kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কৌশলী এরদোয়ান এবার কি সফল হবেন?

তামান্না মিনহাজ

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




কৌশলী এরদোয়ান এবার কি সফল হবেন?

তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান সত্যি সত্যি উত্তর সিরিয়া আক্রমণ করে নিরাপদ অঞ্চল গঠনের জন্য এভাবে সামরিক বাহিনী পাঠাবেন—সেটি অনেকেই হিসাবের মধ্যে রাখেননি। তিনি এ ব্যাপারে অনেকটা চূড়ান্ত বার্তা দেওয়ার মতো করে বক্তব্য রেখেছিলেন জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সাধারণ অধিবেশনে। বিষয়টিকে সে সময় খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং এবার পরিষদে অনেক বেশি আলোচনা হয়েছে কাশ্মীর নিয়ে। তবে এরদোয়ানও তাঁর মতো করে চেষ্টা করে গেছেন। সাধারণ পরিষদেই তিনি নিরাপদ অঞ্চলের মানচিত্র ও পরিকল্পনা প্রকাশ করেন, আর কেন সেটি তুরস্ককে নিতে হচ্ছে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিলেন। তুরস্ক সে সময় জানায়, নিরাপদ অঞ্চল গঠন করে সেখানে সিরীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসন করা সম্ভব না হলে আশপাশের অঞ্চল, এমনকি ইউরোপেও শরণার্থীর ঢেউ সংকট ডেকে আনতে পারে।

বাস্তবে যখন ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে সমর্থন দিয়ে নিরাপদ অঞ্চল গঠনের জন্য তুর্কি সেনাবাহিনী উত্তর সিরিয়ায় প্রবেশ করে, তখন টনক নড়ে আন্তর্জাতিক মহলের। বিশ্বব্যাপী সমালোচনা শুরু হয়। মৃতপ্রায় আরব লীগের বৈঠক ডেকে সেখানে এই অভিযানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস করা হয়। কাতার, সোমালিয়ার বিরোধিতা আর কয়েকটি দেশের নীরবতা ছাড়া সেখানে তুরস্কের উল্লেখযোগ্য সমর্থন আসেনি। অভিযানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও হাস্যকর। প্রথমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবুজ সংকেত দেওয়ার কথা জানান। পরে আবার বলেন এ অভিযানে তাঁর সমর্থন নেই। অভিযান বন্ধ করতে বলেন। দূতিয়ালি শুরু করেন এবং একটি চুক্তিও করে ফেলেন। এ ছাড়া এই অভিযানের সমালোচনা করেছে রাশিয়া, ইরান ও সৌদি আরব। অর্থাত্ বড় কোনো দেশের কাছ থেকেই সমর্থন পাননি এরদোয়ান।

তবে তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো—বাইরের বিশ্বে এরদোয়ানের নিরাপদ জোনের ব্যাপারে যখন কট্টরভাবে সমালোচনা হচ্ছে, তখন তুরস্কের অভ্যন্তরে সরকারি দল-বিরোধী দল-নির্বিশেষে সবাই এ ব্যাপারে পেছনে দাঁড়িয়েছে সামরিক বাহিনীর সাফল্য কামনায়। আর এই ঐক্যই অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে। ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন তুর্কি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে দুই ন্যাটো দেশের মধ্যে ভাঙনকে জোড়া লাগাতে। দুই মার্কিন নেতা ধৈর্যের সঙ্গে সে কাজটি করেছেন। একনাগাড়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনার পর তাঁরা একটি চুক্তিতে একমত হয়েছেন—নিরাপদ অঞ্চল গঠন এবং তুরস্কের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে।

মার্কিন প্রতিনিধিদলে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট দুই দলের প্রতিনিধি থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এক ধরনের ঐকমত্য রয়েছে বলে মনে করা হয়। এই চুক্তির পর নিরাপদ অঞ্চল তৈরির ব্যাপারে সিরীয় কুর্দি মিলিশিয়া সংগঠন ওয়াইপিজি ওই অঞ্চল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যদিও চুক্তির পরও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তুরস্কের দৃষ্টিতে কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর সংগঠন ওয়াইপিজি একটি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী। এরা তুরস্কের উত্তরাঞ্চলে নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তুর্কি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। যদিও এই ওয়াইপিজির সদস্যদের ব্যবহার করেই সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই করে মার্কিন বাহিনী। সাফল্যও পায়। এখন অবশ্য তারা ওয়াইপিজির ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে সিরিয়ায় তুরস্কের লড়াইরত অংশ থেকে মার্কিন সেনাদেরও তুলে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বিশ্লেষণ করলে মনে হবে, এই সমঝোতায় তুরস্কের বিজয় হয়েছে। তুর্কিদের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া বেশ ইতিবাচক ও উল্লাসমুখর বলে মনে হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ন্যাটোর সহযোগী সদস্য হিসেবে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি আবার নিশ্চিত করছে। চুক্তিতে বলা হয়, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার আইএসমুক্ত করার কাজের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর মধ্যে অন্তরীণ রাখার সুবিধা এবং এর আগে আইএস নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো থেকে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের যথাযথ সমন্বয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র একমত হয় যে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানগুলোতে শুধু সন্ত্রাসবাদী এবং তাদের আস্তানা, আশ্রয়কেন্দ্র, বাসস্থান, অস্ত্র, যানবাহন ও সরঞ্জামগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এ ছাড়া দুই দেশ সিরিয়ার রাজনৈতিক ঐক্য ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। চুক্তিতে বলা হয়, উভয় পক্ষই নিরাপদ অঞ্চলের অব্যাহত গুরুত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে একমত হয়েছে এবং তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তায় উদ্বেগ মোকাবেলায় ওয়াইপিজি ভারী অস্ত্রের ফের সংগ্রহ, তাদের দুর্গে প্রত্যাবর্তন এবং অন্যান্য যুদ্ধ অবস্থানে ফিরতে না পারার ব্যাপারে একমত হয়েছে। নিরাপদ অঞ্চলটি মূলত তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নিরাপদ অঞ্চল থেকে ওয়াইপিজি প্রত্যাহার করতে এরই মধ্যে ১২০ ঘণ্টার জন্য অপারেশন পিস স্প্রিং নামের এ অভিযানে এই বিরতি দিয়েছে। এই প্রত্যাহার শেষ হলে অপারেশন পিস স্প্রিং পুরোপুরি বন্ধ করা হবে।

আর অপারেশন পিস স্প্রিং বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র গত ১৪ অক্টোবর তুরস্কের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা-ও তুলে নিতে রাজি হয়েছে। উভয় পক্ষই এই চুক্তিতে বর্ণিত সব লক্ষ্য বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লখ করা হয়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র আর তুরস্ক ইচ্ছা করলে বা সিদ্ধান্ত নিলেই কি সিরিয়ায় কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারবে? সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সরকার ছাড়াও রাশিয়া ও ইরান সেখানকার দুই প্রধান পক্ষ। বিশেষত রাশিয়ার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সম্মতির বাইরে সিরিয়ায় কোনো উদ্যোগের টেকসই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে তুরস্ক ও রাশিয়া বৈঠকের পরিকল্পনা করছে। তবে একই সঙ্গে তুরস্ক এ-ও জানিয়েছে, এই চুক্তিতে উল্লেখ করা সময়ের মধ্যে যদি ওয়াইপিজে তাদের সদস্যদের সিরিয়া থেকে সরিয়ে না নেয় তাহলে বেঁধে দেওয়া সময়ের পর থেকেই আবার অভিযান শুরু করবে তারা।

এরদোয়ান ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চলের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে এটি সিরিয়ার ভেতরে ৩২ কিলোমিটার প্রশস্ত হবে এবং সিরিয়ার আইন আল-আরব বা কোবনে থেকে ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত ৪৪৪ কিলোমিটার প্রসারিত হবে। তুরস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’-এর সময় চার তুর্কি সেনা এবং ফ্রি সিরিয়ান আর্মির ৭৪ সদস্য নিহত হয়েছে।

তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ ওয়াইপিজি বা পিকেকে সন্ত্রাসীকে নিউট্রাল (নিরপেক্ষ) করেছে। তুর্কি কর্তৃপক্ষ প্রায়ই ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করে ‘সন্ত্রাসীরা’ আত্মসমর্পণ করলে, তাদের হত্যা করা হলে অথবা আটক করা হলে। তুরস্ক এই অভিযানের মাধ্যমে দেশটির সিরিয়া সীমান্তকে কুর্দি মিলিশিয়ামুক্ত করে সেখানে তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া সাড়ে ৩৬ লাখ শরণার্থীর বেশির ভাগকে পুনর্বাসিত করতে চায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা