমাত্র চাকরি বা চুক্তিভিত্তিক কাজ দেয়। এটা ঠিক প্রচলিত চাকরি বা কাজ নয়। একজনকে লোভ দেখিয়ে আরো বহুজনকে ফাঁদে ফেলার কৌশল এটা। প্রতারকরা সাময়িক সময়ের জন্য অফিস ভাড়া নেয়। সেখানে অন্য সব অফিসের মতো সেটআপ থাকে না। আবার কেউ কেউ একটি ঠিকানা ব্যবহার করে, আদতে সেখানে সেই নামে কোনো অফিস নেই। বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর প্রতারকরা প্রার্থীদের মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে বলে ‘আপনার সিভি দেখেছি, আপনাকে আমরা নিয়োগের জন্য বাছাই করেছি, জামানতের টাকা ও কাগজপত্র নিয়ে কাল-পরশু আসতে হবে।’ অথবা, ‘ওমুক দিন আপনার ইন্টারভিউ আছে, কাগজপত্র নিয়ে আসুন।’ অফিসে গেলে প্রাথমিক আলাপ সেরেই বলে ‘আপনার চাকরি হয়ে গেছে!’ এর পরই আসল ফাঁদ। বলা হয়, ‘আগামী মাস থেকে জয়েন। এর আগে জামানতের টাকা দিতে হবে।’ প্রার্থীর কাছে ওই মুহূর্তে ক্যাশ টাকা না থাকলে দু-এক দিনের মধ্যে বিকাশে টাকা পাঠাতে বলা হয়। প্রার্থী টাকা দেওয়ার পর যখন পরের মাসে চাকরিতে জয়েন করতে যান, তখনই দেখা যায় অফিসে তালা। এই জামানতের টাকা নেওয়ার পেছনে তারা অনেক কারণ দেখাতে পারে। যেমন—‘আপনাকে যেহেতু সেলস/মার্কেটিং/লোন বিভাগে চাকরি দেওয়া হচ্ছে, আপনার কাছে প্রতিষ্ঠানের জন্য কালেকশন করা লাখ লাখ টাকা আসবে’, ‘না বলে চাকরি যাতে না ছাড়েন’  অথবা, ‘আপনাকে ট্রান্সপোর্টের জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে মোটরসাইকেল দেওয়া হবে।’

 

টার্গেট কারা?

মূলত গ্রাম ও মফস্বলের প্রার্থীদেরই প্রতারকরা সবচেয়ে বেশি টার্গেট করে। ভুয়া বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদনের পর প্রার্থীদের কাছে কল করে জামানত বা কোনো ফি খুব দ্রুত জমা দিতে বলা হয়। তখন গ্রামের প্রার্থীদের মধ্যে যাঁরা ব্যাপারটি ধরতে পারেন না, তাঁরা স্বভাবতই বলেন—এই মুহূর্তে সশরীরে ঢাকায় গিয়ে টাকা দেওয়া সম্ভব না, তাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এই টাকাটা পাঠাতে চান। আবার অনেক সময় প্রতারকরা নিজেরাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠানোর তাগাদা দেয়। ঢাকার প্রার্থী হলে হয়তো বলবে, ‘আচ্ছা, আমি আপনাদের অফিসে গিয়ে টাকাটা দেব।’ এই বলে প্রার্থী অফিস খোঁজ করলে প্রতারণার ব্যাপারে সন্দেহ করতে পারে। তাই প্রতারকরা গ্রামের প্রার্থীদেরই সবচেয়ে বেশি টার্গেট করে। নারী প্রার্থীরাও প্রতারকদের টার্গেটে পড়তে পারেন। নারী প্রার্থীদের কাছে টাকা না চেয়ে অফিস বা কোনো জায়গায় যেতে বলা হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। 

সবই কিন্তু ভুয়া না!

মাস কয়েক আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা বড়সড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে সরকারি নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হলেও অন্যান্য সরকারি বিজ্ঞপ্তির মতো দপ্তরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে অনেকেই বিজ্ঞপ্তিটি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানতে চেয়েছেন। আসলে এই বিজ্ঞপ্তিটি সঠিক বিজ্ঞপ্তিই ছিল। সংগত কারণে গোপনীয়তার জন্য সেখানে দপ্তরের নাম উল্লেখ করা হয়নি, আর এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বিজ্ঞপ্তিটি সঠিক হওয়ার একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে—তারা অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ায় টেলিটকের পোর্টাল ব্যবহার করেছিল। সাধারণত সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাই এই পোর্টালটি ব্যবহার করতে পারে।

ভুয়া নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো জামানত দাবি করে, এ রকম কিন্তু বেসরকারি নামি প্রতিষ্ঠানগুলোও (যেমন : এনজিও) যৌক্তিক কারণে ফেরতযোগ্য জামানত নেয়। জামানতের প্রসঙ্গ এলে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে যাচাই করতে হবে। যদি নামি প্রতিষ্ঠানের নামেও কোনো যৌক্তিক দাবি বা শর্তারোপও করা হয়, খোঁজ নিতে হবে সেটা আদৌ তাদের দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার অংশ কি না।

 

যাচাই করুন সহজেই

বর্তমানে সরকারি নিয়োগের আবেদন প্রক্রিয়া অনলাইনেই হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়। পুরনো আসল বিজ্ঞপ্তি ফটোশপে সম্পাদনা করে কিছু তথ্য পরিবর্তন করে ছড়িয়ে দেয় প্রতারকরা। দেখতে অনেকটা আসল বিজ্ঞপ্তির মতো হওয়ায় সাধারণ প্রার্থীরা এসব দেখে বিভ্রান্ত হন। সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি সঠিক কি না, এটি যাচাই করতে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (.gov.bd যুক্ত) গিয়ে দেখবেন এ রকম কিছু আছে কি না। আরেকটি উপায় হচ্ছে—আবেদনের সাইট হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অফিশিয়াল সাইট বা ওই দপ্তরের সংক্ষিপ্ত নামের শেষে টেলিটকের চাকরিসংক্রান্ত পোর্টালের শেষাংশ (.teletalk.com.bd) থাকবে। যেমন : http://ntrca.teletalk.com.bd, http://gtcl.teletalk.com.bd, http://bsec.teletalk.com.bd ইত্যাদি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও আবেদন প্রক্রিয়া হয় https://erecruitment.bb.org.bd সাইটে। বেসরকারি ব্যাংক ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পত্রিকার পাশাপাশি তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তারা সাধারণত নিজস্ব ওয়েবসাইট কিংবা bdjobs.com এর মাধ্যমে আবেদন জমা নেয়। আবার কেউ কেউ ই-মেইল বা নিজস্ব ঠিকানায় আবেদন পাঠানোর আহ্বান করে। গুগলের সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা যাচাই করা কঠিন কিছু না। অনেক সময় কোনো নামি প্রতিষ্ঠানের হুবহু নামে কিংবা নামের সঙ্গে কোনো শব্দ জুড়ে বা পরিবর্তন করে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের নামের সঙ্গে মিল রেখেও নকল ওয়েবসাইট বানিয়ে প্রতারণা হতে পারে। এ নিয়ে সন্দেহ থাকলে who.is সাইটে গিয়ে দেখে নিন সাইটের ঠিকানা বা ডোমেইনটি নতুন কি না। চলমান চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো একসঙ্গে পাওয়া যাবে টেলিটকের চাকরিসংক্রান্ত পোর্টালে : alljobs.teletalk.com.bd। তা ছাড়া সরকারি চাকরির আবেদনের ফি নির্দিষ্ট কোডে এসএমএস পাঠিয়ে বা নির্ধারিত নিয়মে জমা দিতে হয়। কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠাতে হয় না।



সাতদিনের সেরা